বাংলাদেশ

দুঃসাহসিক অভিযানে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ -পর্ব ২

Shadow
Slider

আগের লেখায় ১ম দুঃসাহসিক কাজ ট্রলারে সেন্টমার্টিন যাওয়া-আসার কথা বর্ণনা করা হয়েছিল। এবার ২য় দুঃসাহসিক কাজ পায়ে হেঁটে ছেড়া দ্বীপ যাওয়া-আসার কাহিনী আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি।

পায়ে হেঁটে ছেড়া দ্বীপ যাওয়া

যারা সেন্টমার্টিন যান তারা কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ছেড়াদ্বীপ ঢুঁ মেরে আসতে ভোলেন না! কারণ ছেড়াদ্বীপ বাংলাদেশের শেষ বিন্ধু দক্ষিণ অংশে। তাছাড়া প্রবালের সমারোহ ও নীলাব জলরাশির এক নৈসর্গিক উপভোগ্য তো আছেই। তো এবার আমার ছেড়াদ্বীপ যাওয়াটা একেবারেই ভিন্নভাবে পরিকল্পনা করেছি।

সকাল ৮ টায় ঘুম থেকে উঠে খিচুড়ি দিয়ে নাস্তা সেরে পশ্চিম সৈকত দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম আমরা ২ বন্ধু। আকাশে সূর্যের প্রখরতা এতই বেশি যে গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। মোবাইলে তাপমাত্রা ৩৩° দেখালেও, অনুভূত হচ্ছে ৩৮° এর মতো। সে যাই হোক যেহেতু রোমাঞ্চকর অভিযাত্রী তাই সাহস নিয়ে রওনা দিলাম।

প্রবালে নীলাভ জলরাশি আছড়ে পড়ছে, যেন কোন মায়াবী পরীর স্পর্শে ঢেউ সৃষ্টি হয়ে আমাদের সম্ভাষণ জানাচ্ছে। প্রায় ১ ঘন্টা হাঁটার পর নারিকেল গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছি, এমন সময় দেখলাম পাশের প্রান্থনিবাসে হ্যামক ঝুলছে আমাকে আর পায় কে ১০ মিনিট এই হ্যামকের দোলায় নিজেকে সতেজ করে নিলাম।

তারপর আবার হাঁটা শুরু হলো। এবার আমার চোখের সামনে দৃষ্টিগোচর হলো দিগন্তবিসৃত প্রবাল পাথরের সমারোহ। সেন্টমার্টিন কে কেন প্রবালদ্বীপ বলা হয় সেটা এখন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি। একপাশে সৈকতিনী প্রবালের আলিংগন আর অন্যপাশে কেয়া-নারিকেল গাছের মিতালী। দেখতে চমৎকার লাগছে। কেয়া গাছে পাঁকা হলুদ ফল এক অন্য আবেশ তৈরি করেছে।

গাছে উঠে ডাব পারা

আবারো বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসেছি, এমন সময় একজন বললো ডাব খাবেন কিনা বিনা দ্বিধায় বলে দিলাম খাবো আমাদেরকে নারিকেল গাছের নিচে নিয়ে গেলেন। দেখলাম গাছগুলো ১২ ফিটের মত লম্বা। দেখেই আমার মাথায় রোমান্স-কাব্যের উদয় হলো। বললাম আমি নিজ হাতে ডাব পারবো।

যে কথা সেই কাজ; গাছে উঠে পছন্দমত ২ টি পেড়ে নেমে গেলাম। ওখানে ডাব খেয়ে মালিককে ১০০ টাকা দিয়ে আবার হাঁটা শুরু হলো।

এখন বাজে দুপুর ১২ টা, দক্ষিন পাড়ায় আমাদের অবস্থান। প্রবালের উপর স্থিরচিত্র নেওয়া হলো। খানিক দূরে একজন মানুষ বসে কি যেন ভাবছে আমরা কিছুটা অবাক হলাম। কারণ এই রৌদ্রময় ভরদুপুরে এখানে বসে থাকা সম্ভব না। কৌতুহলি মন কাছে নিয়ে গেল।

গিয়ে তো আমরা অবাক আরে এ তো মানুষ নয়। মানুষের মত দেখতে হুবুহু পাথর। হ্যা এটাই সেই মানুষরুপী পাথর, যেটা সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ – পশ্চিম সৈকতে হাজার বছর ধরে এভাবে ধ্যানে মগ্ন রয়েছে। এখানে কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত করে আবারো হাঁটা শুরু হলো।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর ঐ দূরে তালগাছ দেখা যাচ্ছে। এতদিন জানতাম সেন্টমার্টিনকে নারিকেল জিঞ্জিরা বলে ডাকা হতো, আর এখন দেখছি এখানে তালগাছ ও রয়েছে। তাহলে আপনারাই বলুন আর কি নামে ডাকা যায় এই সেন্টমার্টিন কে? এবার আমরা প্রায় ছেড়াদ্বীপের কাছাকাছি চলে এসেছি। অর্থাৎ যেখানে জোয়ারের পানি মূল দ্বীপ থেকে ছেড়াদ্বীপ কে আলাদা করেছে।

জোয়ার আসতে শুরু হওয়ায় হাটু পানি পার হয়ে ছেড়াদ্বীপ চলে যাই। এখানে একমাত্র মহিলার রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ফেরার জন্য রওনা দিলাম। ওমা জোয়ারের পানি দেখি বুক সমান হয়ে গেছে! নিরুপায় দেখে ভিজে পার হলাম। পার হতে গিয়ে অসাবধানবশত প্রবালে পা কেটে গেলো সামান্য।

সেন্টমার্টিনে ফিরে

সময় এখন ২.৩০ টা। এবার সেন্টমার্টিনে ভিতরের গ্রাম দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। সাধারণত আমরা সবাই সেন্টমার্টিনের সৈকতপাড় দেখেই অনুমান করি এটা হয়ত খুব ছোট্ট এলাকা বা লোকজন নাই বললেই চলে। কিন্তু বাস্তবে এই দ্বীপে ১০ হাজারের ও বেশি মানুষের স্থায়ী বসবাস রয়েছে।

এখানে ধান, সবজি, পুকুরে মাছ পর্যন্ত চাষ হয়। গবাদি পশু রয়েছে প্রচুর। মাদ্রাসা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও আছে। হেঁটে হেঁটে নারিকেল জিঞ্জিরার নৈসর্গিক গ্রাম দেখতে দেখতে যখন আমাদের রুমে পৌঁছাই, তখন বিকেল ৫ টা।

রুমে এসেই হোটেলের সামনের সৈকতে গোসল কর‍তে নেমে গেলাম। প্রায় ১ ঘন্টা নীল নোনা জলরাশীতে গোসল করে বাজারে চলে গেলাম খাবার খাওয়ার জন্য। কোরাল বার-বি-কিউ, চিংড়ি ফ্রাই ও পরোটা অর্ডার দিয়ে ঘাটে চলে যাই আড্ডা দেওয়ার জন্য।

বাতাসের হু হু আওয়াজ, নৌকার নিয়নবাতি ও ঢেউয়ের গর্জন এক অন্য আবেশের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। প্রায় ১ ঘন্টা আড্ডা দিয়ে রাতের খাবার খেয়ে সৈকতের বালুকাবেলায় হাঁটতে হাঁটতে আমাদের হোটেলের সামনের সৈকতে এসে রাতের ছায়াপথ দেখছি আর আবৃত্তি করছি।

আকাশ বুড়ো সে চমকিয়ে কয়ঃ কার কথা শুনি এইখানে? তাহারা কহিলঃ তাই ত! দেখ ত উপর- তলার আসমানে! চাঁদ কহেঃ হাঁ! হাঁ! মাটির মানুষ হবেই এ ঠিক! তারি এ – স্বর! কয় ছায়াপথঃ আমাদেরি মাঝে লুকানো কি সে ধূর্ত নর! রিদওয়ানই শুধু চিনিল আমারে – আমার করুণ কান্নাতে, দেখেছিল সে যে আমারে সেদিন- ছাড়িনু যেদিন জান্নাতে!

রাত প্রায় ১ টা বাজে, ঘুমে চোখ ঢলঢল করছে। রুমে এসে ঘুম দিলাম। সকাল ৭ টায় ঘুম থেকে উঠে ব্যাগ নিয়ে চলে গেলাম বাজারে। পরোটা, ডিম-ডাল দিয়ে নাস্তা সেরে ১০ টার ট্রলারে টেকনাফের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

সে একই পথে নৈসর্গিক – অপরুপ দৃশ্য দেখতে দেখতে দুপুর ১ টায় টেকনাফ পৌঁছে লোকাল সিএনজি নিয়ে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে কক্সবাজার পৌঁছাই বিকেল ৪ টায়। আর এর সাথেই শেষ হয়ে ও হইল না আমার দুঃসাহসিক অভিযানে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ।

পরবর্তীতে অন্যকোনো অভিযান নিয়ে হাজির হবো খুব শীগ্রই। ভালো থাকুন।

পায়ে হেঁটে ছেড়া দ্বীপ ভ্রমণ সারাংশ

  • আজকের খরচঃ ১০১০ টাকা।
  • একজন ভ্রমণকারী হিসেবে পায়ে হেঁটে ছেড়াদ্বীপ যাওয়ায় পরামর্শ দিচ্ছি।
  • সেন্টমার্টিনকে কেন প্রবালদ্বীপ বলা হয়, সেটা পশ্চিম দিক দিয়ে হেঁটে গেলেই বুঝা যায়।
  • যারা নিরিবিলি সময় উপভোগ করতে চান, তারা দক্ষিণপাড়ায় যেকোনো রিসোর্টে থাকতে পারেন।
  • ভ্রমণ তারিখঃ ১২/১০/২০ ইং

ভ্রমণ হোক আনন্দময় ও উপভোগ্য।

5 2 ভোট
রেটিং

লেখক

আসিফ হায়দার
0 মন্তব্য
Inline Feedbacks
সব মন্তব্য দেখুন
''
0
আমরা আপনার অভিমত আশা করি, দয়াকরে মন্তব্য করুনx
()
x