দোচুলা পাস – ভুটানের সব থেকে সুন্দর পাস | ভুটান ভ্রমণ -পর্ব ৩

দোচালা পাস বা দোচুলা পাস (Dochula Pass) ভুটানের সব থেকে সুন্দর পাস। এটি রাজধানী থিম্পু থেকে পুনাখা শহরে যাবার পথে পরে। পাহাড়ী এলাকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবার সময় দুই স্থানের মাঝখানের সব থেকে উঁচু জায়গাকে পাস বলে। দোচুলা পাস থিম্পু থেকে পুনাখা যাবার পথের সব থেকে উঁচু জায়গা যার উচ্চতা প্রায় ১০০০০+ ফিট। আপনাদের আজ আমি আমার দোচুলা পাস ঘুরার গল্প বলবো।

dochula-pass
দোচুলা পাস

নভেম্বর ২৪, ২০১৭। সকাল সকাল নাস্তা সেরে আমরা পুনাখা শহর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু করি। আমরা আগের রাতেই এর জন্য বড় একটি জিপ গাড়ি ভাড়া করে রাখি। পুনাখা যাবার জন্য আলাদা করে পারমিশন নিতে হয়, যা আমরা আগের দিনই থিম্পু থেকে নিয়ে রেখেছি। যেটা নিয়ে গত পর্বে কিছু তথ্য দিয়ে ছিলাম। কেউ পরে না থাকলে পরে নিতে পারেন। থিম্পুতে বড় গাড়ি একটু নিচের দিকে স্টেডিয়ামের পাশে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে ভাড়া করা যায়। না চিনলে পুলিশকে জিজ্ঞেস করবেন। উনারা দেখায় দিবে। আমরা সাঙরু নামে এক ড্রাইভারকে পেয়ে যাই। আমরা ৩ দিনের জন্য ১১০০০ রুপী দিয়ে তার গাড়ি ভাড়া করি। পুনাখা শহর যাবার জন্য জন্য ৩৫০০, পারো যাবার জন্য ৩৫০০, পারো থেকে ইন্ডিয়ার হাসিমারা পর্যন্ত আসার জন্য ৪০০০, এই মোট ১১০০০ রুপী। হাসিমারা এসে ৫০০ রুপী তাকে বকশিস দিয়েছিলাম। সাঙরু খুব ভালো মানুষ, ভালো গাড়ি চালায়, আর ভালো গাইড ও বটে। আমাদের কাছে ভাড়াও একটু কম নিয়েছিল। ভুটানে পরবর্তী সব দিন গুলো সে আমাদের সাথে ছিল।

bhutan trip
আপেল বাগানের পাশেই আপেল শপ: নভেম্বর ২৪, সকাল ৯:৫০

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলছে। যতদূর চোখ যায় শুধু বিশাল বিশাল পাহাড় আর পাহাড়। সবগুলা পাহাড় কাছাকাছি আর উঁচু উঁচু এক ধরণের পাছপালায় ভর্তি। চারিদিকের সব কিছু সবুজ আর সবুজ। মাঝে মাঝে রয়েছে আপেল, বেদনা ইত্যাদি বিভিন্ন ফলের বাগান। আশপাশ জনমানব শুন্য। অনেক দূর পর পর পুলিশের গাড়ি আর কিছু মহিলাদের ফলের দোকান সাজিয়ে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আমরা গাড়ি থামিয়ে কিছু আপেল কিনে নিলাম। আপেল গুলা একদম ফ্রেশ। মনে হল কেবলই গাছ থেকে পেরে এনেছে। খেতে দারুন লাগলো। দোকানের পাশেই মেহেদী ভাই একটা খালি পানির বোতল ফেলে দিল, আর সাথে সাথেই এক মেয়ে বললো পুলিশ দেখলে ৩০০০ রুপি জরিমানা করবে। সাথে সাথে ওটা আবার আমরা গাড়িতে তুলে ফেলি। আপনার কিন্তু ভুলেও এই কাজ টি করবেন না।

dochula pass
দোচুলা পাস এর ভিউ: নভেম্বর ২৪, সকাল ১০:৩০

দোচুলা পাস
দোচুলা পাস রাজধানী থিম্পু থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দুরুত্বে অবস্থিত। এটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০২০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। এটি ভুটানের সব থেকে পরিচিত এবং সুন্দর পাস। ভুটানের বর্তমান রাজধানী থিম্পু থেকে পূর্বের রাজধানী পুনাখা যেতে হলে এই পাস অতিক্রম করেই যেতে হয়। এটি প্রায় সময়ই সাদা মেঘে ঢাকা থাকে। এই চুড়ায় রয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, মন্দির, দূরে দেখার জন্য বড় একটি দূরবীক্ষিন যন্ত্র, ক্যাফেটেরিয়া, আর সুন্দর বাগান। বেশ কয়েক বছর আগে ভারতীয় বিদ্রোহীরা (আসামের উলফা) ভূটানের সীমানা ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চেয়েছিল। ভূটানের তৎকালীন রাজা জিগমে সিংহে ওয়াংচুক এই বিদ্রোহীদের দমন করেন। এইখানেই ২০০৩ সালে ভারতীয় বিদ্রোহীদের সাথে ভুটানি সৈন্যদের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে বেশ কিছু ভূটানীজ সৈন্য মারা যায়। রানীমাতা আসি দরজি ওয়াংমু ওয়াংচুক এই মন্যুমেন্ট তৈরী করান সেই সব ভূটানীজ সৈনিকদের স্মরণে। ২০০৪ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। স্তম্ভে এক সাথে একশত আটটি স্টুপার রয়েছে। এর তিনটি স্তর আছে। প্রথম স্তরে আছে ৪৫ টি স্টুপার, দ্বিতীয় স্তরে ৩৬ টি স্টুপার, শেষ স্তরে ২৭ টি স্টুপার। আর মাঝ খানে রয়েছে বড় একটি স্টুপার।

duchola pass
দোচুলা পাসে আমরা: নভেম্বর ২৪, সকাল ১০:৩৫

দোচুলা যাবার রাস্তাটিও বেশ চমৎকার। মাঝে মাঝে মেঘ এসে রাস্তা ঢেকে দেয়। রাস্তার দুইপাশে বেশ লম্বা লম্বা গাছ। প্রায় সবগুলো গাছের ডাল নিচের দিকে হেলানো। ড্রাইভার জানালো ডিসেম্বর-জানুয়ারির দিকে এখানে অনেক ভারি তুষারপাত হয়। সেই তুষারপাতের চাপে ডাল গুলোর এই অবস্থা। কিছুক্ষন পরেই আমরা চলে আসলাম দোচুলা পাস। পাহাড়ের চূড়ায় সুন্দর এক নিদর্শন। গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই বেশ ঠান্ডা অনুভব করলাম। বাতাস ও রয়েছে ভাল। আমরা হেটে এর উপরে উঠে গেলাম। উঠার সাথে সাথেই সবার শাসকস্ট হতে লাগল। অতিরিক্ত উচ্চতা আর কম অক্সিজেনের জন্যই এমনটা হয়। আমরা একটু রেস্ট নিয়ে নরমাল হবার চেষ্টা করি। এর একপাশ অনেক খারা এবং ঢালু। যাদের উচ্চতায় সমস্যা আছে তারা একটু সাবধানে যাবেন। আমরা ঘুরে ঘুরে দোচুলার অপূর্ব দৃশ্য দেখি আর প্রচুর ছবি তুললাম। দুর্ভাগ্য দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে কিছু দেখতে পারলাম না। ওটা নাকি রাজার বিশেষ মেহমানের জন্য। সেখানে আমাদের অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত এক পরিবারের সাথে কথা হল। তারাও আমাদের মতো ভুটান ভ্রমণে এসেছে।

মেঘ, বৃষ্টি আর কুয়াশা না থাকলে এখান থেকে হিমালয় পর্বতমালার মোট দশটি পর্বতচুড়া দেখা যায়। এটি ভুটানের অন্যতম একটি দর্শনীয় ও পবিত্র স্থান। পাহাড়ের চূড়ায় এ জায়গাটি একেবারেই ছবির মতো সাজানো৷ ভুটান ভ্রমণে গেলে সবাই অবশ্যই এই জায়গাটি ঘুরে দেখবেন। জায়গাটিতে নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে বরফ পড়ে। এখানে একটি সুন্দর ক্যাফেটেরিয়া আছে। ইচ্ছে হলে কফি-স্ন্যাকস খেয়ে নিজেকে চাঙা করে নিতে পারেন। কারো যদি পুনাখায় যেয়ে রাফটিং করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে এখান থেকেই যোগাযোগ করতে পারেন। এই ক্যাফেটেরিয়াতেই যোগাযোগের ফোন নম্বর দেয়া আছে। যারা মোটর বাইক ভাড়া নিতে চান তারাও এই খান থেকে নিতে পারেন

dochula-pass
দোচুলা পাসে আমি: নভেম্বর ২৪, সকাল ১০:৩৭

সতর্কতা
অতিরিক্ত উচ্চতার কারণে মাউন্টেন সিকনেস হতে পারে। এতে শরীরের অক্সিজেন লেভেল কমে যায়। তাই শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘুড়ানো বা বমি হতে পারে। তাই বেশি বেশি করে পানি খাবেন। কিছু ঔষধ আছে যা দেহের অক্সিজেনর পরিমান বাড়ায়। সেগুলা খেতে পারেন। খুব বেশি কিনারে যাবেন না, পা পিছলে পরে যেতে পারেন। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। ভুটান ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন।। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!>

2 Comments

  1. অনেক সুন্দর জায়গা। ছবি দেখেই যেতে ইচ্ছা করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *