কুয়াকাটা (Kuakata Sea Beach) বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থিত এক সুন্দর সমুদ্র সৈকত ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র। এটি দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। এই বৈশিষ্ট একে অন্য সব সৈকত থেকে আলাদা করেছে। এর দৈর্ঘ প্রায় ১৮ কিলোমিটার। অপরূপ সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকরা একে বলে “সাগর কন্যা”।

কুয়াকাটা কোথায় অবস্থিত?
কুয়াকাটা বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার লতাচাপলী ইউনিয়নে অবস্থিত। ঢাকা থেকে সড়কপথে এর দূরত্ব প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার, পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার, এবং বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার।

কুয়াকাটার ইতিহাস
কুয়াকাটা নামকরণে সাথে রাখাইনদের ইতিহাস জড়িত। ১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজা বোদ্রোপা আরকান রাজ্য জয় করে নেয়। তিনি রাখাইনদের ওপর অনেক অত্যাচার ও নির্যাতন শুরু করে দেন। তাদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে রাজ্যের মেঘাবর্তী হতে ১৫০টি রাখাইন পরিবার বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা থানাধীন মৌডুবি এলাকায় চলে আসে। কথিত আছে তারা ৫০ টি নৌকা দিয়ে আসে এবং তাদের সময় লেগেছিলো তিন দিন তিন রাত। উক্ত অঞ্চলটি তখন বন জঙ্গলে ভর্তি ছিল। তার বনের হিংস্র জীব জন্তুর সঙ্গে যুদ্ধ করে, জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে চাষাবাদ শুরু করেন।

জনসংখ্যা বাড়ার কারণে এক পর্যায়ে তারা চলে আসে কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের সাগর পাড়ে। সাগর পাড়ে এসে তাদের পানীয় জলে অভাব দেখা দেয়। মিঠা পানির জন্য তারা এখানে একটি কুয়া খনন করে। এখানে কুয়া কাটার জন্য এলাকাটির নাম আসতে আসতে হয়ে পরে কুয়াকাটা। সেই প্রাচীন কুয়াটি এখনো বিদ্যমন।

কুয়াকাটার দর্শনীয় স্থান
কুয়াকাটায় সমুদ্র সৈকত ছাড়াও আসে পাশে রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। এই স্থানগুলোর বেশির ভাগই জিরো পয়েন্ট মানে প্রধান বিচ থেকে পশ্চিম এবং পূর্ব দিকে অবস্থিত। পশ্চিম দিকের স্থানগুলো হলো: শুঁটকি পল্লী, লেবুর চর, ঝিনুক বীচ, ফাতরার বন, ঝাউ বন, তিন নদীর মোহনা। পূর্ব দিকের স্থানগুলো হলো: কুয়াকাটা বৌদ্ধ মন্দির, ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী নৌকা, কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান, কুয়াকাটার কুয়া, কাউয়ার চর, চর গঙ্গামতী, লাল কাঁকড়ার চর, রূপালী দ্বীপ, রাখাইন পল্লী, বার্মিজ মার্কেট ইত্যাদি।

কুয়াকাটা যাবার উপায়
কুয়াকাটা সড়ক পথে বা নদী পথে যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী বাস স্ট্যান্ড থেকে দ্রুতি পরিবহন, সাকুরা পরিবহন, সুরভী পরিবহনের বাস করে কুয়াকাটা যাওয়া যায়। এসব বাসের জনপ্রতি ভাড়া ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। এসি বাসের ভাড়া ১০০০ টাকা। এছাড়াও প্রতিদিন সকাল ও রাতে কমলাপুর বিআরটিসি বাস ডিপো থেকে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। বাসগুলো আপনাকে একদম বীচের কাছেই নামিয়ে দিবে। হেঁটেই বীচে চলে যেতে পারবেন।

এছাড়া প্রতিদিন ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বেশ কিছু লঞ্চ পটুয়াখালীর উদ্দেশে ছেড়ে যায়। লঞ্চ গুলো বিকাল ৫ টা থেকে সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে যাত্রা শুরু করে। ভাড়া ৮০০ থেকে ১৮০০ টাকা। ডেকে গেলে আরো কম। যেকোনো একটায় চেপে চলে আসতে পারেন পটুয়াখালী। পরে সেখান থেকে বাস, মোটর সাইকেল, প্রাইভেট কার নিয়ে চলে যাবেন কুয়াকাটা। পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটার দুরুত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। বাস বাড়া ১৩০-১৫০ টাকা।

এছাড়া বরিশাল পর্যন্ত লঞ্চ বা প্লেনে এসে সেখান থেকে সড়ক পথে আসতে পারেন কুয়াকাটা। বরিশাল থেকে কুয়াকাটার দুরুত্ব প্রায় ১০৮ কিলোমিটার। তবে সব কিছু বিবেচনা করে ঢাকা থেকে এসি বাসে গেলেই ভাল। ফেরিঘাটে অপেক্ষা করা লাগেনা। আর ঘুরাঘুরির জন্য সময় একটু বেশি পাওয়া যায়। কারণ বাসগুলো সন্ধ্যা সাত টার পর কুয়াকাটা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। যেখানে লঞ্চ ছাড়ে বিকালে।

কুয়াকাটায় কিভাবে ঘুরাঘুরি করবেন
কুয়াকাটার রাস্তা ঘাট তেমন উন্নতমানের না। সব সময়ই বীচ দিয়েই চলাফেরা করা লাগে। আর বালুময় এই বীচের সব থেকে ভালো বাহন হচ্ছে মোটর সাইকেল। ঢাকার পাঠাও বা উবারের মতো এখানে মোটর সাইকেল পাওয়া যায়। তবে বুকিং দিতে অ্যাপস লাগেনা। ড্রাইভাররাই রিকশার মতো আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। পিছনে ১-২ জন নিয়ে খুব সহজে আর দ্রুত বিভিন্ন পয়েন্টে চলে যায়। এতে খরচ ও সময় কম লাগে।

তবে এক সময় কেবল মোটর সাইকেলই একমাত্র বাহন ছিল। এখন ব্যাটারি চালিত অটো রিকশা বা টেম্পু পাওয়া যায়। এগুলা দিয়ে বীচের বালুময় পথে খুব সহজে যাওয়া যায়। যারা ফ্যামিলি নিয়ে যাবেন তাদের জন্য মোটর সাইকেল সব সময় উপযুক্ত না। তাদের জন্য ব্যাটারি চালিত অটো রিকশা বা টেম্পু সব থেকে ভালো। সব জায়গায়ই এগুলা নিয়ে যাওয়া যায়।

ড্রাইভাররা আপনারে ১২ স্পট, ১৪ স্পট বলে প্রিন্ট করা ছবি দেখিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। আপনি দরদাম করে ভাড়া ঠিক করে নিবেন। ওরা ছবিতে যেমন দেখাবে আসলে স্পট গুলো তেমন না। অনেক গুলোই আসা যাওয়ার মাঝেই পরে।

কুয়াকাটায় কোথায় থাকবেন
কুয়াকাটায় বিভিন্ন মানের হোটেল, কটেজ রয়েছে। এগুলার ভাড়া ৫০০ থেকে ১০০০০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়। মোটামোটি মানের এক রুম ১০০০ থেকে ১৫০০ থাকায় পাওয়া যায়। আপনার বাজেট বিবেচনা করে যেকোন একটা বাছাই করে নিবেন। সিজন বা সরকারি ছুটির দিনে একটু প্রেসার থাকে। তাই সে সময় আগে থেকে বুকিং করে গেলে ভালো। তবে অবশ্যই দরদাম করে নিবেন।

কুয়াকাটা ট্যুর প্ল্যান
কুয়াকাটা ঘুরার জন্য তিন রাত দুই দিন যথেষ্ট। একটু টাইট হলেও দুই দিন পর দেখার মত আর কিছু থাকেনা। তবে আপনি চাইলে একরাত বেশি থাকতে পারেন। রাতের লঞ্চ বা বাসে রওনা দিলে সকালেই চলে আসবেন কুয়াকাটা।

প্রথম দিন:
সকালে এসেই হোটেলে চেকইন করে একটু রেস্ট নিয়ে চলে যাবেন সমুদ্রে। দুপুর পর্যন্ত বীচে কাটিয়ে চলে আসবেন হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে চলে যাবেন পশ্চিম দিকে। ড্রাইভারকে বলবেন আপনি তিন নদীর মোহনা পর্যন্ত যাবেন, ফেরার পথে লেবু বাগানে সূর্যাস্ত দেখে ফিরবেন। মোটর সাইকেলে ভাড়া নিবে ৬০০-৮০০ টাকা। আর অটোতে ১০০০-১২০০ টাকা। যাবার পথে প্রথমেই পরবে শুঁটকি পল্লী। এখানে জেলেরা মাছ শুকিয়ে শুঁটকি বানায়। চাইলে কিনে নিতে পারেন। এর পর আসবে লেবু বাগান। জায়গায় অসাধারণ। এখান থেকেই সূর্যাস্ত দেখে বেশি ভালো লাগে। তাই না থেমে সামনে এগিয়ে যাবেন। একটু পর আসবে ঝিনুক বীচ। দেখার মতো কিছুই নাই। এখানে নাকি ঝিনুক একটু বেশি পাওয়া যায়। তবে আপনি নাও পেতে পারেন। এর পর চলে যাবেন ফাতরার বন। জায়গাটা দারুন। অপর পারে আছে সুন্দর বনের কিছু অংশ, যাকে লোকজন বলে ফাতরার বন। তবে এখান থেকে বনে যাওয়া যায়না। যেতে হলে কুয়াকাটা বীচ থেকে ট্রলারে যেতে হয়। কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে চলে যাবেন পাশের ঝাউ বনে। দারুন সুন্দর জায়গা। ছবি তুলে অনেক ভাল লাগবে। এর পর চলে যাবেন তিন নদীর মোহনায়। এখানে তিন নদী এসে মিশেছে। এখানকার ভিউ দারুন।

কিছুক্ষন সময় কাটিয়ে ফেরার পথে থামবেন লেবু বনে। লেবু গাছ না থাকলেও জায়গাটা অসাধারণ। পাশেই বিভিন্ন রকমের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। বললে তারা ফ্রাই করে দিবে। মাছের ফ্রাই খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখেতে অন্নরকম লাগবে। সূর্যাস্ত দেখে ফিরে যাবেন হোটেলে। তবে কাল সূর্যোদয় দেখতে যেতে হলে রাতেই যানবাহন ঠিক করে রাখবেন। তাহলে সময়মতো তারা চলে আসবে। সূর্য উঠার ১ ঘন্টা আগে রওনা দিতে হয়।

দ্বিতীয় দিন
ভোর ৪:৩০ এর দিকে হোটেল থেকে রওনা দিবেন। গঙ্গামতির চর থেকে সূর্যোদয় দেখে ফেরার পথে লাল কাঁকড়ার চর, বৌদ্ধ মন্দির, ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী নৌকা, কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান, কুয়াকাটার কুয়া দেখে নিবেন। তবে সূর্যোদয় গঙ্গামতির চর থেকে কাউয়ার চর এ ভালো দেখা যায়।

Published by রাশেদুল আলম

আমি পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। টেকনোলজি নিয়ে কাজ এবং লেখালেখি করলেও ঘুরে বেড়াতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। তাই যখনই সময় পাই বেড়িয়ে পরি। সবুজ প্রকৃতি আমায় সব সময়ই কাছে টানে। আমি অনেককেই দেখেছি কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই ঘুরতে বেড়িয়ে পরে। আর নানা ধরণের ঝামেলায় পরে। অথচ ইন্টারনেট ঘেটে একটু ধারণা নিয়ে আসলেই তাদের ট্যুর টা অনেক ভাল হতে পারতো। তাই নিজের অভিজ্ঞতা গুলোকে এখানে শেয়ার করার চেষ্টা করি, যাতে অন্যরা উপকৃত হতে পারে।

Join the Conversation

2 Comments

  1. আমি পেশায় একজন সাংবাদিক । আপনার সাথে লেখালেখি সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছি । আমার মেইল এড্রেস – anandomostofa@gmail.com

    একটা মেইল করলে খুশি হব ।

  2. দারুন হয়েছে। অনেক কিছু জানলাম। ঢাকা থেকে বাস বা লঞ্চ কোনটায় গেলে ভাল হয়, আপনার মতে। সামনে জাবার ইচ্ছা আছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *