পাঁচ দিন যাবত আমরা ভুটানে অবস্থান করছি। এই কয়দিনে ভুটানের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরাঘুরি সবাই এর প্রেমে পরে গেছি। ভুটান দেশটা আসলেই অনেক সুন্দর, পরিপাটি। নিজ চোঁখে না দেখে এর সৌন্দর্য বর্ণনা করা মুশকিল। এই জন্যই সবাই একে বলে এশিয়ার সুইজারল্যান্ড। প্রতিদিনই আমরা খুব দৌড়ের উপর ছিলাম, তাই সবাই বেশ ক্লান্ত। এবার দেশে ফেরার পালা।

নভেম্বর ২৬, ২০১৭ পারো। ভুটানে আজ আমাদের শেষ দিন। আজ আমরা ভুটান ছেড়ে ভারতের শিলিগুঁড়ি শহরে চলে যাব। খুব সকালেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। বেশ ঠান্ডা, তাপমাত্রা প্রায় ০ ডিগ্রি। জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখি অবস্থা করুন। কুয়াশার জন্য কিহুই দেখা যাচ্ছেনা। আরো কিছুক্ষন শুয়ে থেকে সবাই কে ডেকে তুলি রেডি হবার জন্য। বাথরুমে গিয়ে দেখি গ্রিজার কাজ করছেনা। পানি সেই ঠান্ডা, তাই আর গোসল করলাম না। শহীদ ভাই তাও সাহস করে গোসলের জন্য এগিয়ে যায়। প্রথম বার শরীরে পানি লাগতেই সেই জুড়ে চিৎকার করে উঠে। তার চিৎকারে সবাই ভয় পেয়ে যাই। যারা তখনো ঘুম থেকে উঠে নাই তারাও উঠে পরে। যাই হোক ওনার তেমন কিছু হয় নাই। সবাই তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে নিচে নেমে আসি। এসে দেখি গাড়ি রেডি। যাবার পথে কোন এক জায়গার আমরা নাস্তা করে নিব।

রাতে বিদ্যুৎ না আসায় বাসায় আর কথা বলতে পারি নাই। হোটেলের নিচে এসে তাড়াতাড়ি ওয়াইফাই কানেক্ট করে বাসায় কল করে দেখি সেই গেড়াকল লেগে গেছে। আমাদের সবার পরিবারের লোকজন একে অন্যের সাথে কনেক্টেড। দুপুর থেকে কেউ আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেনা। বাসার লোকজন ভেবেছে আমরা নিশ্চই কোনো বিপদে পড়েছি। দুঃশ্চিন্তায় কেউ রাতে ঘুমাতে পারে নাই। তারা অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো নিউজ না পেয়ে হতাশ হয়ে যায়। অফিস থেকেও আমাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। আমাদের খোঁজ নেবার জন্য তারা ভুটানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসেও যোগাযোগ করে। বেপারটা এতদূর গড়াবে আমরা বুজতে পারিনাই। যাই হোক এমন হলে আপনারা হোটেল বা ড্রাইভার এর মোবাইল থেকে দেশে ১ মিনিট কথা বলে নিবেন।

আবার সেই আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ দিয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। উদ্দেশ্য ভুটানের ফুন্টশোলিং বর্ডার। সেখান থেকে ভারতের হাসিমারা রেলস্টেশন। ভারতে ট্রেন ভ্রমণ অন্যরকম। তাই আমরা সিদ্দান্ত নেই হাসিমারা থেকে ট্রেনে করে শিলিগুঁড়ি যাব। শিলিগুঁড়িতে কিছু শপিং করব, মুভি দেখব। শিলিগুঁড়ি থেকে পরের দিন ৩ টায় আমাদের বাস ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করবে। আপনারা চাইলে শিলিগুঁড়ি ১ রাত থাকতে পারেন। আর না হলে ফুন্টশোলিং থেকে সোজা ভারতের চ্যাংড়াবান্ধা বর্ডার চলে যাবেন। বর্ডারের কাজ শেষে বাংলাদেশের বুড়িমারী থেকে বাসে ঢাকায় চলে যাবেন। চ্যাংড়াবান্ধা-বুড়িমারী বর্ডার ৬:৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে। তাই সেভাবেই আপনার প্ল্যান সেট করবেন।

ঘন্টা দুই পরে আমরা থিম্পু-ফুন্টশোলিং হাইওয়ে এর পাশে এক রেস্টুরেন্টে নামি সকালের নাস্তা করার জন্য। রেস্টুরেন্ট এর ভিউ খুবই সুন্দর। মূল সড়ক থেকে একটু উপরে পাহাড়ের উপর চমৎকার এক রেস্টুরেন্ট। এখানে ভুটানি খাবার, ব্রেড, বিস্কুট, চকলেট, চা, কফি, পানীয় ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। রেস্টুরেন্ট এর ভিতরে দেখি গা গরম করার জন্য এক ধরণের চুলা ঘুড়তাছে। আমরা সেখানে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে শরীর গরম করে নেই। খাবারে কি মারাত্মক ঘন্ধরে বাবা। পাশেই শুকর বাধা রয়েছে। সেখানে শুকরের মাংস খাওয়া নরমাল ব্যাপার। এইসব দেখে অন্য কিছু খাওয়ার ইচ্ছা চলে যায়। তাই আমরা ব্রেড, বিস্কিট আর চা খেলাম। নাস্তা শেষ করে আমরা আবারো এগিয়ে চললাম।

থিম্পু-ফুন্টশোলিং হাইওয়ে ভুটানের সব থেকে ব্যস্ততম হাইওয়ে। এটাই তাদের মালামাল পরিবহনের প্রধান সড়ক। তাই এখানে গাড়ির পরিমান একটু বেশি। অন্যদের থেকে এটি তুলনামূলক ভাবে প্রশস্ত। এর আশেপাশের সৌন্দর্য খুবই চমৎকার। বড় বড় পাহাড় কেটে বানানো সড়কটি কখনো অনেক উপরে উঠে গেছে আবার একটু পরেই নিচে নেমে গেছে। আমরা পাহাড়ের উপর থেকে অনেক দূরে ছোট ছোট গাড়ি দেখতে পাই। আবার একটু পরেই দেখি আমরা সেখানে আছি।

পাহাড়ি ঝর্ণা, থিম্পু-ফুন্টশোলিং হাইওয়ে: নভেম্বর ২৬, সকাল ১০:৪০

কিছুক্ষন পর পর চোখে পড়ছে পাহাড়ি ঝর্ণা। আমরা তেমন একটি পাহাড়ি ঝর্ণা দেখে নেমে পারি। ঝর্ণাটি অনেক বড়। অনেক উপর থেকে পানি বিশাল বিশাল পাথর ভেদ করে তীব্র গতিতে নিচে নেমে আসছে। পানির সে কি গর্জন। ঝর্ণার পানি অনেক ঠান্ডা আর পরিষ্কার। আমরা সেখানে কিছু সময় পার করে আবার চলা শুরু করি।

কিছুক্ষন পর দেখি অল্প কিছু বানর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাস্তার পাশে বসে আছে। আমরা সাথে সাথে গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে যাই। জানালা খুলে আমি সাথে থাকা চিপস তাদের খাওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেই। সুন্দর ভাবে এসে নিয়ে খেয়ে ফেললো। আমরা আরো দিতে থাকি। একটু পর দেখি কয়েক হাজার বানর চলে আসছে!! এত বানর একসাথে আগে কখনো দেখি নাই। তাও আবার সবাই উন্মুক্ত ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের সাথে চিপস, কলা, খাবার যা ছিল ওদের দিয়ে দেই। এমন দৃশ্য দেখবো আগে কখনো ভাবিনাই। সত্যিই তা ছিল অপূর্ব।

সামনে এগিয়ে দেখি হরিণ রাস্তার পাশ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমরা গাড়ি থামিয়ে তাদের ছবি তুলার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ওরা চলে যায়। ভুটানে এসে বন্য প্রাণীদের এভাবে উন্মুক্ত ভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখে সত্যিও খুব ভাল লাগল। গভীর বনে নাকি বাঘ ও থাকে।

বন্য হরিণ, থিম্পু-ফুন্টশোলিং হাইওয়ে: নভেম্বর ২৬, সকাল ১১:২৪

আমরা আবারো এগিয়ে চলি। কিছুক্ষন পর সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল। আমরা পুরাপুরি মেঘের ভিতরে চলে এসেছি। তাড়াতাড়ি সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়ি আর মেঘের ভিতর দিয়ে দৌড়াতে শুরু করি। সেই এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। সাজ্যেকে আমরা অনেকেই হয়তো মেঘ দেখেছি, কিন্তু এখানকারটা অন্যরকম। পাশেই দেখি লেখা মেঘ প্রবন এলাকা, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, সাবধান!! আমরা গাড়ি নিয়ে আস্তে আস্তে আবার সামনে এগিয়ে চলি। আমি জানালা খুলে হাত বের করে রাখি। মেঘে আমার হাত ভিজে যাচ্ছিল। ঠান্ডায় পুরা হাত অবস হয়ে যাবার মতো অবস্থা।

ইমিগ্রেশন
দুপুর ১ টার দিকে আমরা চলে আসি ফুন্টশোলিং। ভুটান গেটের পাশেই অবস্থিত ইমিগ্রেশন অফিস থেকে পাসপোর্টে এক্সিট সিল মেরে নেই। পরে ফুন্টশোলিং এ কিছু কেনাকাটা করি নিজেদের কাছে থাকা ভুটানের মুদ্রা গুলট্রাম সব শেষ করার জন্য। আপনারা আপনাদের সাথে যত গুলট্রাম আছে সব ভুটান থাকতেই শেষ করে দিবেন। পরে এগুলা আর কোথাও কনভার্ট করতে পারবেন না। আর পারলেও অনেক ঝামেলা হবে, তেমন দাম পাবেন না। তার পর একই গাড়িতে করে চলে আসি ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন অফিসে। সেখান থেকে পাসপোর্টে পুনরায় এনট্রি সিল নিয়ে নেই। ইন্ডিয়া – ভুটান বর্ডার এক আজব বর্ডার। এখানে ঢুকতে বা বের হতে কোনো চেকিং নাই। কেউ আপনাকে কিছুই জিজ্ঞেস করবেনা। আপনার পাসপোর্ট, ভিসা আছে কিনা কেউ দেখবেনা। তাই এখানে একটু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। আপনাকে নিজে যেয়েই নিজের পাসপোর্টে ভুটান থেকে বের হবার জন্য এক্সিট সিল আর ভুটানে প্রবেশ করার জন্য এন্ট্রি সিলে নিয়ে নিতে হবে। ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন অফিস থেকেও ইন্ডিয়া থেকে বের হবার জন্য এক্সিট সিল আর ইন্ডিয়াতে প্রবেশ করার জন্য এন্ট্রি সিলে নিয়ে নিতে হবে। নাহলে পরে অনেক সমস্যা হবে। আপনাকে চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্তে আটকে দিবে। বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিবেনা। অনেকেই এই ভুল করে, আর পরে পুনরায় জয়গাঁ এসে সিল নিয়ে যায়।

হাসিমারা রেলস্টেশন
দুপুর দুইটার দিকে আমরা চলে আসি ইন্ডিয়ার হাসিমারা রেলস্টেশনে (Hasimara Railway Station)। এটি পশ্চিম বঙ্গের আলিপুর দুয়ার জেলার হাসিমারা গ্রামে অবস্থিত। রেলস্টেশন টি বেশ বড়। আর সব ধরণের নাগরিক সুবিধাই রয়েছে। এখান থেকে ইন্ডিয়ার যেকোন জায়গার যাওয়া যায়। এখানে বাংলাদেশের এক পরিবারের সাথে দেখা হল। তাদের বাড়ি যশোর। তারাও আমাদের মতো ভিডিও দেখে সড়ক পথে ভুটান ভ্রমণে এসেছে। তারা এখান থেকে প্রথমে ট্রেনে কলকাতা, পরে বেনাপোল হয়ে দেশে যাবে। আমরা শিলিগুঁড়ির ৬ টা টিকেট কেটে নেই। প্রতি টিকেটের মূল্য নিল ৬০ রুপী। আমাদের ট্রেন বিকাল ৫ টায়। এখন থেকে শিলিগুঁড়ির যেতে প্রায় ২ ঘন্টা লাগবে। আপনারা যারা ট্রেনে চলাচল করতে আগ্রহী তারা কলকাতা বা চ্যাংড়াবান্ধা থেকে এখানে এসেই নামবেন। পরে টেক্সিতে ইন্ডিয়া-ভুটান বর্ডার।

হাসিমারা রেলস্টেশন, ইন্ডিয়া: নভেম্বর ২৬, দুপুর ২:০০

সিনেমার অভিজ্ঞতা
হাতে প্রায় দুই ঘন্টা সময় রয়েছে, আর খিদে পেয়েছে প্রচুর। তাই তাড়াতাড়ি চলে যাই রেলস্টেশন এর পাশে ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট বা হোটেলের খুঁজে। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যাই এক ভাতের হোটেল। হোটেল টি ট্রাক স্ট্যান্ড এর পাশেই অবস্থিত। ড্রাইভার – হেলপাররা এসে খবু মজা করে খাচ্ছে। আমরা ভাত আর মুরগির মাংসের অর্ডার করি। ভাত শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা আবার চুলায় রান্না বসায়। ট্রেডিশনাল মাটির চুলা, লাকড়ি দিয়ে রান্না চলে। ১৫-২০ মিনিটের ভিতরেই ভাত হয়ে যায়। তারা খাবার সার্ভ করে। কি আর বলব, ৫-৬ দিন যাবত চোঁখে ভাত দেখিনা। আর কি সব অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে মুখ পুরা শেষ। তাই সবাই ঝাপাইয়া পড়ি। প্রথম বার যা দিলো তা মুহূর্তের মাঝেই শেষ। আবার নিলাম। অনেক দিন পর সবাই খুব তৃপ্তি করে খেলাম। বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা এটা আমার লাইফের সব থেকে মনে রাখার মতো খাবার, যা এখনো জিভে লেগে আছে। ইন্ডিয়ার এক ট্রাক স্টান্ডে বসে যে খাবার খেলাম তা আজীবন আমাদের সবার মনে থাকবে। খাবার পর বিলও তেমন আসে নাই।

দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা চলে আসি রেলস্টেশনে। এসে যা শুনলাম তাতে সবার মাথায় হাত। ট্রেন নাকি ৫ ঘন্টা দেরি হবে!! প্ল্যান প্রোগ্রাম সব ভেস্তে গেল। এতক্ষন অপেক্ষা করা যাবেনা। তাই টিকেট ফেরত দিয়ে বাসেই শিলিগুঁড়ি যাবো সিদ্ধান্ত নেই। ৬ টিকেট ফেরত দিতে চাই শুনে টিকেট মাস্টার আকাশ থেকে পরে। বলে দাদা এতগুলা টাকা গচ্ছা দিবেন!! একটু দেরি করলেই তো পারেন। টিকেট ফেরত দিলে তারা ৫০% কেটে রাখে। কি আর করা, লস দিয়েই টিকেট ফেরত দিলাম।

স্টেশন এর কাছে সেই ভাতের হোটেলের পাশে দিয়েই বাস যায়। আমরা সেখানে বাসের জন্য দাঁড়াই। অনেক্ষন পরেও কোনো বাস আসলোনা। ভাতের হোটেলের লোকেরা বললো এখন প্রায় ৫ টা বেজে গেছে, ২ টার পরে আর কোনো বাস ছাড়েনা। আজ আর কোনো বাস পাবার সম্ভবনা নাই। শুনে তো আবারো মাথায় হাত, বলে কি!! প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে গেলে অনেক রুপী লেগে যাবে। এইদিকে কারো কাছে তেমন মাল পানি নাই। যা আছে তা দিয়ে কিছু শপিং করার প্ল্যান আছে। নায়ক/নায়িকা ট্রেন মিস করে, পরবর্তী কয়েকদিন আর কোনো ট্রেন নাই, এমন কাহিনী সাধারণত সিনেমায় দেখা যায়। কিন্তু তার সাথে আমাদের মিলে যাবে তা কখনো ভাবিনাই। এদিকে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, আসে পাশে থাকার তেমন কোনো ব্যবস্থাও নাই। আমাদের অবস্থা করুন। মনে মনে ভাবতে থাকি আজ বুজি ট্রাকের সাদে করেই যেতে হবে।

এই যখন অবস্থা তখনই দেখি বড় এক বাস আসতাছে। হাত তুলতেই থেমে গেল। দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা এই বাস কি শিলিগুঁড়ি যাবে। বললো যাবে, ১০০ রুপী করে লাগবে। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ি। উঠেই দেখি বাসে ড্রাইভার, হেল্পার ছাড়া আর কেউ নাই। মনের ভিতর ভয় ঢুকে গেল। মাজ রাস্তায় পিস্তল বের করে সব কিছু রেখে যদি নামায় দেয়। আমি বসে বসে তাদের গতিবিধি মনিটর করতে থাকি। উল্টা পাল্টা কিছু দেখলেই যাতে প্রতিরোধ করতে পারি তার প্ল্যান করতে থাকি। সবুজ মাঠের ভিতর দিয়ে বাস দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলে। বাসটি অন্যরকম, দুইতলা, উপরে শোবার ব্যবস্থা আছে। ঢাকায় ডাবল ডেকার বাস দেখিছি, উঠেছি। সেখানে বসে ঘুমানো গেলেও শোবার ব্যবস্থা নাই। একটু পর হেল্পার কে জিজ্ঞেস করলাম, বাসে আর কোনো যাত্রী নাই কেন? বললো আমাদের একটি বাস নষ্ট হয়ে গেছে, ওটার রিপ্লেসমেন্টে এটা যাচ্ছে।

সামনে থেকে এক বয়স্ক মহিলা আর তার ছেলে উঠল। উঠেই মহিলাটি সিঁড়ি দিয়ে সোজা দোতালায় যেয়ে সুন্দর ভাবে শোয়ে পড়ল। ব্যাপারটা দারুন লাগল। আহঃ ঢাকার বাসগুলো যদি এমন হত, তাহলে অফিস থেকে বের হয়েই লম্বা এক ঘুম দিয়ে দিতাম। ২-৪ ঘন্টা যা লাগার লাগুক। তারা আর কোনো যাত্রী উঠালোনা। মাজখানে একবার চা পানের বিরতি দিয়ে বাসটি দ্রুতই শিলিগুঁড়ি চলে আসল। আমরাও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

শিলিগুঁড়ি
বাস থেকে নেমে অটো নিয়ে চলে আসি জংশন মোড়। খুজাখুজি করে এক রাতের জন্য ১৩০০ রুপী দিয়ে হোটেল ভাড়া করে নেই। হোটেলের নাম শ্রীডিপ প্যালেস। হোটেল টি ভালোই। ওয়াইফাই স্পিডও বেশ। আপনারা দেখে, দরদাম করে তবেই রুম ভাড়া নিবেন। ফ্রেশ হয়ে শপিং করা জন্য চলে যাই এক সুপার শপ এ। সুপার শপটি বিশাল বড়। কিন্তু ১০ টায় শপ বন্ধ হয়ে যায়, তাই তেমন কিছু আর কিনতে পারিনাই। পরে নেতাজি হোটেল নামে এক ভাতের হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে নেই। হোটেলের রান্না সেই টেস্টি। আমরা বোয়াল মাছ, সবজি আর ভাত খাই। দাম নিল ৮০ রুপী। কথায় কথায় পরিচয় হল, হোটেলের মালিকের আদি বাড়ি আমাদের দেশেই। ৭১ এর পরে চলে গেছে। সবাই খুব ক্লান্ত, তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি।

দুপুর ৩ টায় আমাদের গাড়ি শিলিগুঁড়ি থেকে ছেড়েযাবে। আসার সময়ই আমরা শ্যামলী পরিবহনের রিটার্ন টিকেট কেটে আসছিলাম। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পাশেই এক রেস্টুরেন্টে ইন্ডিয়ান খাবার দিয়ে নাস্তা করে নিলাম। তার পর চলে যাই বিগ বাজারে। বিগ বাজার ইন্ডিয়ার চেইন সুপার শপ। প্রায় প্রত্যেক বড় বড় শহরেই এর ব্রাঞ্চ রয়েছে। ১০ টায় শপ খুললো, আমরা ভিতরে প্রবেশ করি। বিশাল বড় শপ, আকারে আমাদের দেশের সুপার শপ থেকে প্রায় ১০ গুন বড় হবে। আর হিউজ কালেকশন। দাম তুলনামূলক ভাবে আমাদের দেশ থেকে অনেক অনেক কম। এইজন্যই সবাই আমাদের দেশ থেকে ইন্ডিয়া যায় শপিং এর জন্য। মজার ব্যাপার হল কোনো অতিরিক্ত ভ্যাট নেয় না। পণ্যের গায়ে যা দাম লেখা আছে তাই রাখে। আমরা যার যার সাধ্যমত জিনিসপত্র কিনে নিলাম। আপনারা ইন্ডিয়া গেলে অবশ্যই একবার আসবেন বিগ বাজারে। এখানে শুধু আমাদের দেশের মতো চাল, ডাল না, সব ধরণের জামা কাপড়, কসমেটিক্স, খেলনা, জুতা, ব্যাগ, খাবার আইটেম ইত্যাদি সবই পাওয়া যায়। ২ টার দিকে বের হয়ে চলে আসি হোটেলে। ব্যাগ নিয়ে চলে যাই শ্যামলী কাউন্টারে। পাশেই এক রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। সবাই বিরানি খাই। টেস্ট খারাপ না। ৩ টার দিকে আমাদের গাড়ি ছেড়ে দিল।

বিগ বাজার, শিলিগুঁড়ি : নভেম্বর ২৭, সকাল ১০:০০

ইমিগ্রেশন এর অভিজ্ঞতা
এই কয়দিনে সকল ধরণের অনিয়ম, চুরি-বাটপারি সবই ভুলে গেছিলাম। কিন্তু বর্ডারে এসেই আবার সব কিছুর দেখা পাইলাম। ৬ তার দিকে আমরা চলে আসি চ্যাংড়াবান্ধা। ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন এর লোকজন তেমন ঝামেলা করলোনা। ব্যাগ হালকা-পাতলা চেক করে ছেড়ে দিল। ঝামেলা যা করার করলো আমাদের দেশের লোকজন। সবার কাছে থেকে ২০০ করে টাকা নিল ঠিকই কিন্তু এই সেই কত বাহানা। যাই হোক শ্যামলীর যাত্রী বলে একটু রক্ষা পাই। কিন্তু অন্যদের খুব ঝামেলা করল। অবাক লাগে পাশাপাশি দুই দেশের লোক অথচ আচরণে কত তফাৎ। বুড়িমারী বর্ডারেই আমাদের গাড়ি ছিল। আমরা উঠে পড়ি। সকাল ৮ টার দিকে ঢাকায় এসে পৌছাই।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। ভুটান ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

Published by রাশেদুল আলম

আমি পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। টেকনোলজি নিয়ে কাজ এবং লেখালেখি করলেও ঘুরে বেড়াতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। তাই যখনই সময় পাই বেড়িয়ে পরি। সবুজ প্রকৃতি আমায় সব সময়ই কাছে টানে। আমি অনেককেই দেখেছি কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই ঘুরতে বেড়িয়ে পরে। আর নানা ধরণের ঝামেলায় পরে। অথচ ইন্টারনেট ঘেটে একটু ধারণা নিয়ে আসলেই তাদের ট্যুর টা অনেক ভাল হতে পারতো। তাই নিজের অভিজ্ঞতা গুলোকে এখানে শেয়ার করার চেষ্টা করি, যাতে অন্যরা উপকৃত হতে পারে।

Join the Conversation

1 Comment

  1. ভাই সেই অভিজ্ঞতা হইছে দেখি আপনার। দারুন পোস্ট।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *