চট্টগ্রাম বিভাগের দর্শনীয় স্থান

নাফাখুম জলপ্রপাত

Loading

নাফাখুম জলপ্রপাত

নাফাখুম জলপ্রপাত (Nafakhum Waterfall) বাংলাদেশের সব থেকে বড় জলপ্রপাত। দেশের অন্য সকল জলপ্রপাত থেকে এর পানি প্রবাহ বেশি। তাই অনেকেই একে বলে থাকে বাংলার নায়াগ্রা। আপনি যদি এডভেঞ্চার প্রিয় হন এবং ট্রেকিং করতে ভালো লাগে তাহলে যৌবন থাকতে একবারের জন্য হলেও ঘুরে আসুন নাফাখুম।

নাফাখুম জলপ্রপাত কোথায় অবস্থিত

নাফাখুম জলপ্রপাত (Nafakhum Jolopropat) বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে অবস্থিত। ঢাকা থেকে বান্দরবান জেলার দূরত্ব প্রায় ৩২৫ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার। বান্দরবান শহর থেকে থানচি উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৭৯ কিলোমিটার। থানচি বাজার থেকে নৌপথে রেমাক্রির দুরুত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার। রেমাক্রি থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে নাফাখুম।

নাফাখুম জলপ্রপাত কখন যাবেন

নাফাখুম সব সময়ই যাওয়া যায়। একেক সময় এর একেক রূপ। বর্ষা কালে পানির প্রবাহ বেশি থাকে। আর শীত কালে কমে যায়। কিন্তু একেবারেই ফুরিয়ে যায়না। তাই নাফাখুম যাওয়ার সব থেকে ভাল সময় হলো বর্ষার পর পর আর শীতের একটু আগে। মানে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসে।

কেননা ভরা বর্ষায় সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার কাছাকাছি থাকায় প্রশাসন থেকে অনেক সময় অনুমতি দেয়না। জোকের প্রাদুর্ভাব একটু বেশি থাকে। পথ পিচ্ছিল হয়ে যায়, যখন তখন বৃষ্টি একটা সমস্যা তৈরী করে।

নাফাখুম জলপ্রপাত কিভাবে যাবেন

নাফাখুম যেতে হলে আপনাকে প্রথমেই আসতে হবে বান্দরবান জেলায়। তার পর সেখান থেকে থানচি উপজেলা। থানচি বাজার থেকে নদী পথে রেমাক্রি বাজার। রেমাক্রি বাজার থেকে ট্রেকিং করে পৌঁছাবেন নাফাখুম।

রাজধানী ঢাকার কলাবাগান, আরামবাগ থেকে শ্যামলী, হানিফ, সেন্টমার্টিন, দেশ ইত্যাদি পরিবহন কোম্পনীর এসি, নন-এসি, হুন্দাই বাস প্রতিদিন বান্দরবান শহরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং ঢাকায় ফিরে আসে। জনপ্রতি বাস ভাড়া নন-এসি ৫৫০-৭৫০, এসি ১২০০-১৫০০ টাকা। রাতের বাসে রওনা দিলে সকাল ৭ টার মধ্যে চলে আসবেন বান্দরবান।

এছাড়া ট্রেন বা প্লেনে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এসে, চট্টগ্রাম থেকে বাস, প্রাইভেট কার নিয়ে বান্দরবান আসতে পারেন। বদ্দারহাট, ধামপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে বাস পাওয়া যায়। ভাড়া ২২০ টাকা। মাইক্রোবাস ভাড়া ৩০০০-৩৫০০ টাকা।

বান্দরবান থেকে থানচি

বান্দরবান থেকে থানচি বাস বা রিজার্ভ জীপ/চান্দের গাড়িতে যাওয়া যায়। বান্দরবান শহরের থানচি বাস স্ট্যান্ড থেকে এক ঘন্টা পর পর বাস ছাড়ে। জনপ্রতি ভাড়া ২০০ টাকা, সময় নিবে ৪-৫ ঘন্টা। জীপ/চান্দের গাড়ির ভাড়া প্রশাসন থেকে ৬০০০ টাকা বেঁধে দিয়েছে। তবে চান্দের গাড়ির স্ট্যান্ডের একটু আগে থেকে নিলে ৫০০-১০০০ টাকা কমে পেতে পারেন।

টিম বড় হলে চান্দের গাড়ির নিয়ে যাওয়াই ভালো। সময় নিবে ৩-৩.৫০ ঘন্টা। এক গাড়িতে ১০-১২ জন বসা যায়। যাবার পথে মিলনছড়ি, চিম্বুক পাহাড়, নীলগিরি ছাড়াও চারপাশের অপূর্ব সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ দেখতে পারবেন, দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে পারবেন।

থানচি থেকে রেমাক্রি

থানচি বাজারে বিজিবি ক্যাম্প থেকে গাইডের তালিকা করে দেয়া আছে। সেখান থেকে আপনাকে একজন গাইড নিতে হবে, এটি নেয়া বাধ্যতামূলক। সেই দিন সাথে গিয়ে পরের দিন ফিরে আসা পর্যন্ত গাইড ভাড়া ১৫০০ টাকা। এর পর সবার নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার, বাসার ফোন নাম্বার, ন্যাশনাল আইডির কপি, কোথায় যাবেন, কয়দিন থাকবেন ইত্যাদি সব কাগজে লিখে থানা এবং বিজিবি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হবে। থানায় সবার গ্রূপ ছবি তুলে রাখবে। সব ক্ষেত্রে গাইড আপনাকে সাহায্য করবে।

মনে রাখবেন বিকাল তিনটার পরে আর কোনো অনুমতি দেয়া হয় না। তাই এর আগেই আপনাকে থানচি পৌঁছাতে হবে। নাহলে সেই দিন থানচি থেকে পরের দিন রওনা দিতে হবে। ৫০ টাকা করে লাইফ জ্যাকেট ভাড়া পাওয়া যায়। বর্ষাকাল হলে সবার জন্য ১ টা, না হলে অন্তত যারা সাঁতার জানেনা তাদের জন্য ১ টা করে নিয়ে নিবেন।

প্রশাসন থেকে অনুমতি পাবার পর থানচি ঘাট থেকে ছোট ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করতে হবে। সেই দিন গিয়ে পরের দিন ফেরত নিয়ে আসা পর্যন্ত নৌকা ভাড়া ৪৫০০ টাকা। এটা প্রশাসন থেকে ফিক্সড করে দিয়েছ। এক নৌকায় ৪-৫ জন বসা যায়। রেমাক্রি পৌঁছাতে সময় নিবে ২.৫ ঘন্টার মতো। নদীতে পানি কম থাকলে কোথাও কোথাও একটু নেমে হেটে যেতে হতে পারে।

যাত্রাপথে সাঙ্গু নদীর অপূর্ব রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন। এছাড়া পথেই পরবে পদ্মমুখ, তিন্দু, রাজাপাথর, বড়পাথর এবং রেমাক্রি ফলস। নিরাপত্তার কারণে সব জায়গার থামা যায় না। তবে বড়পাথর এলাকায় নেমে ছবি তুলতে পারবেন। রেমাক্রি ফলস এ নেমে গুসল করে দারুন মজা পাবেন। নদীর শীতল জল আপনার দেহ ঠান্ডা করে দিবে।

রেমাক্রি থেকে নাফাখুম

রেমাক্রি পৌঁছাতে বিকাল হয়ে গেলে সেই দিন রাতে এখানে থেকে পরের দিন সকালে নাফাখুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। রেমাক্রি থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে আরো একজন স্থানীয় গাইড নিতে হবে যা থানচি থেকে আসা গাইড ঠিক করে দিবে। এই স্থানীয় গাইড আপনাকে নাফাখুম নিয়ে যাবে।

চেষ্টা করবেন সকাল সকাল (সূর্য উঠার ১ ঘন্টার মধ্যে) যাত্রা শুরু করতে। তাহলে সূর্যের তেজ থেকে বাঁচা যাবে। যদি ওই দিনই থানচি ফিরতে চান তাহলে ব্যাগ কর্টেজে রেখে সাথে গুসল করার জন্য অল্প কিছু জামাকাপড় নিয়ে নিবেন। ভালো হয় সবার কাপড় এক ব্যাগে রেখে স্থানীয় গাইডের কাঁধে দিয়ে দিবেন।

সাথে কিছু শুকনো খাবার ছাড়া কোনো প্রকার পানিয় জল নেয়ার প্রয়োজন নাই। একটু পর পর ছোট ছোট ঝিরি, ঝর্ণা পাবেন। সেগুলার পানি খাবেন, একদম ফ্রেশ। নাফাখুমে অল্প কিছু দোকান রয়েছে। দরকার হলে কিনে খেতে পারবেন। দুপুরে কি খাবেন তা বলে যাবেন। তাহলে তারা রান্না করে রাখবে।

রেমাক্রি খাল ধরে পায়ে হেঁটে নাফাখুম পৌঁছাতে ২ থেকে আড়াই ঘন্টা সময় লাগবে। তবে সবার হাঁটার শক্তি ভালো থাকলে আরো কম সময় লাগবে। মাঝে মাঝে খাল ২-৩ বার এপার ওপার করতে হবে। খালে কখনো হাটু পানি, কখনো কোমর পানি, তবে তীব্র স্রোত থাকে। ২-৩ জায়গা ছাড়া বাকি পথ মোটামোটি ভালোই। তবে ভয় পাবার কিছু নাই। গাইড সব ক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করবে। পুরা ট্রিপের এই পথটাই সব থেকে ভয়ংকর, উত্তেজনাকর এবং সুন্দর। সারাজীবন মনে থাকবে।

গাইডের থাকা, খাওয়ার খরচ সব আপনাকেই দিতে হবে। নৌকা একাধিক লাগলেও গাইড একজনই নিতে হবে। অনেক সময় নৌকার মাঝিরাও থাকা খাওয়ার খরচ চায়। তবে তা দেয়া বাধ্যতামুলক নয়। নৌকা ভাড়া করার সময় এটি ফাইনাল করে নিবেন। না দেয়ার চেষ্টা করবেন।

কোথায় থাকবেন

রেমাক্রি বাজারে থাকার জন্য বেশ কয়েকটি ছোট ছোট কর্টেজ রয়েছে। আহামরি তেমন না হলেও টয়লেট, গুসল খানা আছে। ভাড়া নিবে জন প্রতি ১৫০-২০০ টাকা। রুমের সাথে টয়লেট থাকলে ২০০ টাকা নিবে। চাইলে উপজাতীয়দের বাসায় ও থাকতে পারেন।

রেমাক্রি ফলস এর কাছে “শীলগিরি গেস্ট হাউজ” আছে। লোকে একে চেয়ারম্যানের গেস্ট হাউজ বলে। এর মালিক তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদ এর চেয়ারম্যান। টিন শেডের হলেও টয়লেট, সাপ্লাই পানি, ফ্যান, ডাইনিং, জেনারেটর ইত্যাদি সব ধরণের সুবিধা রয়েছে। এর ভিউ অসাধারণ। এইখানে থাকতে পারেন, ভালো লাগবে। জেনারেটর সাধারণত রাত ১০ টা পর্যন্ত চালু রাখে, আপনি ১০০০ টাকা অতিরিক্ত দিয়ে সারারাত চালু রাখতে পারেন।

কোথায় খাবেন

কর্টেজের ভিতরেই খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। বয়লার মুরগি, বন মোরগ, ডিম্, ভাত, খিচুড়ি, ভর্তার প্যাকেজ রয়েছে। আলোচনা করে সেট করে নিবেন। খরচ খুবই কম। সব কিছু থানচি থেকে আসা গাইড ফাইনাল করে দিবে। কলা, পেঁপে ইত্যাদি নানা পাহাড়ি ফল খুবই সস্তায় পাবেন। বেশি বেশি করে এগুলা খাবার চেষ্টা করবেন।

এছাড়া থানচি এবং নাফাখুমের টং দোকানে মিনারেল পানি, সফ্ট ড্রিংস, বিস্কুট ইত্যাদি পাওয়া যায়। থানচি বাজারে মোটামোটি অনেক কিছু পাওয়া যায়। তবে কোনো প্রকার নেশাজাতীয় জিনিস না খাওয়াই উত্তম।

ট্রাভেল টিপস এবং সতর্কতা

খরচ কমাতে চাইলে ছুটির দিন পরিহার করুন এবং দলগত ভাবে ভ্রমণ করুন। ট্রেকিং এর জন্য ভালো গ্রিপের জুতা নিবেন। সাঁতার না জানলে এবং বর্ষাকালে গেলে লাইফ জ্যাকেট সাথে রাখুন। পাথুরে পথ অনেক পিচ্ছিল, তাই সাবধানে হাঁটবেন। থানচির পর বিদ্যুৎ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক নাই। তাই মোবাইল, পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দিয়ে রাখুন।

কেবল কাঁধের ব্যাগ সাথে নিবেন এবং ব্যাগের ওজন যত কম হয় সেই দিকে খেয়াল রাখুন। প্যারাসিটামল, গ্যাসের ঔষধ, স্যালাইন ইত্যাদি দরকারি ঔষধ সাথে রাখুন। দল ছাড়া একা কোথাও যাবেন না। দলের বাকি সদস্যদের খেয়াল রাখুন। একজনের বিপদে এগিয়ে আসুন। আদিবাসীদের সাথে ভালো আচরণ করুন।

4.4 9 ভোট
রেটিং

লেখক

Rashedul Alam; Rasadul Alam; founder of cybarlab.com; founder of trippainter.com; trippainter.com; cybarlab.com; Bangladeshi travel blogger; Bangladeshi blogger; Bangladeshi software engineer

আমি পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করলেও ঘুরে বেড়াতে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আমি আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা কে এই ওয়েব সাইটে নিয়মিত শেয়ার করি।

Subscribe
Notify of
3 মন্তব্য
Inline Feedbacks
সব মন্তব্য দেখুন

''

3
0
আমরা আপনার অভিমত আশা করি, দয়াকরে মন্তব্য করুনx