থিম্পু শহর

থিম্পু (Thimphu) ভুটানের রাজধানী এবং দেশের সব থেকে বড় শহর। এটি ভুটানের পশ্চিম অংশে, হিমালয় পর্বতমালার একটি উঁচু উপত্যকায় অবস্থিত। অতীতে এটি দেশের শীতকালীন রাজধানী ছিল। ১৯৬২ সাল থেকে একে দেশের রাজধানী এবং স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। পাহাড় ঘেরা থিম্পু খুবই সুন্দর।

থিম্পুতে ঘুরার মতো অনেক জায়গা আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু, তাজ তাশি বা তাজ হোটেল, ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম, কিংস মেমোরিয়াল চড়টেন, ক্লক টাওয়ার স্কয়ার, সীমতখা ডিজং, ন্যাশনাল তাকিন সংরক্ষিত চিড়িয়াখানা, পার্লামেন্ট হাউস, রাজপ্রাসাদ, লোকাল মার্কেট, ন্যাশনাল স্কুল অব আর্টস, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, বিবিএস টাওয়ার ছাড়া আরো অনেক কিছুই।

ক্লক টাওয়ার স্কয়ার
ক্লক টাওয়ার স্কয়ার (Clock Tower Square) থিম্পুর একটি খুবই পরিচিত স্থান। একে থিম্পু টাইম স্কয়ার ও বলা হয়। এটা থিম্পুর নরজিম ল্যাম এ অবস্থিত। এর পাশেই রয়েছে ফুটবল স্টেডিয়াম। এখানে একটি উঁচু টাওয়ার রয়েছে যার মাথার চার দিকে আছে চার টি বড় বড় ঘড়ি। টাওয়ার এর সামনে বেশ ফাঁকা জায়গা রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান এখানে অনুষ্ঠিত হয়। এই স্থানটি থিম্পুর সেন্ট্রাল পয়েন্ট এবং গুরুত্ব পূর্ণ স্থান হিসাবে ধরা হয়। এর আশেপাশে রয়েছে প্রচুর দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট। প্রচুর কবুতর এখানে ঘুরে বেড়ায়।

তাজ তাশি বা তাজ হোটেল
থিম্পুর সব থেকে সুন্দর ভবন তাজ তাশি বা তাজ হোটেল (Taj Tashi Hotel)। তাজ তাশি থিমম্পুর সব থেকে সুন্দর স্থাপনা। এটি ভারতীয় হোটেল জায়ান্ট তাজ হোটেল এবং ভুটানের তাশি গ্রূপ এর একটি জয়েন্ট প্রজেক্ট। এটা ভুটানের প্রথম ফাইভ স্টার হোটেল। তাজ হোটেল ২০০৪ সালে প্রথম চালু হয়। হোটেলটিতে একটি বিশাল সম্মেলন কক্ষ ও রয়েছে। ভবনটি আসলেই অনেক সুন্দর এবং বিশাল।

এর পর পায়ে হেঁটে আশে পাশের আরো কিছু স্থান দেখে ট্যাক্সি ভাড়া করে নিতে পাবেন থিম্পুর বাকি সব স্থাপনা গুলা দেখানোর জন্য। আপনারা দরদাম করে, কোথায় কোথায় যাবেন তা বলে নিবেন। তবে সব থেকে ভাল হয় থিম্পুতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানের জন্যই শুধু ট্যাক্সি ভাড়া করা। ঘুড়াঘুড়ি শেষ করে আবার ওই স্থান থেকে ট্যাক্সি নিবেন। তাহলে খরচ একটু কম হবে। থিম্পুতে ট্যাক্সি আমাদের ঢাকার রিক্সার মতো , সব জায়গায়, সব সময়ই পাওয়া যায়। ট্যাক্সি করে থিম্পু শহর ঘুরে আমাদের অনেক ভাল লাগে। থিম্পু আসলেই অনেক সুন্দর একটা শহর। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চোটেন
ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চোটেন (National Memorial Chorten) মূলত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। ভূটানের তৃতীয় রাজা জিগমে দরজি ওয়াঙচুকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৭৪ সালে এই স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এর ভেতরের বিভিন্ন পেইণ্টিং এবং স্ট্যাচু বৌদ্ধ ফিলোসফির প্রতিবিম্ব রয়েছে। এটি থিম্পু শহরের দেওবুম ল্যাম এ অবস্থিত। এটি বর্তমানে ভুটানের সব থেকে পরিচিত ধর্মীয় স্থান। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান এখানে রাষ্ট্রীয় ভাবে উদযাপন করা হয়। পূর্বে এখানে প্রবেশ ফ্রি থাকলেও এখন ৩০০ রুপী দিয়ে টিকেট কাটা লাগে।

বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু
বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু (Buddha Dordenma Statue) হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে বড় বুদ্ধ মূর্তি যা ভুটানের থিম্পু শহরের এক পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত। দূর থেকেই দেখা যাবে পাহাড়ের উপর বিশাল এক মূর্তির। এটি সোনালী রঙের। সূর্যের আলো পড়ে আরো চক চক করতে থাকে। কাছে যেতেই অবাক হবেন, এতো বিশাল মূর্তি বানালো কিভাবে!! এর চারপাশে আছে আরো অনেক গুলো ছোট ছোট মূর্তি। সব গুলোই সোনালী রঙের।

বোদ্ধের মূর্তির নিচে আছে পার্থনাগার। ঐটার ভেতরে জুতা খুলে ঢুকতে হয় এবং ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ। বাহির যতটা না সুন্দর ভেতরটা আরো বেশি সুন্দর। ছোট ছোট অনেক গুলো বোদ্ধ মূর্তি রয়েছে ভেতরে যা শোকেচে সাজানো। পুরো ইন্টেরিওর সোনালী রঙের অন্য রকম সুন্দর। সেখানে একটা কাহিনী প্রচলিত আছে। তাদের কোন এক রাজা যিনি মারা গেছেন, নাকি আসে এখানে আর এখানকার প্রধান সাধকের সাথে কথা বলেন। সবাই অবশ্য তারে দেখতে পায়না।

ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম
থিম্পু ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম (Folk Heritage Museum) ভুটানের ঐতিহ্য আর প্রাচীন গ্রামীণ জীবনের প্ৰতিচ্ছবি। মিউজিয়ামে গেলে আপনে সহজেই ভুটানের ইতিহাসের সাথে পরিচিত হতে পারবেন। এটি ২০০১ সালে ভুটানের রানী মাতা প্রতিষ্ঠা করেন। ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে সুন্দর একটা বাগান যা নানান রকমের গাছপালায় ভরপুর, বসার জন্য টেবিল, চেরার। ভিতরের পরিবেশ খুবই সুন্দর। এখানে রয়েছে আগের দিনের উইন্ড মেইল, পানি সংগ্রহশালা, ভোজ্য তেল তৈরির মেশিন, শস্য রাখার পাত্র, ইত্যাদি নানা ইতিহ্যবাহী জিনিস। ভিতরে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। আপনারা চাইলে দুপুরের খাবার বাগানে বসে খেতে পারেন। দারুন হবে ব্যাপারটা।

এখানে আরো রয়েছে প্রায় ১৫০ বছরের পুরানো একটি বাড়ি। মিউজিয়ামে ঢুকা ফ্রী হলেও পুরোনো তিনতলা এই বাড়িতে ঢুকতে ৫০ রুপীর টিকেট কাটা লাগে। ঢুকেই দেখবেন রান্না ঘর আর কিছু মহিলা চাল থেকে হুইস্কি বানাচ্ছে। আপনে চাইলে কিনতে পারেন। সিঁড়ি বেয়ে ঘরটির বিভিন্ন ফ্লোর পরিদর্শন করতে পারেন। একেক ফ্লোরে একেক ধরনরে জিনিস সাজানো রয়েছে। বেড রুম, খাবার রুম, তীর ধনুক, যুদ্ধ সরঞ্জাম, ইত্যাদি নানা অতিহ্যবাহী জিনিস রয়েছে সেখানে। সিঁড়িদিয়ে উঠার সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আর ভিতরে কোনো জিনিস হাত দিয়ে ধরবেন না। এগুলা অনেক পুরানো তাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর পাশেই রয়েছে ভুটানের জাতীয় গ্রন্থাগার, বিভিন্ন হেরিজেট শপিং মল। আপনারে চাইলে সেখানে যেতে পারেন।

ভুটান রয়েল প্রসাদ
ভুটানের রাজার প্রসাদ (Bhutan Royal Palace) কে ভুটানিরা Tashichhoe Dzong বা Thimpu Dzong ও বলে। এটি রাজার অফিসিলাল প্রধান রাজ প্রাসাদ। অবশ্য প্রত্যেক ডিস্ট্রিক্ট বা শহরেই রাজার একটা করে প্রাসাদ রয়েছে। সেগুলা অবশ্য এত বড় না ছোট ছোট। কেবল পুনাখা শহরের টা একটু বড়। শুধুমাত্র রাজ মেহমান হলেই ভিতরে প্রবেশ করতে পারবেন।

থিম্পুতে কেনাকাটা কোথায় করবেন?
থিম্পু শহরের মাঝখান দিয়ে যে প্রধান সড়ক টি চলে গেছে তার আসে পাশে বেশ কিছু মার্কেট, দোকান রয়েছে যেগুলা থেকে আপনে চাইলে কিছু কিনতে পারেন। তবে ভুটানের সবকিছুই আসে অন্য দেশ থেকে তাই সেখানে তেমন কিছু না কেনাই ভাল। কেননা দাম অনেক বেশি। তবে থিম্পু তে ইমিগ্র্যাশন অফিসের কাছে নরজিন ল্যাম এ আমাদের ফুটপাথের মতো, বিশাল লম্বা একটা লোকাল মার্কেট রয়েছে। দোকানগুলো সব ছোট ছোট আমাদের টং এর দোকানের মতো, আপনার মনে হতে পারে ঢাকার বস্তি। এইখান থেকে আপনে তাদের স্থানীয় কিছু প্রোডাক্ট কিনতে পারেন। তবে পারোতে টাইগার নেস্টের কাছেও এমন একটা মার্কেট আছে। হাতের তৈরী জিনিসপত্র ঐখান থেকে কিনলে ভালো হয়। ওই গুলা আরো সস্তা।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। ভুটান ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

লাদাখ

জম্মু ও কাশ্মীর হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত ভারতের একটি রাজ্য। এই রাজ্যের উত্তরে ও পূর্বে চীন এবং পশ্চিমে পাকিস্তান অবস্থিত। শ্রীনগর এই রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন এবং জম্মু শীতকালীন রাজধানী। জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখ – এই তিন অঞ্চল নিয়ে রাজ্যটি গঠিত। শ্রীনগর সবুজ কাশ্মীর, আর লাদাখ সাদা কাশ্মীর নামে পরিচিত।

কাশ্মীর হলো দুনিয়ার বেহেশত। যার নাম শুনলেই সবুজ প্রকৃতির দিকে মন চলে যায়। আহ্, কি সুন্দর করে সাজিয়েছেন এ প্রকৃতি। কাশ্মীরের সৌন্দর্য নিয়ে কত কবি কত কবিতা লিখেছেন, কত গল্পকার কত গল্প লিখেছে। সবাই সাজিয়ে তুলেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। ভ্রমণপিপাসু সবাই চায় জীবনে একবার হলেও কাশ্মীর ঘুরে আসতে।

লাদাখ কিভাবে যাবেন?
যেকোনো ট্যুরেই একা থেকে দলবদ্ধ ভাবে গেলে অনেক বেশি মজা হয়, আর খরচ ও কমে যায়। দল বা টিমের সাইজ ৪ বা ৬ গুণিতক হলে ভাল। তাহলে নিরাপত্তা নিয়ে তেমন একটা চিন্তা করা লাগেনা এবং হোটেল বুকিং, গাড়ি ভাড়া করতে সুবিধা হয়। লাদাখ যেতে হলে প্রথমেই আপনার থাকতে হবে ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা। ভারতের ভিসা থাকলে আপনি বিভিন্ন ভাবে ঢাকা থেকে কাশ্মীর যেতে পারেন।

রুট ০১:
ঢাকা থেকে প্লেনে দিল্লি। সেখান থেকে কাশ্মীর যেতে চাইলে ডমেস্টিক প্লেনে শ্রীনগর, লাদাখ যেতে চাইলে লেহ। এতে খরচ একটু বেশি পরে। তবে সময় অনেক কম লাগে। ঢাকা থেকে কাশ্মীর/লাদাখের সরাসরি কোনো ফ্লাইট আপাদত নাই।

রুট ০২:
ঢাকা থেকে সড়ক পথে বাস/ট্রেন এ কলকাতা বা আগরতলা। সেখান থেকে ডমেষ্টিক প্লেনে দিল্লি। পরে দিল্লি থেকে শ্রীনগর/লেহ। এতে খরচ একটু কম হয়। তবে কলকাতার পরিবর্তে আগরতলা হয়ে গেলে ভাল। এতে সময় কম লাগে। কলকাতা থেকে দিল্লি প্লেনে যে ভাড়া আগরতলা থেকে একই ভাড়া। ঢাকা থেকে আগরতলা যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘন্টা, যেখানে কলকাতা যেতে লাগে প্রায় ১২ ঘন্টা।

রুট ০৩:
ঢাকা থেকে সড়ক পথে বাস/ট্রেন এ কলকাতা। সেখান থেকে ট্রেনে দিল্লি। দিল্লি থেকে শিমলা মানালি হয়ে লেহ। এতে খরচ অনেক কম পরে। তবে আপনার হাতে যদি যথেষ্ট সময় থাকে ও একটু অ্যাডভাঞ্চারাস হন তাহলেই কেবল এ রুটে যাবেন। এ ক্ষেত্রে আপনাকে অন্তত ৪৮০ কি. মি. জার্নি করার মত মানসিক ও শারীরিক শক্তি থাকতে হবে। তবে, এই গ্যারান্টি দিতে পারি যে এটাই হবে আপনার জীবনের সব থেকে সেরা ভ্রমণ। এতে আপনাকে বেশ কয়েকটা ১৫,০০০+ ফিট উঁচু পাস্ পার হয়ে যেতে হবে। তবে এই রুট বছরে মাত্র ছয় মাস খোলা থাকে, মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত।

আপনার সময় এবং বাজেটের উপর নির্ভর করে আপনি আপনার জন্য উপযুক্ত রুট চয়েজ করবেন। তবে প্রত্যেক রুটেই আলাদা মজা। আর প্লেনে যেতে চাইলে সম্ভব হলে কমপক্ষে ৬০ দিন আগে টিকেট কেটে নিবেন। তাহলে অনেক সস্তায় টিকেট পেতে পারেন। বিভিন্ন টিকেট বুকিং সাইট অথবা বিভিন্ন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এর ওয়েব সাইট থেকে সহজেই টিকেট কাটা যায়। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পেইমেন্ট করে দিবেন। তবে টিকেট কাটার আগে বেশ কয়েকটা এয়ারলাইন্স এ অবশ্যই দাম কম্পেয়ার করে নিবেন। টিকিটের মূল্য একেক এয়ারলাইন্স এ একেক সময় একেক রকম থাকে।

লাদাখ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
লাদাখ খুবই দুর্গম এবং মারাত্মক ঠান্ডা এলাকা। শীতকালে এই ঠান্ডার পরিমান অনেক বেড়ে যায়। মে থেকে অক্টোবর এই ছয় মাস লাদাখে বেড়ানোর সব থেকে ভাল সময়। কারণ এসময় ঠান্ডা একটু কম থাকে এবং আবহাওয়া খুব ভালো থাকে। এই সময়ে লাদাখে পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকে। শীতকালে (নভেম্বর – এপ্রিল) লাদাখে মারাত্বক ঠান্ডা পরে এবং বরফ জমে অনেক রাস্তা ঘাট বন্ধ হয়ে যায়। তখণ গেলে ঠান্ডা মোকাবেলা করতে করতে জীবন শেষ হয়ে যাবে, তেমন কিছু দেখা যাবে না। তাছাড়া এসময়ে প্রায় ৯০% হোটেল বন্ধ থাকে। ফলে থাকা ও খাওয়া নিয়ে সমস্যা হবে। তাই শীতকাল লাদাখে বেড়ানোর ভাল সময় নয়।

লাদাখ ভ্রমণের প্রস্তুতি
লাদাখ ভ্রমণ করতে হলে বেশ টাকাপয়সা আর সময় লাগে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া ভালো। মোটামোটি ছয় মাস আগে থেকেই প্ল্যান করে ফেলুন। সার্ভিস হোল্ডার হলে যে বছর যাবেন সে বছরকার ছুটি হুদাই শেষ না করে এ সময়ের জন্য বাঁচিয়ে রাখুন। আগে থেকে বলে ছুটির ব্যবস্থা করে ফেলুন। প্রতিমাসে অল্প অল্প করে কিছু টাকা সেইভ করার চেষ্টা করুন। কম পক্ষে ২-৩ মাস আগে প্লেনের টিকেট কেটে ফেলুন। তার পরের মাসে শীতের জন্য জামাকাপড়, জুতা ইত্যাদি দরকারি জিনিসপত্র কিনে ফেলুন। তাহলে একবারে খুব বেশি প্রেসার পড়বেনা। লাদাখে চলাফেরা করার জন্য শারীরিক ভাবে একটু ফিট থাকা লাগে। তাই যাবার ২-৩ মাস আগে থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম করে নিজেকে শারীরিক ভাবে উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা করুন।

লাদাখ ভ্রমণের সতর্কতা
লাদাখের গড় উচ্চতা সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১৫০০ ফিট। অনেক জায়গার উচ্চতা আরো বেশি। এখানে সবসময়ই মারাত্মক ঠান্ডা থাকে। লাদাখ মূলত একটি মরুভুমি, যেখানে গাছপালা এবং বৃষ্টিপাতের পরিমান অনেক কম। বাতাসে অক্সিজেন লেভেল খুবই কম। অতি উচ্চতা, অতিরিক্ত ঠান্ডা, আর অক্সিজেন কম থাকার কারণে বাংলাদেশিদের মতো লো ল্যান্ডের মানুষদের AMS – একিউট মাউন্টেইন সিকনেস দেখা দিতে পারে। AMS এর লক্ষণ গুলো হলো: মাথা ঘুরানো, দুর্বল লাগা, বমি বমি ভাব, মাথা ব্যাথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। কিন্তু ঘাবরানোর কিছু নাই। যাবার আগে কিছু প্রস্তুতি আর যাবার পর কিছু নিয়ম মেনে চললে AMS থেকে রক্ষা পাওয়ায় যায়। লেহ শহরে পৌঁছে হোটেলে কমপক্ষে ১/২ দিন ফুল রেস্টে থাকতে হবে। ঘন ঘন পানি খেতে হবে। পানি দেহে অক্সিজেনের লেভেল বাড়ায়। লেহ এর সব ফার্মেসিতে অক্সিজেনের মিনি ক্যান পাওয়া যায়। কেউ সমস্যা মনে করলে ২-১ টা কিনে নিবেন। দাম ১২০০ রুপির মতো। এর পরেও কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সাথে সাথে হাসপাতালে যেতে হবে। এছাড়াও একধরণে ট্যাবলেট পাওয়া যায় যা দেহে অক্সিজেন লেভেল বাড়ায়। ডাক্তারের পরামর্শে যাবার ২-১ দিনে আগে থেকে গ্রহণ করতে পারেন।

লাদাখ খুবই উঁচু এবং দুর্গম এলাকা। এখানে বছরে ছয় মাস ঠান্ডার কারণে প্রায় সব কিছু বন্ধ থাকে। যাবার আগে অবশ্যই সঠিক সময় জেনে নিবেন। এখানে চলাফেরা করার জন্য শারীরিক ভাবে বেশ ফিট থাকতে হবে। হাঁপানি, শাসকস্ট থাকলে না যাওয়াই উত্তম। যাবার ২-৩ মাস আগে থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম করে নিজেকে শারীরিক ভাবে উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা করুন।

লাদাখ একটি সীমান্তবর্তী এলাকা। তাই এখানে নিরাপত্তা একটু বেশি। একটু পর পর আর্মি ক্যাম্প আর সবসময় রাস্তায় আর্মিদের ট্রাক চলাচল করতে দেখা যায়। তাই সবসময় পাসপোর্ট, যে হোটেলে ওঠেছেন তার ফোন নাম্বার, ঠিকানা সাথে রাখবেন। লাদাখে সরকারি BSNL এর লাইন ছাড়া অন্য মোবাইল অপারেটরদের লাইন কাজ করেনা। দেশে যোগাযোগ করার একমাত্র মাধ্যম ইন্টারনেট। যদিও তার স্পিড খুবই কম। তাই হোটেলে উঠার আগে অবশ্যই ওয়াইফাই আছেকিনা জেনে নিবেন।

হোটেলে রুম ভাড়া নেবার আগে অবশ্যই দেখে নিবেন এবং দরদাম করে নিবেন। সম্ভব হলে লেহ তে পুরাতন টাউন এর দিকে থাকার চেষ্টা করবেন। তাহলে শাসকষ্ট একটু কম হবে। এখানে কোনো হোটেলেই A/C কিংবা ফ্যান নাই। আর দরকার ও নাই। তবে গরম পানির ব্যাবস্থা আছে কিনা দেখে নিবেন। না হলে শেষ। ট্যাক্সি ভাড়া করার আগে দামাদামি করে নিবেন।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

ভূস্বর্গ কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর | কাশ্মীর ভ্রমণ -পর্ব ৭

ভারতের জম্মু এন্ড কাশ্মীরে রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হচ্ছে শ্রীনগর (Srinagar)। শীতকালে প্রবল শীতের কারণে রাজধানী ছয় মাসের জন্য জম্মুতে স্থানান্তর করা হয়। শ্রীনগর ঝিলম নদীর তীরে অবস্থিত এক পর্যটন শহর। এখানকার লেক, হাউসবোট, শিকারা, পাহাড়, সবুজ মাঠ, বার্চ ও উইলো গাছে পূর্ণ অরণ্য পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এখানকার বিভিন্ন কুটির শিল্প, ড্ৰাই ফুডস, মসলা খুবই বিখ্যাত। এজন্যই শ্রীনগর কে বলা হয় প্রাচ্যের ভেনিস।

dal lake Srinagar
ডাল লেক

শ্রীনগরের দর্শনীয় স্থানসমূহ
শ্রীনগরে দেখার মতো বেশ কিছু প্রাকৃতিক, প্রাচীন এবং ঐতিহাসি স্থান রয়েছে। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ডাল লেক, নাগিন লেক, নিশাত বাগ, টিউটিল গার্ডেন, শ্রী প্রতাপ সিং মিউজিয়াম, জামা মসজিদ, হজরৎ বল মসজিদ, দচিগাম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি ইত্যাদি।

সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮। আজ সারাদিন আমরা কাশ্মীরের পেহেলগাম ভ্রমণ করেছি। ভ্রমণ শেষে এখন আমরা রাজধানী শ্রীনগরের পথে। শ্রীনগর টু পেহেলগাম সড়ক অসাধারণ সুন্দর। লিডার নদীর পার ঘেসে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। অন্য পাশে সবুজ পাহাড়, সারি সারি আপেল গার্ডেন, নাস্পাতির বাগান। গতকাল রাতে এই পথে পেহেলগাম যাওয়ায় এই অপূর্ব সৌন্দর্য আমরা মিস করেছিলাম।

ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি
শ্রীনগরে প্রচুর ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি রয়েছে। শ্রীনগর-জম্মু হাইওয়ের পাশে মিলবে এই সকল ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি। এখানে এরা কাঠ থেকে বিভিন্ন পক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রিকেট ব্যাট তৈরী করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিক্রি করে। শেষ বিকালে এমন এক ব্যাট ফ্যাক্টরির সামনে এসে আমরা থামি। ড্রাইভারের মুখে গল্প শুনে আমি ভেবেছিলাম এই সকল ফ্যাক্টরি সাইজে হয়ত অনেক বিশাল হবে। কিন্তু এসে দেখি আসলে তেমন না। আমাদের ঢাকা শহরে শেওড়াপাড়া বা নতুনবাজারে যেমন ফার্নিটারের দোকান আছে অনেকটাই তেমন। দোকানের নিচ তলায় ফ্যাক্টরি, দোতালায় অফিস এবং ডিসপ্লে সেন্টার। নিচতলায় কাঠ কাটার, পালিশ করার এবং কম্প্রেস করার যন্ত্র রয়েছে। ফ্যাক্টরির মালিক মুসলিম এবং বেশ ভালো। অনেক আন্তরিকতার সাথেই ওনি আমাদের কাঠ থেকে কিভাবে বিভিন্ন পক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রিকেট ব্যাট তৈরী করা হয় তা বর্ণনা করলেন এবং হাতে কলমে দেখিয়ে দিলেন।

তিনি জানালেন প্রথমে ওনারা ক্রিকেট ব্যাটের জন্য বিশেষ এক ধরণের গাছ থেকে ব্যাটের সাইজ মতো কাঠ কেটে নেয়। তার পর হ্যান্ডেল লাগানোর জন্য জায়গা করে কেটে ১ বছর বাহিরে ফেলে রাখে। ১ বছর সেগুলা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে। তার পর সেগুলাকে এনে প্রেসার মেশিনে প্রেসার দিয়ে কম্প্রেস করে। নরমাল ব্যাটের জন্য ৫ বার, ডিউস বলের জন্য ১০ বার, ওয়ানডে ম্যাচের জন্য ২৫ বার , টেস্ট ম্যাচের জন্য ৫০ বার প্রেসার দেয়। কোনটা ভেঙে গেলে সেখানেই ফেলে দেয়। এর পর হ্যান্ডেল লাগিয়ে পালিশ করে। এর পর ১ দিন এক ধরণের কেমিক্যাল মিশ্রিত জলের মধ্যে ভিজিয়ে রাখে। তার পর এনে আবার হালকা কিছু প্রেসার দিয়ে পালিশ করে। ফাইনালি অর্ডার অনুসারে স্টিকার লাগিয়ে দেয়। এগুলা এখন সাকিব, কোহেলির হাতে ঝড় তোলার জন্য তৈরী। একটা ক্রিকেট ব্যাট তৈরী করতে এতো সময়, পরিশ্রম এবং প্রসেস লাগে আগে জানা ছিলোনা। আমরা তো খালি দোকানে যেয়ে কিনেই মাঠে চলে যাই।

এখানকার ব্যাটগুলো অনেক সস্তা এবং টিকসই। একটি ভালো মানের ডিউস ব্যাট মাত্র ১০০০-১২০০ রুপি। আমি আমার মেয়ের জন্য ১৭৫ রুপি দিয়ে একটি ব্যাট কিনে নেই। এটা কেমন স্ট্রং তা দেখাবার জন্য তিনি ব্যাটের এক মাথা ইটের উপর রেখে জোরে লাফাতে লাগলেন। আমি বলি ভাই কি করেন, ভেঙে যাবে তো। বললো ভাঙলে আরেকটা দিবো। যাই হোক কিছুই হয় নাই।

কাশ্মীরি ড্ৰাই ফুড
কাশ্মীরের ড্ৰাই ফুড এবং মসলা খুবই বিখ্যাত। আমরা শ্রীনগর-জম্মু হাইওয়ের পাশে এক ড্রাই ফুডের দোকানে যাই। এখানে সড়কের দুই পাশেই প্রচুর ড্রাই ফুডের দোকান রয়েছে। আমরা এখান থেকে জাফরান, বাদাম, খেজুর, ক্যানবেরি, ব্ল্যাকবেরি, আখরোট ইত্যাদি বিভিন্ন ড্ৰাই ফুড কিনে নিলাম। এগুলার দাম কোয়ালিটির উপর নির্ভর করে বিভিন্ন রকম হয়। এখানে জাফরান খুবই সস্তা এবং উন্নতমানের। আমাদের কাছে প্রতি গ্রাম ২০০ রুপি করে রাখে। আরো কমে পাওয়া যায়, তবে সেগুলার কোয়ালিটি এতো ভালো না। শ্রীনগর-জম্মু হাইওয়ের পাশে প্রচুর জাফরান চাষ হয়। জাফরান ক্ষেত দেখতে দারুন সুন্দর। ড্ৰাই ফুড কেনার আগে সেগুলা অরিজিনাল কিনা যাচাই করে নিবেন।

ডাল লেক শ্রীনগর
কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে অবস্থিত মিঠা পানির এক অপূর্ব সুন্দর লেক হচ্ছে ডাল লেক(Dal Lake)। এর দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার, প্রস্থ সাড়ে তিন কিলোমিটার। লেকের সর্বোচ্চ গভীরতা ছয় কিলোমিটার। এই লেকে দুটি দ্বীপ আছে, সোনা লান্ক আর রূপা লান্ক। শীতকালে লেক এলাকার তাপমাত্রা মাইনাস ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চলে যায়। লেকের পানি তখন জমে বরফ হয়ে যায়। এখানে বেশ কিছু হিন্দি মুভির শুটিং হয়েছে। লেককে ঘিরেই কাশ্মীরের হাজারো মানুষ তাদের জীবিকা অর্জন করে। কেউ হাউসবোটের মালিক, কেউ ডাল লেকের বিশেষ নৌকা শিকারাতে পর্যটকদের নিয়ে পরিভ্রমন করে, আবার কেউবা ডাল লেকের বাজারে সবজি বিক্রয় করে।

হাউসবোট
ডাল লেকের প্রধান আকর্ষণ হলো হাউসবোট, পানির উপরে ভাসমান বাড়ি। ডাল লেকে প্রায় ৭০০ মতো হাউসবোট আছে। এগুলার ভিতরে আধুনিক হোটেলের মত নানান সুবিধা রয়েছে। আছে শোবার ঘর, বসার ঘর, বাথরুম, বাথটাব, বারান্দা, ওয়াইফাই ইত্যাদি। সবকিছুই সুসজ্জিত। মেঝেতে সুন্দর কার্পেট বিছানো, দরজা-জানালায় পর্দা টানানো। বারান্দায় বসে অনায়াসে বাইরের দৃশ্য অবলোকন করা যায়। হাউসবোটের দেয়াল কাঠের তৈরী, যা দারুন ভাবে করুকার্জ করা। মোট কথা এই হাউসবোটে পাওয়া যাবে সবধরনের সুবিধা যা একজন পর্যটকের একান্ত প্রয়োজন।

এই হাউসবোট গুলোর একেকটার একেক ধরণের ভাড়া। আমাদের ড্রাইভারের বাসা ডাল লেকের পারেই। ওনার মাধ্যমে আমরা ভালো মানের একটা হাউসবোট ভাড়া করে নিলাম। ভাড়া পড়লো একেক রুম ১৫০০ রুপি করে। সাধারণত এই রুমের ভাড়া নাকি ৭০০০ রুপি। পুরা বোটে আমরা ছাড়া আর কেউ নাই। ওয়াইফাই, বাথটাব সব কিছুই রয়েছে এখানে। পানির উপরে ভাসমান এই ধরণের সুবিধা দেখে দারুন লাগলো। বারান্দা থেকে ডাল লেক আর শ্রীনগর শহর দারুন সুন্দর লাগছিলো। রাতের খাবার আমরা হাউসবোটেই খেয়ে নেই। বাসায় কথা বলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি। শুয়ে মাঝে মাঝে ভাবতেছিলাম যদি বিশাল বড় কোনো এনাকোন্ডা এসে হাজির হয় তখন কি করব?

শিকারা
শ্রীনগরে ডাল লেকের পানিতে ভেসে বেড়ানোর জন্য আছে বিশেষ ধরনের নৌকা যার নাম শিকারা। হাজার হাজার কালারফুল শিকারা প্রতিনিয়ত লেকে চলাচল করে বিভিন্ন প্রয়োজনে। আমরা রাতেই বোটের ম্যানেজার কে বলে রাখি আমাদের এমন দুইটা শিকারা দরকার। ঘন্টা অনুসারে তাদের ভাড়া। আমরা ৩০০ রুপি করে একেক শিকারা ১ ঘন্টার জন্য ভাড়া করে নিলাম। সকলে ঘুম থেকে উঠেই দেখি শিকার এসে হাজির। আমরা ফ্রেশ হয়ে শিকারায় উঠে পড়লাম। শিকারায় করে আমরা ভাসমান বাগান, ভাসমান মার্কেটে গেলাম। একটু পরই দেখি অন্য শিকারা নিয়ে ফেরিওয়ালারা চলে আসছে। তারা জাফরান, বিভিন্ন কাশ্মীরি জিনিসপত্র বিক্রি করে। এরা খুব ডিস্টার্ব করে। এদের কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো। ডাল লেকে হাউসবোটে থাকা, শিকারায় ভেসে বেড়ানো কাশ্মীর ভ্রমণের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দদায়ক ব্যাপার।

কাশ্মীরে শপিং
কাশ্মীরে কেনাকেটা করতে চাইলে শ্রীনগর থেকে কেনাই উত্তম। এখানেই অরজিনাল কাশ্মীরি জিনিসপত্র পাওয়া যায়। আমাদের ড্রাইভার আমাদেরকে এক বড় শোরুমে নিয়ে যায়। বিশাল বড় শোরুম। এখানে কাশ্মীরি শাল, মেয়েদের জামা, জ্যাকেট, বাচ্চাদের পোশাক ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই রয়েছে। আর দামেও অনেক সস্তা। আমি ঢাকার বাণিজ্য মেলা থেকে যে টাইপের কাশ্মীরি শাল ৩০০০ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম তা দেখি এখানে ২৫০ রুপি। আমরা সবাই এখান থেকে নিজের এবং ফ্যামিলি মেম্বারদের জন্য অনেক কিছু কিনে নিলাম। এতো কিছু কিনছি দেখে এক মুরুব্বি সেলসম্যান অবাক হয়ে আমাকে বলে বাংলাদেশ তো আসলেই অনেক উন্নত হইছে। শুনে গর্ভে বুকটা ভরে যায়।

সকালের ফ্লাইটে আমরা দিল্লি চলে আসি। আর এভাবেই শেষ হয় আমাদের কাশ্মীর ট্যুর।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

এশিয়ার সুইজারল্যান্ড পেহেলগাম | কাশ্মীর ভ্রমণ -পর্ব ৬

পেহেলগাম বা প্যাহেলগাম (Pahalgam) ভারতের জন্মু এন্ড কাশ্মীর রাজ্যের অনন্তনাগ জেলার এক পর্যটন শহর।এটি রাজধানী শ্রীনগর থেকে প্রায় ১০০ কিঃমিঃ দূরে লিডার নদীর তীরে অবস্থিত। এর গড় উচ্চতা প্রায় ৭,২০০ ফুট। এটি খুবই জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট এংব হিল স্টেশন। নদী-উপত্যকাশোভিত, নয়নাবিরাম সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভুমি হচ্ছে এই পেহেলগাম।

Pahalgam
পেহেলগাম

পেহেলগামের ইতিহাস
কাশ্মীরি ভাষায় নাগ মানে ঝর্ণা এবং অনন্ত মানে অসংখ্য। একসাথে অনন্তনাগ মানে অসংখ্য ঝর্ণা। স্থানীয়রা একে ইসলামাবাদ নামে ডাকে। সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭০০ সালে এর নাম রাখেন ইসলামাবাদ। পরে কাশ্মীরের মহারাজা গোলাব সিং ১৮৫০ সালের দিকে আবার এর নাম রাখেন অনন্তনাগ। কাশ্মীরে সব গ্যাঞ্জাম মূলত এই অনন্তনাগ থেকেই শুরু হয়। স্থানীয় ভাষায় পেহেলগাম শব্দের অর্থ ভেড়াওয়ালাদের গ্রাম। এক সময় ভেড়া ও বকরি চরানো ছিল এখানকার মূল বাসিন্দাদের আদি পেশা। পাহাড়ি এই দরিদ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘গুজার’ও বলা হয়। তারা বিভিন্ন মালিকের কাছ থেকে ভেড়া ও বকরি চরানোর জন্য নেয়। গ্রীষ্মকালজুড়ে সেগুলোকে পাহাড়ে-উপত্যকায় চরিয়ে বেড়ায়। শীতের শুরুতে আবার মালিকের কাছে ফেরত দিয়ে দেয়।

তবে পেহেলগাম এখন আর গুজারদের এলাকা নয়। এটি এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সময় কাটানোর দারুণ এক গন্তব্য। অগণিত প্রকৃতিপ্রেমিক এই নৈস্বর্গিক সুন্দরের কাছে গিয়ে দিনের পর দিন অতিবাহিত করে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি তীব্র তুষারপাতের কারনে পর্যটকের সংখ্যা অনেক কমে যায়। অনেক হোটেল বন্ধ হয়ে যায়। গ্রীষ্মকালেই পেহেলগাম বেশি সুন্দর থাকে এবং বেশি পর্যটক আসে।

পেহেলগাম এর দর্শনীয় স্থানসমূহ
পেহেলগাম এ দেখার মত বেশ কিছ সুন্দর সুন্দর স্থান রয়েছে। তার মধ্যে উলেখযোগ্য হলো: মিনি সুইজারল্যান্ড খ্যাত বাইসারান, লিডার নদী, পেহেলগাম ভ্যালি, বেতাব ভ্যালি, আরু ভ্যালি, তুলিয়ান ভ্যালী, পেহেলগাম ভিউপয়েন্ট, কাশ্মীর ভ্যালী ভিউপয়েন্ট, চন্দনওয়ারী, কানিমার্গ, ওয়াটারফল, ধাবিয়ান, মামলেশ্বর মন্দির, কোলাহাই হিমবাহ ইত্যাদি। সবগুলা স্পট দেখতে হলে ২-৩ দিন সময় লেগে যাবে।

লিডার নদী
সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮। কাল রাতে আমরা সোনমার্গ থেকে পেহেলগাম এসেছি। আমরা এখানে লিডার নদীর পারে এক কর্টেজে উঠেছি। লিডার কাশ্মীরের এক পাহাড়ি নদী। এটি কোলাহাই হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে জেহলাম নদীতে গিয়ে মিশেছে। এর দৈর্ঘ প্রায় ৭৩ কিঃমিঃ। এই লিডার ভ্যালি তেই পেহেলগাম। রাতে আসায় আশেপাশের কিছু দেখতে পারিনাই। শুধু লিডার নদীর তীব্র গর্জন শুনেছি। সকালে উঠে পর্দা সরিয়ে বাহিরে তাকিয়ে পুরাই অবাক। সামনের ভিউ অসাধারণ। কর্টেজের সামনে ছোট বাগান, যেখানে কিছু চেয়ার দেয়া আছে বসে চা নাস্তা খাবার জন্য। বাগানের জাস্ট নিচেই লিডার নদী যার পানি স্বচ্ছ নীল। নদীতে নামার জন্য সিঁড়ি দেয়া আছে। আমাদের কর্টেজ দারুন সুন্দর। তিনতলা কর্টেজের ফ্লোর, সিঁড়ি, ডেকোরেশন সব কিছু কাঠের। পুরা কর্টেজে আমরা ছাড়া আর কেউ নাই।

আমরা ব্রাশ, পেস্ট নিয়ে নদীতে চলে গেলাম । নদী একটু আগে থেকে দুই ভাগ হয়ে আমাদের কর্টেজের কাছে এসে আবার মিশেছে। নদীর কনকনে ঠান্ডা পানি দিয়েই আমরা ফ্রেশ হলাম। এখান থেকে নদীর গর্জন আরো বেশি। সেখানে কিছু ছবি তুলে রুমে এসে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিলাম। কর্টেজ কতৃপক্ষ আমাদের নাস্তা দিলো। নাস্তা খেয়ে ব্যাগ নিয়ে সবাই নিচে চলে আসলাম। এসেই দেখি আমাদের ঘোড়া রেডি। ছয় জনের ছয় ঘোড়া। সাইজে বেশ বড়। প্রতি ঘোড়া সারাদিনের জন্য ১৫০০ রুপি। রাতে বলে রাখায় কর্টেজ কতৃপক্ষই ঘোড়া ঠিক করে দেয়। এই ঘোড়ার দাম নিয়ে অনেক কিছু হয়। তাই দরদাম করেই ঘোড়া ঠিক করবেন।

পেহেলগামে ৬ পয়েন্ট
আমাদের হাতে যেহেতু সময় কম তাই আমরা কেবল ৬-৭ স্পট দেখব। এই স্পট গুলোর উপর ঘোড়ার ভাড়া নির্ভর করে এবং তা একেক মৌসুমে একেক রকম হয়। এইট স্পট নিয়েই এরা আসলে ধান্দা করে। ঘোড়ার রেট বলবে ৩ স্পট এতো ভাড়া, ৪ স্পট এতো , ৭ স্পট এতো ইত্যাদি ইত্যাদি। যাই হোক আমরা পেহেলগামের ৬ স্পট দেখার জন্য ১৫০০ রুপি করে একেক ঘোড়া ভাড়া করলাম। আমাদের স্পট গুলো হলো পেহেলগাম ভিউপয়েন্ট, কাশ্মীর ভ্যালী ভিউ পয়েন্ট, ধাবিয়ান, বাইসারান, কানিমার্গ, ওয়াটারফল। ৬ ঘোড়ার সাথে আজও দুই এসিস্ট্যান্ট। আগেরদিন সোনমার্গে ঘোড়ায় চড়ে আমরা সবাই মোটামোটি অভিজ্ঞ হয়ে গেছি। তবে যথারীতি খাদেম ভাই আজও ভয়ে আছে। আমরা ওনাকে অভয় দিলাম এবং একজন এসিস্ট্যান্ট কে সর্বদা ওনার কাছাকাছি থাকার জন্য বললাম। সকালে ৯:৩০ এর দিকে আমরা ঘোড়ায় চড়ে পেহেলগাম ভ্রমণে বের হলাম।

আমরা আঁকাবাঁকা পাথরে পাহাড়ি পথে এগিয়ে চলেছি। সারি সারি পাইনের বাগান, নিচে লিডার নদী। কখনো কখনো বনের ভিতর দিয়ে আমরা চলেছি। ছোটবেলায় টিভিতে দেখতাম পাইনের বনের ভিতর দিতে ঘোড়া চালিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চলেছে রবিন হুড। তখন নিজেকে রবিন হুডের মতোই মনে হচ্ছিলো। আমরা প্রথমে আসলাম পেহেলগাম ভিউপয়েন্ট। এখন থেকে নিচে পেহেলগাম পুরাটা দেখা যায়। চারিদিকে সব কিছু সবুজ। মাঝে মাঝে কিছু বাড়িঘর, নদী এক কোথায় চমৎকার।

এর পরে আসলাম কাশ্মীর ভ্যালী ভিউ পয়েন্ট। এখন থেকে কাশ্মীর ভ্যালী পুরাটা দেখা যায়। চারপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়, মাঝখানে সবুজ সমতল ভূমি। পূর্বে একসময় যখন রাস্তা ছিলোনা তখন নাকি লোকজন ডানপাশের এই উঁচু পাহাড় পায়ে হেটে পাড়ি দিয়েই শ্রীনগর যেত। এমনটাই জানালো দুই এসিস্ট্যান্ট। এখানে কিছু ছবি তুলে আবার আগানো শুরু করলাম।

মিনি সুইজারল্যান্ড বা বাইসারান
এর পর আমরা চলে আসলাম বাইসারান, যাকে সবাই বলে মিনি সুইজারল্যান্ড। টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকে গেলাম। ভিতরে ঢুকেই মাথা পুরা নষ্ট। এতদিন ক্যালেন্ডার এ যেমন ছবি দেখতাম অবিকল তেমন। ঘন পাইনের বনের ভিতর অনেক বড় ফাঁকা জায়গা। পুরাটাই সবুজ, যেন কার্পেট বিছানো। জায়গাটা পুরা সমতল না, মাঝে মাঝে হালকা কিছু কার্ভ আছে। দূরে পাহাড়ের মাথায় সাদা সাদা বফর জমে আছে। সুইজারল্যান্ডে সাধারণত এমন দৃশ্য দেখা যায়। এই জন্যই হয়তো একে বলে এশিয়ার সুইজারল্যান্ড। আমি সবুজ ঘায়ে কিছুক্ষন গড়াগড়ি করলাম। এখানে তেমন বেশি হকার নাই। ২-১ জন আছে যারা কাশ্মীরি জামাকাপড় বিক্রি করে। তাদের ই একজন আমাদের বাজরাঙ্গী ভাইজান মুভিতে সালমান খান যে সাদাকালো চাদর পড়েছিল ওটা নেয়ার জন্য অনেক চাপাচাপি করলো। কিন্তু আমরা নিলাম না।

দুই লোক আবার খরগোস, বানর, কবুতর ইত্যাদি প্রাণী নিয়ে এসেছে। আমরা সেগুলা হাতে নিয়ে ছবি তুললাম। তাদের ১০ রুপি করে দিয়ে দিলাম, কিছু বল্লোনা, মনে হলো খুশিই হলো। আমাদের দেশে হলেতো নির্ঘাত ১০০-২০০ টাকা দেয়া লাগতো। এদের চাহিদা অনেক কম। এটা খুব ভালো লাগলো। এখানে জর্বিং খেলা যায়। বিশাল এক বলের ভিতর দুইজনকে বেঁধে ঢালু জমিতে ছেড়ে দেয়। আর ওটা গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে থাকে। অন্যরা কেউ সাহস করলোনা। আমি আর আজিজ ভাই সাহস করে উঠে পড়লাম। ১৫০ রুপি করে টিকেট নিলো। প্রথেম একটু ভয় পেলেও পরে দারুন মজা পাইছি। তবে এখানে উঠার জন্য ওজন ৮০ কেজির ভিতরে থাকা লাগে।

জর্বিং

এখানে জিপ লাইনিং করার ব্যবস্থা আছে। দুই পাশে দুই গাছের সাথে একটি সরু তার বাধা, মানুষেকে ওই তারের সাথে রশি দিয়ে আটকিয়ে ছেড়ে দেয়। আর তারা তাদের দেহের ভারে সামনে এগিয়ে চলে। আমরা দামাদামি করে প্রতিজন ২০০ রুপি করে টিকেট কেটে এটাও উঠে পড়ি। তেমন উঁচুতে না হলেও দারুন মজা পাইছিলাম। আমার লাইফে এটাই প্রথম জিপ লাইনিং করা।

জিপ লাইনিং

ওয়াটারফল
এর পর আমরা গেলাম ওয়াটারফল। বিশাল বড় ওয়াটারফল। অনেক দূর থেকে রাশি রাশি পানি পাথরের ভিতর দিয়ে প্রচন্ড বেগে গড়িয়ে পড়ছে। তীব্র তার শব্দ। অন্য সময় নাকি আরো বেশি পানি থাকে। আমরা ওয়াটারফল এর মাঝ খানে চলে যাই। জলপ্রপাতের জলে হাত মুখ ধুই। স্থানীয় প্রশাসন এখানকার জল পাইপ দিয়ে নিচে নিয়ে গেছে যাতে স্থানীয় লোকজন ব্যবহার করতে পারে। ব্যাপারটা দারুন লাগলো। বেশ কিছু ছবি তুলে আমরা আবার সামনে এগিয়ে চলি। ফেরার পথে বাকি স্পট গুলো দেখে আমরা আবার শহরে ফেরত আসি। একটা রেস্টুরেন্ট এ লাঞ্চ করে রওনা দিলাম আপেল গার্ডেন দেখার জন্য।

আপেল বাগান পেহেলগাম
লিডার নদীর পাস দিয়ে ছুটে চলেছি। সামনে আসলো সারি সারি আপেল বাগান। আমরা বড় একটা দেখে গাড়ি থামাই। ড্রাইভার গিয়ে কতৃপক্ষের সাথে কথা বলে নিলো। তাদের অনুমতি নিয়ে আমরা ভেতরে প্রবেশ করি। সব গাছে প্রচুর আপেল ধরেছে। কোন গাছে লাল, কোনো গাছে সবুজ। সেপ্টেম্বর মাসেই আপেল পরিপূর্ণ হয়। লোকজনকে দেখলাম আপেল পেরে প্যাক করছে। এগুলা এর পর চলে যাবে দুনিয়ার নানা প্রান্তে। আমি আপেল গাছে উঠে পড়ি। এতদিন আম, জাম গাছে উঠলেও এই প্রথম চোখ দিয়ে আপেল গার্ডেন দেখলাম, আবার আপেলের গাছেও উঠলাম। এখানে আপেল বাগানে প্রবেশ করতে কোনো ফি লাগেনা। কেউ যদি আপেল কিনে তাহলেই তাদের লাভ। আমরা আপেল বাগানে বসে আপেল আর আপেলের জুস খেলাম। জুস্ ৪০ রুপি করে দাম নিল। আপেল বাগানে বসে আপেলের জুস ব্যাপারটা অন্যরকম। আর জুসের টেস্ট ও দারুন। এখানকার আপেল আর দেশে কেনা আপেলে মাঝে টেস্টে বিস্তর ফারাক। ফেরার পথে বাগান থেকেই বাসার জন্য ৬ কেজি আপেল কিনে নিলাম। ওনারাই একটা পকেটে প্যাক করে দিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হোটেলে এনে মেপে দেখি বেটা ৪ কেজি দিছে। আপনারা আপেল কিনতে চাইলে অবশ্যই ওজন দিয়ে নিবেন। নাহলে ঠকবেন।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

পৃথিবীর স্বর্গ সোনমার্গ | কাশ্মীর ভ্রমণ -পর্ব ৫

ভারতের জন্মু এন্ড কাশ্মীর রাজ্যের গন্ডারবাল জেলার এক হিল স্টেশন বা শহর হচ্ছে সোনমার্গ (Sonmarg)। এটি শ্রীনগর থেকে প্রায় ৮২ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। এখান দিয়েই প্রাচীন সিল্ক রোড চলে গেছে। অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য সোনমার্গ কে বলা হয় পৃথিবীর স্বর্গ।

Sonmarg

সোনামার্গ কাশ্মীরের সুন্দর জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ফানা, মিশন কাশ্মীর, বাজরাঙ্গী ভাইজান সহ আরো জনপ্রিয় ছবির শুটিং হয়েছে এখানে। জোজিলা টানেলের একটি মুখ এখান থেকে শুরু হয়েছে। এখানকার উল্লেখযোগ্য ট্যুরিস্ট স্পট গুলো হচ্ছে থাজিওয়াস গ্লেসিয়ার বা থাজিওয়াস হিমবাহ, জোজিলা পাস, বালতাল ভ্যালি, অমরনাথ গুহা, গঙ্গাবাল লেক, গাদসার লেক, ভিসান্তার লেক, সাসতার লেক, উলার লেক ইত্যাদি। সবগুলো দেখতে গেলে ২-৩ দিন সময় লেগে যাবে। আমাদের হাতে যেহেতু সময় কম তাই আমরা কেবল থাজিওয়াস গ্লেসিয়ার এ যাব।

নাস্তা শেষ করে আমরা চলে আসলাম সোনমার্গ পার্কিং পয়েন্ট। এখন থেকেই থাজিওয়াস গ্লেসিয়ার যেতে হয়। এখানে এসেই মনে হলো ঘোড়ার হাট বসেছে। ঘোড়ার লোকজন সব ঘিরে ধরেছে। আমরা অবশ্য আগেই ড্রাইভারকে বলে রেখেছিলাম। ওনি প্রতি ঘোড়া ৭০০ রুপি দিয়ে ঠিক করে দিল। আপনারা ঘোড়ায় চড়ার আগে অবশ্যই দরদাম করে নিবেন। এখানে দালালের অভাব নাই। সুযোগ পেলে ৩০০০ রুপি পর্যন্ত নিয়ে নেয়। সব থেকে ভালো হয় গাড়ির ড্রাইভার কে দিয়ে ঠিক করা।

জীবনে প্রথম ঘোড়ায় চড়া
জীবনে এই প্রথম ঘোড়ায় চড়ব, তাই খুব এক্সসাইটেড ছিলাম। এখানকার ঘোড়ার ব্যবসা গাড়ির মতো। একেক মালিকের বেশ কিছু ঘোড়া আছে। কিছু লোক তাদের চালায় যাদের আমরা ঘোড়ার চালক বা এসিস্ট্যান্ট বলতে পারি। তারা সবাই বেতনভুক্ত। আপনে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসবেন আর তারা আস্তে আস্তে ঘোড়াগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। তাদের কাছে একটি লাঠি থাকে যা দিয়ে মাজে মাজে ঘোড়াগুলোকে সাইজ করে । একটা গ্রূপের জন্য সাধারণত ২-১ জন এসিস্ট্যান্ট থাকে। আপনে ঘোড়ায় চড়ে যাবেন আর তার পুরা পথ হেটে হেটে যাবে। আর এর জন্য তারা খুব সামান্যই মজুরি পান।

আমাদের ছয় জনের জন্য ছয়টি ঘোড়া আর দুই জন এসিস্ট্যান্ট। একজন একটু মুরুব্বি টাইপের আর একজন ১৪-১৫ বছরের বালক। তাদের নাম এই মুহূর্তে মনে নাই। এসিস্ট্যান্ট ধরে ধরে আমাদের সবাইকে ঘোড়ার পিঠে উঠায় দিলো। সকাল ১১:৩০ থেকে আমাদের রাইড শুরু হলো। প্রথম দিকে খুবই অস্বস্থি লাগছিলো। জীবনে এই প্রথম ঘোড়ায় চড়া, তাই একটু ভয় ও পাচ্ছিলাম। টিমের অন্যদের অবস্থাও একই। ঘোড়ার পিঠে একটি সিট লাগানো আছে যা চামড়ার তৈরী। সেখানে হাত দিয়ে ধরার ব্যবস্থা আছে। দুই পা রাখার জন্য দুই সাইডে দড়ি আর লোহার রিং দিয়ে বানানো সিঁড়ির মতো কিছু একটা আছে। ওটায় পারা দিয়েই ঘোড়ায় উঠা এবং নাম লাগে। ঘোড়ার মাথার সাথে লাগানো একটি দড়ি আছে যাকে লাগাম বলে। এক হাত দিয়ে লাগাম ধরতে হয় যা দিয়ে ঘোড়াকে ডানে বামে টার্ন করা যায়। লাগামকে টেনে ধরলে ঘোড়া থেমে যাবে। পুনরায় চালু করাতে হলে দুই পা দিয়ে বডিতে হালকা ঘুতা দিতে হয়। বেশি জোরে চলতে হলে সাথে তেজ চলো…তেজ চলো… বলতে হয়। তাহলে দৌড়াতে থাকবে। পাহাড়ের উপরের দিকে উঠার সময় নিজের মাথাকে সামনের দিকে আর নিচের দিকে নামার সময় পিছনের দিকে নিয়ে যেতে হয় যাতে ব্যলান্স থাকে। নাহলে পরে যাবার চান্স থাকে। এগুলা সব এসিস্ট্যান্ট আমাদেরকে বুঝায় দিলো।

আস্তে আস্তে আমরা এগিয়ে চললাম। শক্ত সিটের কারণে নিজের পাছার অবস্থা টাইট। মনে হলো আজ বুঝি পাছার ছাল উঠে যাবে। যাই হোক একটু পরেই আস্তে আস্তে নিজেকে মানিয়ে নেই। এখন আর তেমন সমস্যা হচ্ছেনা। ঘোড়াকেও কন্ট্রোল করতে পারছি। বাকিরাও মানিয়ে নেয় কেবল খাদেম ভাই ছাড়া। উনি খুবই ভয় পাচ্ছিলেন। আমরা বালকটিকে বললাম তুমি সব সময় ওনার ঘোড়া ধরে রাখবা যাতে এদিক সেদিক না যেতে পারে। তাও সে মাঝে মাঝে অন্যদিকে চলে যায়। ডাকলেও শুনেনা, কিছু জিজ্ঞেস করলে বলেনা। পরে বুজতে পারি সে আসলে বোবা এবং কানেও শুনেনা। খুবই খারাপ লাগলো। প্রতিবন্ধী হয়েও এই বয়সে টাকার জন্য এই কষ্টকর কাজ করছে।

সোনমার্গের ঘোড়াগুলো একটু ছোট সাইজের। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম আছে। আমরটার নাম সুলতান। সে কাজেও সুলতান। সব সময় আগে আগে চলে। এই ঘোড়াগুলোর আশ্চর্য টাইপের এক ক্ষমতা আছে। সামনে কোনো উঁচু নিচু জায়গা আসলে তারা নিজের পা কে এমন ভাবে ছোট বড় করে যাতে আমরা না পরে যাই। এই ৮০ কেজির বিশার বডিটাকে সুলতান সহজেই পাথরের উঁচু নিচু পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। স্কুল লাইফে বিজ্ঞান ক্লাসে শেখা শক্তির একক হর্স পাওয়ার সম্পর্কে আজ প্রাক্টিকাল ধারণা পেলাম।

থাজিওয়াস গ্লেসিয়ার
যতই সামনে আগাচ্ছি আর অবাক হচ্ছি। পৃথিবী এতো সুন্দর কিভাবে হলো। দুই পাশে উঁচু উঁচু পাহাড় আর তাদের ফাঁকে সবুজ সমতল ভূমি। যেন প্রকতি সবুজ কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে। পাহাড়ে বিশাল বিশাল পাইন গাছ আর তাদের মাথায় সাদা বরফ। সব কিছু এক কথায় চমৎকার। আমার মনে হচ্ছিল আমরা সবুজ কোনো টিউবের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। দূরে থাজিওয়াস গ্লেসিয়ার দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরা পাহাড়টি যেন এক বরফের টুকরা। আসলে ঐখানে এতো ঠান্ডা যে, ওখানকার বরফ কখনোই গলেনা। আর ঠান্ডা হয়ে জমতে জমতে ওটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।

উপরের পাহাড় থেকে বরফ গলা জল গড়িয়ে পড়ছে। সব জল এসে ছোট এক নদীর সৃষ্টি করেছে। আমাদের ঘোড়া সেই জল পার হয়ে চলে যাচ্ছে। দূর থেকে দেখে মনে হবে আলী বাবা ৪০ চোর। সে এক দারুন অভজ্ঞতা। আমরা গ্লেসিয়ার এর কাছাকাছি এক জায়গার আসে থামলাম। ঘোড়ার একটু রেস্টের প্রয়োজন। এই জায়গাটা অসাধারণ। এখানে বিশাল এক পাথর রয়েছে। জায়গাটা বেশ পরিচিত মনে হচ্ছে। বেশ কিছু হিন্দি মুভিতে দেখছি। কিছুদিন আগেই এখানে সালমান খানের রেস্ ৩ মুভির গানের শুটিং হয়েছে। আমরা তার উপরে উঠে ছবি তুললাম। এখানে একটু সাবধান থাকবেন। উঠা নাম বেশ রিস্কি। এখন যেমন সব কিছু সবুজ, শীত কালে পুরা এলাকা বরফে ঢেকে যায়। তখন শুধু সাদা আর সাদা।

এখানে আসলেই লোকাল ফেরিওলারা এসে ধরবে, কাশ্মীরি জামা, শাল অরিজিনাল বলে বিক্রি করতে চাইবে। এগুলা আসলে গুজরাটের কারখানায় তৈরী, অরিজিনাল কাশ্মীরি না। যার বাজার দাম ১৫০-২০০ রুপি। তাই না কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ। কিছু কিনতে হলে শ্রীনগর থেকে কিনবেন। একমাত্র ঐখানেই অরিজিনাল জিনিস পাওয়া যায়। এখানে একটি চায়ের দোকান আছে। মন চাইলে খেতে পারেন।

একটু সামনে আগানোর পর এসিস্ট্যান্ট আর যেতে চাইলনা। বলে আর যাওয়া যাবেনা, সেখানে কেউ যায়না ইত্যাদি ইত্যাদি। আসলে ওরা এমনই। খালি ফাঁকি দিতে চায়। লোকজন গ্লেসিয়ার এর আরো কাছাকাছি যায়। তবে যারা সোনমার্গে রাত্রি যাপন করে তারাই সাধারণত গ্লেসিয়ার এর একদম কাছে যায়। কারণ যেতে আসতে বেশ সময় লেগে যায়। আমরা যেহেতু সোনমার্গ থাকবোনা তাই আবার ফেরত আসা শুরু করলাম। তবে আপনারা আরো সামনে যাবেন। উঠার সময় সেভাবেই বলে নিবেন। এখানে আসলে টাউটের অভাব নাই। তবে সোনমার্গ মূলত ট্রেকিং করার জন্য ভালো জায়গা। অনেকে ট্রেকিং করার জন্যই এখানে আসে। ট্রেকিং করার জন্য আলাদা লোক আছে। ভাড়ায় পাওয়া যায়।

ফেরার পথে আমরা একটু নিচের দিকে আরো সন্দুর এক জায়গায় গেলাম। পুরা জায়গাটা গল্ফ মাঠের মতো, খালি উপরে পাইন গাছে ভর্তি। এই জায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর। উপরে পাইনের ছায়া নিচে সবুজ ঘাসের কার্পেট। তাপমাত্রা A/C রুমের মতো। এবার মনে হলো আমার বাড়িটা এখানে হলেই সব থেকে ভাল হয়। ঘাসের উপর বেশ কিছুক্ষন শুয়ে থাকলাম। এখানে প্রচুর ভেড়ার পাল ঘাস খাচ্ছে। আমরা দৌড়ে ভেড়ার পালের ভিতর গিয়ে ছবি তুললাম। এলাকাটা খুবই পরিচিত। এখানে অনেক হিন্দি মুভির শুটিং হয়েছে। অমিতাভ বচ্চনের এক মুভি যেখানে ওনি আর্মি অফিসার, এখানে শুটিং হয়েছে। মাঝে মাজে ছোট ছোট নালা দিয়ে বরফ গলা পানি গড়িয়ে পড়ছে। ভেড়াগুলো সেই পানি পান করছে। পুরা এলাকাটা এক কথায় দারুন।

প্রথম বারই কেবল এসিস্ট্যান্ট ঘোড়া থেকে নামতে এবং উঠতে সাহায্য করেছিল। এর পর প্রতিবারই আমি নিজে নিজেই নেমেছি আর উঠেছি। একদিনেই ভালো ঘোড়া চালক হয়েগেছি। সেই ইমপ্রুভমেন্ট। ফেরার পথে বালক এসিস্ট্যান্ট সব ঘোড়াকে খেপায় দিল। আর তারা অনেক জুড়ে জুড়ে দৌড়াতে লাগলো। খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। পরে মানিয়ে নেই। আসলে এই সময় বডিকে ঘোড়ার তালে তালে দুলাতে হয়।

দুপুর তিনটার দিকে আমরা পার্কিং পয়েন্টে ফেরত আসি। ঘোড়ার মালিককে তার পাওনা বুঝিয়ে দিলাম। দুই এসিস্ট্যান কে কিছু বকশিস দিয়ে দিলাম। প্রতিবন্ধী বালককে একটু বেশিই দিলাম। তারা আসলেই অনেক কষ্ট করে।

সোনমার্গ টু প্যাহেলগাম
আমরা আবার প্যাহেলগামের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ৩:৩০ এর দিকে সিন্ধু নদীর পারে আপেল ট্রি নামক এক রেস্টুরেন্ট এ থামলাম লাঞ্চ করার জন্য। আমরা এখানে মুরগি, ভাত, সবজি খেলাম। লাঞ্চ শেষে অপূর্ব সিন্ধু নদীর পার ঘেঁষে আঁকাবাঁকা পথে আবার সামনে এগিয়ে চললাম। দুই পাশের ভিউ দারুন সুন্দর। একটু পর পর চোখে পড়ছে আপেল গার্ডেন। প্রায় ৬ টার দিকে আমরা পৌঁছে গেলাম জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর। মূল শহরে প্রবেশদ্বারে আসতেই দেখি বস্তার তৈরী ব্যাংকারের ভিতর আর্মিরা সব ভারী ভারী আর্মস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে সাথেই মাইন্ড ডাইভার্ট হয়ে গেল পৃথিবীর স্বর্গ কাশ্মীর থেকে যুদ্ধ বিধ্বস্ত কাশ্মীরে। আমাদের গাড়ি তারা থামলোনা। আমরা এগিয়ে চললাম। একটু পর পর চোখে পড়ছে আর্মি, পুলিশ AK ৪৭ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে মনে একটু ভয় পেতে লাগলাম। প্রায় ৩০ মিনিট পর আমরা মোটামোটি শহরের বাহিরে চলে আসি। ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলাম একটু পর পর আর্মি কেন। বললো এগুলা নিরাপত্তার জন্য।

প্রায় ৯ টার দিকে আমরা চলে আসলাম প্যাহেলগাম। প্রথমেই এক রেস্টুরেন্ট এ রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। পরে সোজা চলে গেলাম লিডার নদীর পারে আগে থেকেই আমাদের জন্য নির্ধারিত এক কর্টেজে। আমাদের ড্রাইভার এই কর্টেজ ঠিক করে রেখেছিল। এসে দেখি এখানে ওয়াইফাই নাই, তাই বাসার সাথে আর কথা বলা হলোনা। আজ এখানে অনেক ঠান্ডা, শরীরও ভীষণ ক্লান্ত তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। কর্টেজের বর্ণনা অন্য পর্বে বলবো। কাল আমাদের সারাদিন প্যাহেলগাম এ ঘুরাঘুরি করার প্ল্যান আছে। গুড নাইট।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

সড়ক পথে কার্গিল টু সোনমার্গ | কাশ্মীর ভ্রমণ -পর্ব ৪

কার্গিল থেকে সোনমার্গ যাওয়ার রাস্তাটি খুবই ভয়ংকর এবং সুন্দর। এই পথেই পারি দিতে হয় পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর জোজিলা পাস। যা পার হতে ড্রাইভার যাত্রী সবারই বুক ধড়ফড় করে। যখন তখন পাথর ধসে পড়া, বরফগলা জল এসে রাস্তা ভাসিয়ে দেয়া, ধসে পড়া রাস্তা ইত্যাদি এই পথের নিয়মিত ব্যপার। শীতকালে প্রচন্ড তুষারপাতের কারণে এই সড়ক প্রায় ৬ মাস বন্ধ থাকে।

zojila pass Zoji La
জোজিলা পাস

সেপ্টম্বর ১৯, ২০১৮ কার্গিল। কাশ্মীরে আজ আমাদের চতুর্থ দিন। কাল রাতে আমরা লেহ থেকে কার্গিল এসেছি। ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি সবাই রেডি হয়ে নিলাম। একটু পরেই আমরা সোনমার্গের উদ্দেশ্যে রওনা দিব। সেখানে পৌঁছেই নাস্তা করব। রাতে আসায় কার্গিল শহরের কিছুই দেখতে পারিনাই। তাই সকালে রওনা দিবার আগে আশে পাশে একটু দেখে নিলাম। কার্গিল শহর ছিমছাম গুছানো। কার্গিল লেহ থেকে একটু নিচে এবং কিছু গাছপালা থাকায় AMS এর তেমন কোন সমস্যা নাই। একবার মনে হলো হোটেলের পিছনে কি আছে দেখা দরকার। কেন সেখান থেকে এত শব্দ আসছে যার কারণে রাতে ঘুমাতে সমস্যা হয়েছে। হোটেলের পিছন দিকের বারান্দায় গিয়ে মাথা পুরা নষ্ঠ। অপূর্ব সুন্দর পাহাড়ি সুরু নদী। নদীতে তীব্র স্রোত। পাথরের গায়ে পানি লেগে প্রচন্ড শব্দের সৃষ্ট্রি করছে।

Suru River
সুরু নদী, সেপ্টেম্বর ১৯, সকাল ০৭:১৫

সকাল ৭:৩০ এর দিকে আমরা আবার সোনমার্গের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম। কার্গিল থেকে সোনমার্গের দূরত্ব প্রায় ১২৩ কিঃমিঃ। যেতে ৩ ঘন্টার মতো সময় লাগে। সুরু নদীকে এক পাশে রেখে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। একটু পর পর আর্মিদের বিভিন্ন গৌরবের স্মৃতি বড় বড় পাথরে লেখা আছে। ক্যাপ্টেন সিং.. মেজর অমুক ইত্যাদি ইত্যাদি। তারা কবে কোথায় মারা গেছে, কবে জন্ম গ্রহণ করেছে। এইসব দেখে মনটা কেমন জানি হয়ে গেল। তাই আবার অপর পাশে তাকাই। সুরু নদীর পানি খুব সুন্দর কালারফুল। নদীর দুইপাশে ছোট ছোট গাছপালা, পাথর, মাঝে মাঝে নদীর উপর সুন্দর কাঠের ব্রীজ। এসব দেখে মনে হল আহঃ আমার বাড়িটা যদি এমন একটা জায়গার হতো তাহলে কতই না ভালো হতো।

দ্রাস
একটু পর আমরা চলে আসলাম দ্রাস শহরে। এটি কার্গিল জেলার অন্তর্গত ছোট এক শহর। এই শহরকে লাদাখের প্রবেশদ্বার (The Gateway to Ladakh) বলা হয়। এটি কার্গিল শহর থেকে প্রায় ৬০ কিঃমিঃ দূরে শ্রীনগর ও লেহ শহরের সংযোগরক্ষাকারী ১ডি নং জাতীয় সড়কের ওপর দ্রাস উপত্যকার মাঝে অবস্থিত। এই শহরের গড় উচ্চতা ১০,৭৬৪ ফুট। এটি ভারতের শীতলতম স্থান এবং পৃথিবীর মধ্যে মানুষ বাসযোগ্য দ্বিতীয় শীতলতম স্থান। এখানে অক্টোবর-মের মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রচন্ড কষ্টদায়ক শীতকাল অবস্থান করে। শীতে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা -২২ ডিগ্রী সে। ডিসেম্বর-মে প্রায় ১৪ ইঞ্চি তুষারপাত হয়। জুন-সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত দ্রাসে গ্রীষ্মকাল। এই সময় গড় তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রী সে। এই দ্রাসেই ১৯৯৯ সালে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হয় যা কার্গিল যুদ্ধ নামে পরিচিত। এখানের প্রায় সব লোকই মুসলিম।

পুরা এলাকাটা দারুন সুন্দর। এখান থেকেই সবুজ কাশ্মীরের শুরু বলা যায়। চার পাশে ছোট ছোট দূর্বা ঘাস, রঙিন সব বাড়ি ঘর, মাঝখানে অপূর্ব সুন্দর সিন্ধু নদী সব মিলিয়ে পুরা দ্রাস উপত্যকা এক কথায় চমৎকার। আমরা গাড়ি থেকে নেমে প্রচুর ছবি তুললাম, দ্রাসের লোকদের সাথে কথা বললাম, সেই বিখ্যাত সিন্ধু নদীর পারে চলে গেলাম, পানি দিয়ে দুষ্টামি করলাম। দ্রাস উপত্যকায় সিন্দু নদী খুবই খুবই সুন্দর। এবার মনে হলো আমাদের বাড়িটা এখানে থাকলেই বুঝি বেশি ভালো হতো।

Dras
দ্রাস বালক ইনজামাম উল হক ও মুদাস্সের, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮

দ্রাস বালক ইনজামাম ও মুদাস্সের জানালো শীত কাল তারা অনেকটা ঘরের ভিতরেই কাটিয়ে দেয়। বাহিরে বের হয়না, সব কিছু বরফে ঢেকে যায়। এখানে একধরণের গাছ জন্মে যা দিয়ে তারা শীত কালে আগুন জ্বালায়। বরফ গলিয়ে যে পানি পাওয়া যায় তা দিয়েই চলে রান্নাবান্না, জামাকাপড় ধোয়া। তবে শুকাতে নাকি বেশ বেগ পেতে হয়। তাদের একজনের ১০ জন করে ভাই বোন। তারা তাদের ঘর দেখালো, আমরা তাদের কিছু চকলেট, বিস্কুট দিলাম। ভীষণ খুশি হলো। এই ফাঁকে আমাদের ড্রাইভার ঝর্ণার জল দিয়েই তার গাড়ি পরিষ্কার করে নিলো। ব্যাপারটা খুবই ইন্টারেষ্টিং মনে হলো।

স্থানীয় বাজার থেকে আমরা কিছু পানি কিনে আবার চলা শুরু করলাম। ড্রাইভার আমাদের একটু পর পর কার্গিল যুদ্ধের বিভিন্ন ধ্বংস বিশেষ দেখাচ্ছে আর বর্ণনা করছে। আমরা টাইগার হিলের পাশ দিয়েই যাচ্ছি। এই টাইগার হিলের অপর পারেই পাকিস্তান। ১৯৯৯ এ এই পাহাড়ে উঠেই পাকিস্তানীরা গুলি বর্ষণ শুরু করে। তাদের গুলির আঘাতে বিদ্ধস্ত দেয়াল এখনো রয়েছে। এই দেয়া ঘেঁষেই আমাদের গাড়ি সামনে আগাচ্ছে।

একটু পরেই সামনে পড়ল বিশাল ভেড়ার পাল। কয়েক হাজার ভেড়া, ছাগল ৩-৪ জন লোক তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য আমাদের গাড়ি যেতে পারছেনা। ড্রাইভার জানালো তারা না যাওয়া পর্যন্ত আমরা যেতে পারবোনা। হর্ন দেয়া বা তাদের কোনোরকম আঘাত করা বেআইনি। তাহলে জরিমানা হবে। লোকাল সরকার থেকে এমন আদেশই দেয়া আছে। এগুলা আগে হিন্দি ছিনেমায় দেখেছি, নায়ক নায়িকার পথ আগলে রেখেছে ভেড়ার পাল। কিন্তু আজ নিজ চোখে দেখে এবং একই পরিস্থিতিতে পরে দারুন লাগলো। সেই অভিজ্ঞতা। কাশ্মীরে এগুলা খুবই নরমাল ব্যাপার। পরবর্তীতে আরো বেশ কয়েক বার এই পরিস্থিতে পড়েছি।

ভেড়ার পাল, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮

জোজিলা পাস
এর পর আমরা চলে আসলাম সেই ভয়ংকর জোজিলা পাসে (Zoji La Pass)। এটি শ্রীনগর টু লেহ যাওয়ার ১ডি নং জাতীয় সড়কের ওপর অবস্থিত। এটি কাশ্মীর ও লাদাখের মধ্যে সংযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোনমার্গ থেকে এর দুরত্ব ৯ কিঃমিঃ। এর উচ্চতা ১১,৫৭৫ ফুট। শীতকালে এটি বরফে ঢেকে যায়। তাই এই হাইওয়ে প্রায় ৬ মাস বন্ধ থাকে। এটি খুবই দুর্গম। সব সময় এখানে পাথর ধসে পরে, বরফ গলা পানি এসে রাস্তা নষ্ঠ করে ফেলে। তাই সব সময়ই এর মেরামত করা লাগে। একটু পর পর লেখা আছে রক ফলিং এরিয়া ড্রাইভ কেয়ারফুলি। এই পাস পার হতে বেশ সময় লেগে যায়। অবশ্য ইন্ডিয়ান সরকার এখানে পাহাড়ের নিচ দিয়ে টানেল বানাচ্ছে যা জোজিলা টানেল নামে পরিচিত। এই টানেল হয়ে গেলে সারা বছরই শ্রীনগর-লেহ হাইওয়ে খোলা থাকবে। তখন পার হতে মাত্র ১৫ মিনিট সময় লাগবে।

এই পাসের পিক পয়েন্ট খুবই সরু আর ভয়ংকর। এখানে প্রায়ই জ্যাম লেগে যায়। তখন পার হতে বেশ সময় লাগে। এখানে আসার আগে আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম যাতে গিয়ে দেখি জ্যাম লেগে গেছে। কারণ বিশাল বিশাল ট্রাকের জ্যামই জোজিলা পাসের আসল সৌন্দর্য, আমার কাছে। মনে হলো আমার প্রার্থনা কবুল হয়েছে। এসেই দেখি পিক পয়েন্টে দুই ট্রাক আটকে আছে। আমরা তাড়াতাড়ি গাড়িথেকে নেমে যাই। ট্রাকের লোকেরা জ্যাম সরানোর চেষ্টা করছে। এই অল্প একটু জায়গা দিয়ে বিশাল বিশাল ট্রাকগুলো কিভাবে যায় ভাবতেই অবাক লাগে। সাইড দেয়ার সময় ট্রাকের চাকার কিছু অংশ রাস্তার বাহিরে চলে যায়, যেখানে কোনো মাটি নাই। একটু এদিক সেদিক হলেই কয়েক হাজার ফুট নিচে।

এখানে প্রচুর ঠান্ডা, পাথর গুলো বরফের টুকরো হয়ে আছে। কয়েকটা হাতে নিয়েই বুজতে পারলাম এগুলা অনেক শক্ত, একদম লোহার মতো আর সাইজের তুলনায় ওজন অনেক বেশি। এতো শক্ত বলেই এরা এতো বিশাল ট্রাকের ভার বইতে পারে। মাথার ওপারে পাথর ঝুলতাছিলো, একবার খসে পড়লেই কেল্লা ফতে। সড়কের সাইডে গেলেই পা কাঁপতে থাকে। নিচে কয়েক হাজার ফুট গভীর। এতো ভয়ংকর হলেও জোজিলা পাস অনেক অনেক সুন্দর। উপর থেকে সামনের ভিউ অসাধারণ।

আমাদের ড্রাইভার ফাঁক দিয়ে গাড়ি বের করে নিয়ে এসেছে। জ্যাম তখনও লেগে আছে। আমরা আবার চলা শুরু করলাম। মাঝে মাঝে বরফ গলা জল রাস্তা ভাসিয়ে দিচ্ছে। পানির উপর দিয়েই গাড়ি চলে যাচ্চে। এখানকার রাস্তার কোনো পিচ নাই। পাথর আর পানি এসে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

বালতাল ভ্যালি
জোজিলা পাস থেকে প্রায় ১০-১২ কিঃমিঃ এগোতেই পৌঁছে গেলাম অমরনাথ তীর্থযাত্রীদের বেস ক্যাম্প বালতাল ভ্যালি (Baltal Valley)। এখান থেকে অমরনাথ গুহার দূরত্ব মাত্র ১৪ কিমি। ফলে দিনে দিনেই যাত্রা শেষ করে ফিরে আসা যায়। তবে পুরা রাস্তা ট্রেকিং করে যেতে হয়। পহেলগাঁও থেকেও অমরনাথ গুহায় যাওয়া যায়। তবে দুই দিন ট্রেকিং করা লাগে। পাহাড়ের উপর থেকে নিচে সবুজ বালতাল ভ্যালি অসাধারণ। আমরা আবার সামনের দিকে যেতে থাকলাম।

বালতাল ভ্যালি থেকে আরো ১৫ কিঃমিঃ এগোতেই সকাল ১০:৪৫ এ আমরা পৌঁছে গেলাম সোনমার্গ। আমাদের গাড়ি একটি মুসলিম রেস্টুরেন্ট এর সামনে এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে দুই পাশের সবুজ পাহাড় দেখে দারুন লাগল। আমরা রেস্টুরেন্ট এ ঢুকে রুটি আর সবজি দিয়ে নাস্তা করে নিলাম। তবে রেস্টুরেন্ট এর টয়লেটে গিয়ে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে মাথা নষ্ঠ। বাহিরের সবুজ পাহাড় অসাধারণ। প্রথিবীর আর কোনো টয়লেট থেকে এতো সুন্দর ভিউ হবেনা।

আমাদের আজকের জার্নি আপাদত এখানেই শেষ। একটু পর আমরা ঘোড়ায় চড়ে সোনমার্গ এর আসল সৌন্দর্য উপভোগ করবো।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

সড়ক পথে লেহ টু কার্গিল | কাশ্মীর ভ্রমণ -পর্ব ৩

সমগ্র ভারতের সাথে লাদাখ সড়ক পথে কেবল দুই ভাবে কানেক্টেড। এক লেহ-মানালি হাইওয়ে আর এক শ্রীনগর-লেহ হাইওয়ে। প্রচন্ড তুষারপাতের কারণে এই দুই সড়ক পথ প্রতি বছর ছয় মাস বন্ধ থাকে এবং লেহ সড়কপথে সমগ্র দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। এই পথ পৃথিবীর দুর্গম এবং সুন্দর সড়ক পথগুলোর মধ্যে একটি।

Srinagar-Leh Highway
শ্রীনগর-লেহ হাইওয়ে

শ্রীনগর-লেহ হাইওয়ে
ন্যাশনাল হাইওয়ে ১ (National Highway 1D) বা শ্রীনগর-লেহ হাইওয়ে (Srinagar-Leh Highway) হচ্ছে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শ্রীনগর হতে লেহ শহরের সংযোগকারী জাতীয় সড়ক। এই সড়ক পথে তিনটি উঁচু উঁচু পাস ফোতুলা উচ্চতা ১৩,৪৭৮ ফিট , নামিকা উচ্চতা ১২,১৩৯ ফিট, জোজিলা উচ্চতা ১১,৫৭৫ ফিট বিদ্যমান। সিন্ধু নদের পাশ দিয়ে, পাহাড় কেটে বানানো আঁকাবাঁকা এই সড়ক পথে কার্গিল, পৃথিবীর দ্বিতীয় শীতলতম স্থান দ্রাস, লামায়ুরু, মুনল্যান্ড ইত্যাদি স্থান পরে। এই সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ৪২২ কিঃমিঃ এবং যেতে প্রায় ১০ ঘন্টা ৩০ মিনিট সময় লাগে। কখনো কখনো আরো বেশি লাগে। ভারতের সীমান্ত সড়ক সংস্থা এই সড়কের দেখাশোনা করে এবং তারা প্রায় প্রতিদিনই এর রক্ষণাবেক্ষনের কাজ করে। এই সড়ক জুনের শুরু থেকে নভেম্বরের মধ্যভাগ পর্যন্ত খোলা থাকে। বিদেশী ট্যুরিস্টরা সাধারণত এই পথ এড়িয়ে চলে। এজন বাংলাদেশী হিসাবে আমার অবশ্য এই পথ পারি দেবার সৌভাগ্য হয়েছিল।

লেহ টু কার্গিল
সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৮ লেহ। লাদাখে আজ আমাদের তৃতীয় দিন। কাল সারাদিন আমরা লেহ শহরে সাইট সিং করেছি। আজ আমরা লাদাখ ছেড়ে সড়ক পথে কাশ্মীর চলে যাব। লাদাখ টু কাশ্মীর খুবই লম্বা আর দু:সাহসিক এক জার্নি। তাই সাধারণত সবাই প্রথমে লেহ থেকে কার্গিল অথবা লেহ থেকে সোনমার্গ যায় এবং সেখানে রাত্রি যাপন করে সকালে আবার যাত্রা শুরু করে। আমাদের প্ল্যান হচ্ছে আমরা প্রথমে লেহ থেকে কার্গিল যাব এবং সেখানে রাত্রি যাপন করব। পরে সকালে কাশ্মীরের সোনমার্গ চলে যাব। এই যাত্রাপথে আরো কিছু দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করব।

লেহ থেকে শ্রীনগর গাড়ি ভাড়া
লেহ থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত গাড়ি ভাড়া প্রায় ১৩,০০০-১৫,০০০ রুপি। তবে যে গাড়িগুলো শ্রীনগর থেকে এসেছে তারা ফেরার পথে কমে যাত্রী নিয়ে যায়। চেষ্টা করবেন এমন টাইপের গাড়ি ভাড়া করার জন্য। ভুলেও ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি ভাড়া করতে যাবেন না। তাহলে বেশি পরবে। সব থেকে ভাল হয় হোটেলের ম্যানেজার কে বললে। ওনাদের অনেক চ্যানেল থাকে আর কমে পাওয়া যায়। অবশ্য এজন্য তারা গাড়ির ড্রাইভারের কাছ থেকে কমিশন নেয়। আমরা লেহ থেকে সোনমার্গ পর্যন্ত গাড়ি ভাড়া করলাম ১২,০০০ রুপি দিয়ে। এখানে ১০,০০০ গাড়ি ভাড়া আর ২,০০০ ম্যানেজারের কমিশন। লেহ থেকে কার্গিল পর্যন্ত ভাড়া ৭,০০০ – ৮,০০০ রুপি। আমাদের গাড়ি টয়োটা ইনোভা ৬ জনের জন্য পার্ফেক্ট।

অপূর্ব সুন্দর লেহ-শ্রীনগর হাইওয়ে
সকালে নাস্তা করে আমরা লেহ-শ্রীনগর হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলা শুরু করলাম। ইনোভা গাড়িটি বেশ ভাল। আমাদের ড্রাইভার মুদাস্সের, কাশ্মীরি লোক, বাসা শ্রীনগরে ডাল লেকের পারে। উনি কাল শ্রীনগর থেকে ট্রিপ নিয়ে এসেছেন, আজ ফেরার পথে আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন। ও ভাল কথা এখানে কাশ্মীর আর লাদাখের লোকদের মাঝে প্রচন্ড ক্লেশ বিদ্যমান। একে পক্ষ অন্য পক্ষকে সব সময় দোষারুপ করে, আর তারা অন্যদের থেকে ভালো এটা বুঝাবার চেষ্টা করে। অপর দিকে লেহ এবং কার্গিল লাদাখে হলেও তাদের মাঝেও ক্লেশ বিদ্যমান। লেহ এর লোকেরা তিব্বতি হলেও সাধারণত চীনকে অপছন্দ করে এবং মূল ভারতকে সাপোর্ট করে। অপর পক্ষে কার্গিল, শ্রীনগর এর লোকেরা পাকিস্তান কে সাপোর্ট করে, মূল ভারতকে এরা মোটেও পছন্দ করেনা। এমন কি ভারত পাকিস্তান ম্যাচ হলে তারা পাকিস্তানকেই সাপোর্ট করে। দুই পক্ষই চায় স্বায়ত্ত শাসন। তবে এরা বাংলাদেশ কে খুব পছন্দ করে। তাই সব কিছু মাথায় রেখে নিউট্রাল থাকার চেষ্টা করবেন।

পথেই পড়ল ম্যাগনেটিক হিল, গুরুদুয়ারা পাথর সাহেব, সঙ্গম পয়েন্ট। আগের দিন এগুলা দেখায় আজ আর নামলাম না। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে আমাদের গাড়ি ছুটে চলেছে। আমরা শুধু চোখ দিয়ে আশে পাশের অপূর্ব দৃশ্য দেখছি আর মোবাইলে তার ছবি, ভিডিও ধারণ করছি। রাস্তার দুই পাশে বিশাল বিশাল পাহাড়। কখনো আমরা অনেক নিচে নেমে যাচ্ছি আবার পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যাচ্ছি। তবে রাস্তাগুলো ভুটানের মতো এতো প্যাঁচানো না। পাহাড় গুলোতে তেমন কোনো গাছপালা নাই। তবুও কত সুন্দর আর কালারফুল। কিছু পাহাড় কালো, কিছু বাদামি, কিছু আবার হলুদ, কিছু হালকা লাল, কিছু ধূসর। কারো মাথায় সাদা সাদা বরফ। এক কথায় চমৎকার। এতদিন শুধু সবুজ বা আরবের লালচে পাহাড় দেখেছি। কিন্তু এমন অদ্ভুত কালার কম্বিনেশন আগে কখনো দেখি নাই। লাদাখের এই মরুভূমিতে গাছপালা ছাড়া পাহাড় এতো সুন্দর হলো কিভাবে?

কখনো কখনো রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী। একটু পর পর পাহাড় বেয়ে বরফ গলা পানি গড়িয়ে পড়ছে। আশপাশ একদম ফাঁকা কোথাও লোকজন নাই। এমন জনবিরল জায়গা হলেও দিন বা রাত কোনো সময়ই চুরি ডাকাতির নাকি কোনো সম্ভবনা নাই। এমনটাই জানালো মুদাস্সের ভাই।

পথে আমরা খালসি নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করে লাঞ্চ করে নেই। এখানে বেশ কিছু পাঞ্জাবি ধাবা রয়েছে। এখানকার এপ্রিকট খুবই উন্নতমানের এবং দামেও সস্তা। আমরা প্রতি কেজি ২০০ রুপি করে বাসার জন্য ২-১ কেজি করে এপ্রিকট কিনে নেই। কাশ্মীরে সবখানেই এপ্রিকট পাওয়া যায়। তবে এখানেই সব থেকে ভালো মানের এপ্রিকট হয়। তাই কিনতে চাইলে এখান থেকেই নিবেন।

খালসি, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৮ বিকাল ০৪:০০

লাদাখে বাইক চালানো
মাঝে মাজে চোখে পড়ছে রয়েল এন্ড ফিল্ড ব্রান্ডের বেশি সিসির বাইক নিয়ে অনেকে দল বেঁধে সাই সাই করে চলে যাচ্ছে। লাদাখে বাইক চালানো সব থেকে মজাদার। অনেকে এজন্যই লাদাখে আসে। এখানে ভাড়ায় বাইক পাওয়া যায়। ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকলে ১০০০ – ১২০০ রুপিতে সারাদিনের জন্য বাইক ভাড়া পাওয়া যায়। ফুয়েল খরচ নিজের। অনেকেই লেহ থেকে বাইক নিয়ে শ্রীনগর চলে যায় বা শ্রীনগর থেকে লেহ আসে। দুই জায়গাতেই তাদের লোক থাকে। সেখানে জমা দিলেই কাজ শেষ। এখানে পেট্রোল পাম্প অনেক দূরে দূরে। তাই গেলোনে করে আলাদা পেট্রোল সাথে নিয়ে নিতে হয়। ড্রাইভিং না জানায় আমার এ শখ এবার আর পূরণ হলোনা।

ফটুলা পাস
ফটুলা পাস (Fotu la pass or Foto la pass) লেহ-শ্রীনগর হাইওয়ের সব থেকে উঁচু পাস বা স্থান। এর উচ্চতা প্রায় ১৩,৪৭৮ ফিট। এটি লেহ শহর থেকে প্রায় ১০০ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। ফটুলা পাসের রাস্তা বেশ ভালো এবং এখানে গাড়ি চালাতে তেমন সমস্যা হয় না। এই পাসের উপর দিয়ে গাড়ি চালানো খুবই আনন্দদায়ক। এখানে আর্মিদের ছোট এক ক্যাম্প রয়েছে। সম্ভবত সিগনালিং এর কাজ করা হয়। এখানে AMS এর সমস্যা হতে পারে। তাই বেশি করে পানি খাবেন।

মুন ল্যান্ড
লামায়ুরু গ্রামের ল্যান্ডস্কেপ অনেকটাই দেখতে চাঁদের মাটির মতো। তাই ট্যুরিস্টরা একে মুনলান্ড (Moonland) বলে। এখানকার মাটি পৃথিবীর সাধারণ মাটি বা পাথর থেকে আলাদা। লেহ-শ্রীনগর হাইওয়ে ধরে এগিয়ে গেলে ফটুলা পাসের পরেই মুনলান্ড। মুনলান্ড লেহ শহর থেকে প্রায় ১১২ কিঃমিঃ এবং কার্গিল শহর থেকে প্রায় ১০৬ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। আমরা গাড়ি থেকে নেমে এখানে কিছুক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। মুনলান্ড দেখতে আসলেই অদ্ভুত। এমন জায়গা আগে দেখি নাই কোথাও। দেখতে সুন্দর হলেও মাঝে মাঝে ভয় লাগে। ল্যান্ডস্ক্যাপ ফটোগ্রাফার দের জন্য মুনলান্ড আদর্শ স্থান। তবে মুনলান্ড এর বেস্ট ভিউ পেতে হলে আপনাকে হালকা ট্রেকিং করে লামায়ুরু গুমপার পাশে মেডিটেশন হিলের উপর উঠতে হবে। সেখান থেকেই পুরা মুনলান্ড এর সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। এখানে সালমান খানের রেস্ ৩ মুভির শুটিং হয়েছে। আমাদের দেশের এক শিল্পীও তার গানের মিউজিক ভিডিও এখানে শুট করেছে।

লামায়ুরু মনাস্ট্রি
লামায়ুরু মনাস্ট্রি (Lamayuru Monastery) লেহ জেলার লামায়ুরু গ্রামে অবস্থিত। এটি লেহ শহর থেকে প্রায় ১১৫ কিঃমিঃ দূরে লেহ-শ্রীনগর হাইওয়েতে অবস্থিত। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১১,৫২০ ফিট। এটি লাদাখের সব থেকে বড় এবং প্রাচীন মনাস্ট্রি। মেডিটেশন হিল থেকে পুরা লামায়ুরু গ্রামের সব থেকে ভালো ভিউ পাওয়া যায়। আমরা এখানে কিছু সময় পার করি এবং ছবি তুলি।

কার্গিল শহর
এর পর আমরা চলে আসি সেই বিখ্যাত কার্গিল শহরে। এটি লাদাকের কার্গিল জেলায় অবস্থিত এবং লাদাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। কার্গিল লেহ থেকে প্রায় ২৩৪ কিঃমিঃ, শ্রীনগর থেকে ২০৪ এবং দ্রাস থেকে ৬০ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত। এই জেলাতেই ১৯৯৯ সালে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে এক যুদ্ধ হয় যা কার্গিল ওয়ার নাম পরিচিত। আজ রাতে আমরা এখানেই থাকব। আমরা এক হোটেলে রুম নিয়ে নিলাম। প্রতি রুমের ভাড়া ১১০০ রুপি। ফ্রেশ হয়ে খাবার খেতে চলে গেলাম। মুদাস্সের ভাই আমাদের এক মুসলিম রেস্টুরেন্ট এ নিয়ে গেল। আমরা মুরগিরমাংস, ভাত, সবজি খেলাম। এরা ঘন এবং বেশি করে ঝোল দিয়ে মাংস রান্না করেছে। খেতে দারুন লাগল। তিন দিন পর আজ তৃপ্তি করে খেলাম। কাশ্মীরের লোকেরা সব খাবারই ঝোল করে রান্না করে। আপনারা ড্রাইভার কে বলবেন আপনার বাজেট অনুসারে রুম ঠিক করে দিতে। নাহলে রাতের বেলায় ঘুরতে ঘুরতে শেষ।

খাবার খেয়ে আমরা রুমে চলে আসি। এসে ওয়াইফাই কানেক্ট করে বাসার সবার সাথে কথা বলে নেই। আমি অবশ্য সেভ করতে চেয়েছিলাম। কয়েকদিনের ধকলে চেহারার অবস্থা করুন। কিন্তু এখানে সব কিছুই রাত ৮ টার ভিতর বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের হোটেল সুরু নদীর পারেই। সুরু সিন্ধুর এক শাখা নদী। এই পাহাড়ি নদীতে প্রচন্ড স্রোত। রাতে স্রোতের শব্দ রুম থেকে ভয়ঙ্কর লাগছিল। কার্গিলেও প্রচন্ড ঠান্ডা আর বাতাস। তাই তাড়াতাড়ি বিছানায় চলে যাই।

টিভিতে কার্গিল যুদ্ধ নিয়ে অনেক মুভি দেখেছি। আমার হোটেল থেকে সামান্য কিছু দূরেই যুদ্ধ ক্ষেত্র। বিছানায় শুয়ে শুয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা আর নিজের বর্তমান লোকেশন চিন্তা করে কেমন জানি লাগছিলো। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা করি। কাল সকালে আমরা কার্গিল থেকে সোনমার্গ যাব।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

লাদাখের দর্শনীয় স্থান সমূহ | কাশ্মীর ভ্রমণ -পর্ব ২

লাদাখ ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের একটি অঞ্চল। এর উত্তরে কুনলুন পর্বতশ্রেণী এবং দক্ষিণে হিমালয় পর্বতমালা। এই এলাকার অধিবাসীরা ইন্দো-আর্য এবং তিব্বতী বংশোদ্ভুত। একসময় বালটিস্তান উপত্যকা, সিন্ধু নদ উপত্যকা, নুব্রা উপত্যকা, জাংস্কার, লাহুল ও স্পিটি, রুদোক ও গুজ ইত্যাদি এলাকা লাদাখের অংশ ছিল। কিন্তু বর্তমানে লাদাখ শুধুমাত্র লেহ জেলা ও কার্গিল জেলা নিয়ে গঠিত।

magnetic hill in ladakh
ম্যাগনেটিক হিল

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৮ লেহ। লাদাখে আজ আমাদের দ্বিতীয় দিন। গতকাল সকালেই আমরা ঢাকা থেকে লাদাখের লেহ শহরে এসেছি। আমরা কিভাবে এখানে আসলাম তা আমার আগের পোস্টে বিস্তারিত দেয়া আছে। এখানে আমাদের হোটেল নিউ টাউন এলাকায়। হোটেলটি মোটামোটি ভালই। ওয়াইফাই, গরম পানি, টিভি ইত্যাদি সব কিছুই রয়েছে। সকালের নাস্তা আর রাতের খাবার সহ ডিলাক্স ডাবল বেডের প্রতিরুমের ভাড়া ১৫০০ রুপি। AMS থেকে বাঁচতে কাল সারাদিন আমরা হোটেলে ঘুমিয়েই কাটিয়েছি। শুধুমাত্র সন্ধ্যার পর একটু মার্কেটে ঘুরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আসার পথে আমাদের টিমের কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পরে। সাথেসাথেই হাসপাতাল নিয়ে যাই। ভাগ্য ভাল তেমন মেজর কোনো সমস্যা হয় নাই। তাই হোটেলে নিয়ে আসি। আসার পথে ১২০০ রুপি দিয়ে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে নেই।

রাতে বেশ ঠান্ডা পড়েছিল। সকালে তার থেকে আরো বেশি ঠান্ডা। এই ঠান্ডার মাঝেও গোসল করে রেডি হয়ে নেই। ৯ তার দিকে আমাদের গাড়ি চলে আসবে। আজ সকালে সবাই মোটামোটি সুস্থ এবং বাহিরে যাবার জন্য প্ৰস্তুত। আজ আমাদের লেহ সাইটসিং করার প্ল্যান আছে। তার আগে চলুন লাদাখ সম্পর্কে জেনে নেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

লাদাখের ইতিহাস
লাদাখের ইতিহাস খুবই করুন। বিভিন্ন রাজা বিভিন্ন সময় লাদাখ আক্রমণ করে এবং শাসন করে। যার ফলে লাদাখের আয়তন কখনো সংকুচিত আবার কখনো প্রসারিত হতে থাকে। সর্ব শেষ ১৮৩৪ সালে কাশ্মীরের ডোগরা সেনাপতি জোরাওয়ার সিং কাহলুরিয়া লাদাখ আক্রমণ করে একে কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত করে। ১৮৫০ সাল থেকে লাদাখে ইউরোপীয়দের আনাগোনা শুরু হয়। খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ১৮৮৫ সালে লেহ শহরে দপ্তর খোলা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলে কাশ্মীরের ডোগরা শাসক হরি সিং অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে সই করে। যার ফলে কাশ্মীর রাজ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তখন পাকিস্তান লাদাখ ও কাশ্মীরের অনেক অংশ দখল করে নেয়। এর ফলে প্রথম ভারত -পাকিস্তান যুদ্ধের সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়। লাইন অফ কন্ট্রোল (LOC ) জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত করে। এর ফলে কাশ্মীরের ১/৩ অংশ এলাকা চলে যায় পাকিস্তানের কাছে যার নাম এখন আজাদ কাশ্মীর। আর বাকি এলাকা থাকে ভারতের কাছে। অপরদিকে লাদাখের গিলগিত-বালতিস্তান এলাকা চলে যায় পাকিস্তানের কাছে। আর লেহ এবং কার্গিল জেলা থাকে ভারতের কাছে।

লাদাখের দর্শনীয় স্থান সমূহ
লাদাখের দর্শনীয় স্থান গুলোর মাঝে নুব্রা ভ্যালি, প্যাংগং লেক, খারদুংলা পাস, তুর্তুক গ্রাম, মুনল্যান্ড, লেহ সাইট সিং উল্ল্যেখযোগ্য। লেহ সাইট সিং মানে লেহ শহরে আশে পাশের দর্শনীয় স্থান সমূহ দেখা। এই লেহ সাইট সিং এর মাঝে পরে সঙ্গম পয়েন্ট, গুরুদুয়ারা পাথর সাহেব, হল অফ ফেম, শান্তি স্তুপা, লে প্যালেস, সে প্যালেস, থিকসে মনাস্ট্রি, থ্রি ইডিয়টস স্কুল ইত্যাদি। এগুলার জন্য মোটামোটি একদিন হলেই চলে এবং কোন পারমিশন এর দরকার নাই। লেহ সাইট সিং এর জন্য গাড়ি ভাড়া নিবে ২৫০০ রুপি। তবে নুব্রা ভ্যালি, প্যাংগং লেক, খারদুংলা পাস যাবার জন্য সব দেশের (ইন্ডিয়ান সহ) নাগরিকদের লেহ ডিসি অফিস থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সহ আরো কিছু দেশের জন এই অনুমতি দেয়া লেহ ডিসি অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। তাদেরকে নিজ দেশে অবস্থিত ইন্ডিয়ান হাইকমিশন থেকে অনুমতি নিতে হয়। নুব্রা ভ্যালি, প্যাংগং লেক, তুর্তুক গ্রাম যেতে হলে কমপক্ষে তিন দিন সময় লাগবে। খারদুংলা পাস নুব্রা ভ্যালি যাবার পথে পরে।

এই বিষয়ে অনুমতির জন্য একেক সময় একেক নিয়ম থাকে। একবার বন্ধ থাকে তো আবার খুলে। তাই যাবার আগে কোন জায়গা থেকে, কিভাবে নিতে হয় জেনে যাবেন। আমরা যখন যাই তখন এই অনুমতি বাংলাদেশীদের জন্য মোটামোটি বন্ধ ছিল। অনেক চেষ্টা করেও আমরা অনুমতি ম্যানেজ করতে পারিনাই। তবে লেহ তে কিছু দালাল আছে যারা ডিসি অফিস থেকে অনুমতি ম্যানেজ করে দেয় টাকার বিনিময়ে। এরা মূলত পরিচয় গোপন করে কলকাতার লোক হিসাবে নিয়ে যায়, যা খুবই রিক্সি। একবার ধরা পড়লে খবর আছে। আমাদেরকেও অনেকে এই অফার দিয়েছিল। তবে অন্য দেশের আইডেন্টিটি নিয়ে যেতে বিবেকে বাধা দিল। তাই আর ওই দিকে যাই নাই। যদি কখনো ওপেন করে তাহলে যাব একদিন। তবে খুশির খবর হচ্ছে এখন ঢাকা থেকে এই অনুমতি সহজে পাওয়া যায়। বসুন্ধরা ইন্ডিয়ান ভিসা এপ্লিকেশন সেন্টারে ৩০০ টাকার বিনিময়ে এই অনুমতি পাওয়া যায়। তার জন্য অবশ্য আপনার ইন্ডিয়ান ভিসা এবং তার মেয়াদ থাকতে হবে।

লেহ সাইটসিইং
লেহ জেলা আয়তনের দিক থেকে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা। প্রথম গুজরাট রাজ্যের কচ্ছ জেলা। লেহ শহর লেহ জেলার সদরদপ্তর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই শহর ৩,৫২৪ মিটার বা ১১,৫৬২ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এই শহর চারিদিকে হিমালয়ের পর্বত দ্বারা বেষ্টিত। এর আয়তন প্রায় ৪৫,১১০ বর্গ কিঃমিঃ। ২০০১ সালের হিসাব অনুযায়ী এই শহরের জনসংখ্যা প্রায় ২৭,৫১৩ জন।

সকালে আমরা লাদাখী রুটি, ডিম, গাজরের আচার, চা ইত্যাদি দিয়ে নাস্তা শেষ নেই। নাস্তা শেষ করেই দেখি আমাদের গাড়ি চলে এসেছে। ১০ টার পর পর আমাদের গাড়ি চলা শুরু করল। ড্রাইভার মুজাফ্ফর গাড়িতে লাদাখী গান চালু করে দিল। আমাদের প্রথম গন্তব্য ম্যাগনেটিক হিল। ও ভালো কথা লাদাখে এই গরম আবার এই ঠান্ডা। তাই সাথে সেভাবেই জামাকাপড় নিবেন। ঠান্ডা লাগলে পড়বেন, গরম লাগলে খুলে ফেলবেন। ঠান্ডার জন্য এরা দেরি করে ঘুম থেকে উঠে। সকাল সকাল বের হতে চাইলে রাতেই বলে দিবেন।

ম্যাগনেটিক হিল লাদাখ
ম্যাগনেটিক হিল বা গ্রাভিটি হিল হল এমন এক জায়গা যেখানে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে রাখলেও গাড়ি আপনা আপনি এগিয়ে চলে। এটি আসলে এক ধরণের অপটিক্যাল ইলুশন বা দৃষ্টি ভ্রম। মানে আশেপাশের পরিবেশ এমন একটি পরিস্থিতির তৈরী করে যাতে ঢালু রাস্তাকে উঁচু রাস্তা মনে হয়। বেপারটা খুবই ইন্টারেষ্টিং। নিজ চোখে দেখার জন্য আর ধৈর্য ধরতে পারতেছিলাম না। পৃথিবীতে এমন জায়গা বেশ কিছু আছে। লাদাখের লেহ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিঃমিঃ দূরে লেহ-শ্রীনগর হাইওয়ে তে রয়েছে এমন একটি ম্যাগনেটিক হিল। যেখানে গাড়ি প্রায় ২০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বেগে সামনে এগিয়ে যায়। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১৪,০০০ ফুট।

অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা চলে আসলাম ম্যাগনেটিক হিল (Magnetic Hill Ladakh)। দাগকাটা নির্ধারিত জায়গায় আসা মাত্রই ড্রাইভার স্টার্ট বন্ধ করে দিল। আর গাড়ি আপনা আপনিই সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। যদিও সামনের রাস্তাটি উঁচু হবার কারণে গাড়িটি পিছনে যাওয়ার কথা। বেপারটা দারুন লাগল। জায়গাটি খুবই অসাধারণ। দুই পাশের সোনালী রঙের পাহাড় আর তার মাঝ দিয়ে সোজা কাল রঙের পিচ্ ঢালা পথ দেখতে দারুন। ছবি তোলার জন্য দারুন এক জায়গা। আমরা নেমে প্রচুর ছবি তুললাম, রাস্তায় গড়াগড়ি দিলাম। এখানে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। চাইলে নাস্তা করতে পারেন। আর এখানে কোয়াড বাইকিং এর ব্যবস্থা আছে। টাকা দিয়ে চালাতে পারেন, দারুন এক্সসাইটিং।

সঙ্গম পয়েন্ট
এর পর আমরা ম্যাগনেটিক হিল থেকে আরো প্রায় ৫ কিঃমিঃ সামনে এগিয়ে গেলাম। জায়গাটির নাম সঙ্গম পয়েন্ট। এখানে আসলে লাদাখের দুই নদী ইন্দুস আর জান্সকার এসে মিলিত হয়েছে। মূল জায়গাটি বেশ নিচুতে। আমরা একদম নিচে নদীর কাছে চলে গেলাম। জায়গাটি খুবই চমৎকার। নদীর জল ঘোলাটে এবং শীতল। এখানে রাফটিং করার ব্যবস্থা আছে। সময় থাকলে চেষ্টা করতে পারেন। এখানে কিছু লাদাখী জিনিসপত্র পাওয়া যায়। কিনতে পারেন। এখানে কিছু সময় অতিবাহিত করে আমরা আবার লেহ শহরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। একটু উপরে উঠে আমরা আবার সঙ্গম ভিউ পয়েন্টে নেমে আরো কিছু ছবি তুললাম। উপর থেকে সঙ্গম পয়েন্ট এর ভিউ আরো সুন্দর।

সঙ্গম পয়েন্ট, সেপ্টেম্বর ১৭: দুপুর ১২: ২৫

গুরুদোয়ারা পাথর সাহেব
লেহ তে ফিরার পথে আমরা গেলাম শিখ ধর্মালম্বিদের এক ধর্মীয় স্থানে। এটি লাদাখের লেহ শহরের কাছে প্রায় ১২০০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। ১৫১৭ সালে শিখদের প্রথম গুরু, গুরু নানক লাদাক এসেছিলেন। উনার সম্মানেই সেই সময়ে এটি বানানো হয়। এখানে সব সময় ফ্রিতে খাবার পরিবেশন করা হয় যাকে লঙ্গর বলে। সময় তখন দুপুর। আর ডিসকভারি চ্যানেলে এগুলা অনেক দেখেছি, তাই কৌতহলবসত ভিতরে প্রবেশ করি। জুতা খুলে প্রবেশ করতেই তারা হলুদ কাপড় দিয়ে দিলো মাথায় বাধার জন্য। কাপড় মাথায় বেঁধে নিলাম। পথেই এমন ভাবে পানি দিয়ে রাখছে যাতে ওই পানিতে না পাড়া দিয়ে সামনে কেউ আগাতে না পারে। পা ধুয়ে সামনে এগিয়ে প্লেট নিয়ে বসে গেলাম, একটু পরেই খাবার দিয়ে দিলো। এখানে খেয়ে নিজের প্লেট নিজেই পরিষ্কার করে রাখতে হয়।

এখানে একটা জিনিস বেশ ভালো লেগেছে। আমাদের দেশে সাধারণত কোন বাবার মাজারে যত টাকা পয়সা উঠে তার সব কিছুই বাবার লোকজন ভোগ করে। কেবল বছরে একবার আমজনতাকে খিচুড়ি খাওয়ায়। আর এরা দানের সব কিছু দিয়ে প্রতিদিন আগত মানুষদের ভোজন করায়। পাশেই আর্মি ক্যাম্প থাকায় প্রচুর আর্মির লোকদেরও দেখলাম খাবার খেতে এবং স্বেচ্ছায় সেবা করতে। আর্মিরাই সব কিছু ম্যানেজ করে। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। যাই হোক খাবারের টেস্ট কিন্তু তেমন একটা ভালো ছিলনা। ফ্রি বলে না, লাদাখের খাবার আসলে এমনই। আপনারাও এখান থেকে অবশ্যই লাঞ্চ করে নিবেন।

হল অফ ফেম
এর পর আমরা গেলাম হল অফ ফেম এ। এটি আসলে একটি আর্মি মিউজিয়াম। ইন্ডিয়ান আর্মিদের বিভিন্ন যুদ্ধের স্মৃতি, অস্ত্র, ট্যাঙ্ক, সাজুয়াজান ইত্যাদি এখানে সাজানো রয়েছে। ভিতরে প্রবেশ করতে ২০রুপির টিকেট কাটা লাগে। সময় কম থাকায় আমরা কেবল বাহির থেকেই ছবি নিয়ে চলে আসি। এখানে একটা জিনিস খুব ভালো লাগল। মূলফটকেই আর্মির সোলজাররা অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা ছবি তুলছি দেখে তারা আস্তে করে দুইপাশে চলে গেল। ব্যারটা একটু অন্যরকম লাগল।

থিকসে মনাস্ট্রি
এর পর আমরা গেলাম থিকসে মনাস্ট্রি তে। এটি লেহ শহর থেকে প্রায় ২০ কিঃমিঃ দূরে লেহ-মানালি হাইওয়েতে অবস্থিত। প্রায় ৬০০ বছর পুরানো এবং ১২ তলা বিশিষ্ট থিকসে মনাস্ট্রি লাদাখি স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। ভিতরে প্রবেশ করতে ৩০রুপির টিকেট কাটা লাগে। থিকসের প্রধান আকর্ষণ হল দোতলা সমান বৌদ্ধ মূর্তি যা ১৯৭০ সালে নির্মিত হয়েছিল দালাই লামার থিকসে আগমন উপলক্ষে। এখানে আরো রয়েছে অসংখ্য স্তূপ, থাংকা, দেওয়ালচিত্র, মূল্যবান পুঁথি ও মন্দির। আমরা টিকেট কেটে ভিতরে প্রবেশ করি এবং বিভন্ন কক্ষ পরিদর্শন করি। সিঁড়িদিয়ে আমরা একদম ছাদে উঠে যাই। ছাদ থেকে আশেপাশের ভিউ অস্থির সুন্দর। এর পর আমরা আবার লেহ শহরের দিকে ফিরতে থাকি।

Thikse Monastery leh
থিকসে মনাস্ট্রি, সেপ্টেম্বর ১৭: দুপুর ০৩: ৪০

থ্রি ইডিয়টস স্কুল
এর পর আমরা গেলাম আমির খানের সেই বিখ্যাত মুভি “থ্রি ইডিয়টস” এর থ্রি ইডিয়টস স্কুলে। থ্রি ইডিয়টস মুভির কারণে এটি এখন একটি ভাল ট্যুরিস্ট স্পট। স্কুল কতৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ট্যুরিস্টদের জন্য নির্ধারিত সময়ে মুভির শুটিং স্পট গুলো ভিসিট করা যায়। আমরা ভিতরে প্রবেশ করে সেই বিখ্যাত ইডিয়টিক ওয়াল এর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি এবং স্কুলের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করি। এখানে একটি ক্যাফে রয়েছে যেখানে নানান ধরণের খাবার পাওয়া যায়। আমরা দুপুরের লাঞ্চ এখানেই সেরে ফেলি। এখানকার খাবার একদম ফ্রেশ, অসাধারণ তার টেস্ট। স্কুলের গেইটের বাহিরের দিকটাও অনেক সুন্দর। ছোট ছোট সাদা রঙের স্থাপনাগুলো অসাধারণ।

সে প্যালেস
ফিরার পথে এর পর আমরা গেলাম সে প্যালেস (Shey Palace Leh) এ। এটি লেহ শহর থেকে প্রায় ১৫ কিঃমিঃ দূরে লেহ-মানালি হাইওয়েতে সে গ্রামে অবস্থিত। একসময় এটি লাদাখের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী ছিল। লাদাখের রাজা, দেলদান নামগয়াল ১৬৫৫ সালে এটি নির্মাণ করেন। তিনি একই বছর তার বাবার স্মরণে এখানে একটি মনাস্ট্রি তৈরী করেন, যা সে মনাস্ট্রি (Shey Monastery) নামে পরিচিত। দুইটা এক সাথে সে প্যালেস কমপ্লেক্স নাম পরিচিত। পুরা কমপ্লেক্স একটি টিবির উপর অবস্থিত। প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক আসে একে দেখার জন্য। বাহির থেকে দেখতে অনেকটা সিরিয়ার বিদ্ধস্ত কোনো প্রাসাদের মতো মনে হলেও সে প্যালেস খুবই সুন্দর।

লেহ প্যালেস
এর পর আমরা গেলাম লেহ প্যালেস (Leh Palace) এ। এটি লেহ শহরে এক পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। তিব্বতের পাতলা প্যালেসের (Potala Palace) আদলে নির্মিত ৯ তলা এই ভবনটি এক সময় লাদাখ রাজ্যের রয়েল প্যালেস ছিল। লাদাখের রাজা সেনজ্ঞে নামগয়াল ১৬ শতকে এটি নির্মাণ করেন। সব থেকে উপরের তলায় রয়েল পরিবার বসবাস করত। আর নিচের দিকে ছিল ষ্টোর রুম, অশ্বশালা ইত্যাদি। বর্তমানে এটি মিউজিয়াম এবং প্রবেশ ফি দিতে হয়। লেহ প্যালেস এর ছাদ থেকে লেহ শহর এবং আশেপাশের এলাকার সুন্দর প্যানোরোমিক ভিউ পাওয়া যায়।

Leh Palace
লেহ প্যালেস, সেপ্টেম্বর ১৭: দুপুর ০৫: ৪০

শান্তি স্তুপা
এর পর আমরা গেলাম লেহ শহরে অবস্থিত বৌদ্ধ ধর্মের এক ধর্মীয় স্থানে, যার নাম শান্তি স্তুপা (Shanti Stupa)। এটি ১৯৯১ সালে জাপানিরা নির্মাণ করেন। প্রায় ১১,৮৪১ ফুট উপরে অবস্থিত সাদা রঙের এই স্তুপা দেখতে দারুন সুন্দর। এখান থেকে পুরা লেহ শহরের সুন্দর এবং আশেপাশের এলাকার দারুন প্যানোরোমিক ভিউ পাওয়া যায়। এর রাতের সৌন্দর্য কোন অংশে কম নয়। তাই বিকালে গেলে ভালো, যাতে একসাথে দিন-রাতের ফ্লেভার পাওয়া যায়। একেবারে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে প্রচুর বাতাস, যার ফলে মারাত্মক ঠান্ডা। আমরা সন্ধ্যার আগে যাই এবং সন্ধ্যার পর আরো কিছুক্ষন থাকি। তখন তাপমাত্রা কম করে হলেও মাইনাস ৪-৫ ডিগ্রী হবে। ঠান্ডায় একেকজন রীতিমতো থর থর করে কাঁপতেছিলাম। উচ্চতার কারণে AMS এর সমস্যা হয়। গাড়ি থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে উঠা লাগে। তাই সাবধানে থাকবেন। তবে এতো প্রতিকুল হলেও লেহ গেলে কোনো ভাবেই একে না দেখে চলে আসবেন না।

লেহ মার্কেট
এর পর আমরা রুমে চলে আসি। ফ্রেশ হয়ে আবার চলে যাই লেহ সিটি মার্কেটে (Leh City Market)। এটি লাদাখ এলাকার প্রধান এবং সব থেকে বড় মার্কেট। মার্কেট টি দেখে খুবই সুন্দর এবং পরিষ্কার। দুই পাশে সারি সারি দোকান, মাঝখানে ফাঁকা, যেখানে বেশ কিছু বেঞ্চ দেয়া আছে বসার জন্য। দেখে মনে হবে যেন ইউরোপের কোনো স্থান । এখানে ভালো মানের উলের কাপড় এবং স্থানীয় হস্তশিল্প আইটেম পাওয়া যায়। শান্তি স্তুপায় ঠান্ডা খেয়ে আমরা সবাই এখন থেকে আরো কিছু শীতের কাপড় কিনে নেই। দাম ও খুব একটা বেশি না।

এখানে my father was in Ladakh, my brother was in Ladakh, my sister was in Ladakh ইত্যাদি নানান ধররের লেখা সম্বলিত টিশার্ট পাওয়া যায়। দাম ৩০০-৪০০ রুপি। আমরা কয়েকটা কিনে নিলাম। এখানকার আপেলের টেস্ট কিন্তু দারুন, খেতে মিস করবেন না। অনেক্ষন ঘুরাঘুরি করে ক্লান্ত, তাই ভাবলাম চা বা কফি কিছু খাই। পাশের এক চা দোকানে গেলাম চা খেতে। এদের চা বানানোর সিস্টেম দেখে পুরাই অবাক। এরা আমাদের মতো চা পাতা পানিতে দিয়ে সারাক্ষন জাল দিতে থাকেনা। কেউ অর্ডার করলে তার জন্য যে পরিমান দরকার সে পরিমান পানি দিয়ে তখনই চা বানিয়ে দেয়। এবং বানানো শেষে চুলা বন্ধ করে রাখে। এখানকার সব রেস্টুরেন্ট এর খাবারের সিস্টেমও একই। অর্ডার করার পরেই তরকারি নতুন করে রান্না করে। একটু সময় লাগে, কিন্তু সব কিছু একদম ফ্রেশ।

লেহ তে সবাই সকাল সকাল ঘুমিয়ে পরে, দোকান পাট মোটামোটি ৮ থেকে ৮:৩০ আর মাঝেই বন্ধ হয়ে যায়। তাই আর দেরি না করে হোটেলে ফিরে আসি। এসে মুরগি, ডিম, সবজি, ডাল আর ভাত খেয়ে নেই। আমাদের হোটেলের ম্যানেজার মুসলিম। তাই তাকে আগেই বলে দিয়েছিলাম আমাদের সব কিছু যাতে মুসলিম তরিকায় রান্না করা হয়। রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে বাসার সবার সাথে কথা বলে, কিছু ছবি ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি। কাল সকালে আবার লম্বা জার্নি আছে লেহ টু শ্রীনগর

লেহ তে ঘুরার মতো আরো কিছু জায়গা আছে। কিন্তু সময় কম থাকার কারণে আর কোথাও যেতে পারিনাই। একদিনে আসলে এর বেশি সম্ভবও না। নুব্রা ভ্যালি, প্যাংগং লেক, খারদুংলা পাস, তুর্তুক গ্রাম এ যেহেতু আমাদের আপাদত যাবার অনুমতি, নাই তাই এবার এগুলা বাদ। পরবর্তীতে আবার লাদাখ যাবার ইচ্ছা আছে। তখন বাকি গুলা টাচ করবো।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

আরামদায়ক লঞ্চ ভ্রমণ

নদীমাতৃক বাংলাদেশে লঞ্চ ভ্রম খুবই আরামদায়ক এবং উপভোগ্য। লঞ্চ এ ভ্রমণ করলে বাস বা ট্রেন এর মতো ক্লান্তি আসেনা। ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন প্রচুর লঞ্চ দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বেশির ভাগ লঞ্চ সাধারণত রাতে চলাচল করে। তবে চাঁদপুর এর লঞ্চ দিনের বেলায় ও চলে। আপনে পরিবার বা বন্ধু বান্ধব নিয়ে সন্ধ্যায় রওনা দিয়ে সকালে ভোলা বা বরিশাল নেমে সারাদিন ঘুরাঘুরি করে আবার সন্ধ্যার লঞ্চ ধরে সকালে ঢাকায় চলে আসতে পারেন।

লঞ্চ এ ভ্রমণ করলে আপনে আশেপাশের অনেক সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখতে পারবেন। রাতে ছাদে বসে চাঁদ উপভোগ করতে পারবেন। আরো দেখতে পারবেন নদীতে জেলেদের ইলিশ মাছ ধারা। মাঝ নদীতে সূর্যদয় এবং সূর্যাস্ত খুবই উপভোগ্য। নদীর আশেপাশের গ্রামগুলা ছবির মতো মনে হয়। নদীর পারে গরু, ছাগল, মহিষ ইত্যাদি গবাদি পশু ঘাস খেয়ে বেড়ায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলা করে। পাশ দিয়ে লঞ্চ যাবার সময় আশেপাশের বাড়ি থেকে লোকজন বের হয়ে হাত নেড়ে স্বাগত জানায়। নদীর পারের সব কিছু শুধু সবুজ আর সবুজ। ঢাকায় এগুল দেখা যায় না।

লঞ্চের ভাড়া:
ঢাকা থেকে বরিশাল, ভোলার লঞ্চের ভাড়া :
সিঙ্গেল কেবিন ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা। ডাবল কেবিন ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। ডেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। সিঙ্গেল এবং ডাবল দুই ধরণের কেবিন রয়েছে। একটি সিঙ্গেল কেবিনে এক এবং ডাবল কেবিনে দুই টা বেড থাকে। এখন অনেক ভালো ভালো লঞ্চ চলে যাতে আধুনিক অনেক সুবিধাই রয়েছে।

বিলাসবহুল লঞ্চ কর্ণফুলী ১৩ | ঢাকা – বেতুয়া – চরফ্যাশন
কর্ণফুলী ১৩ লঞ্চ ঢাকা-বেতুয়া ( চরফ্যাশন ) রুটের সব থেকে বিলাসবহুল লঞ্চ। লঞ্চটি ৮ই এপ্রিল ২০১৮ সালে ঢাকা-চরফ্যাশন রুটে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। এর ইন্টোরিয়র ডেকোরেশন খুবই চমৎকার। লঞ্চটির অপারেটর ব্রাদার্স নেভিগেশন। প্রায় ৭৭. ৯০ মিটার দীর্ঘ এই লঞ্চের প্রায় সবগুলো রিভারসাইড কেবিনে রয়েছে বারান্দা, টয়লেট, স্মার্ট টেলিভিশন। বিলাসবহুল লঞ্চটিতে আছে মুভি সার্ভার, কিডস্ জোন, ওয়াইফাইসহ আরো নানান আধুনিক সুযোগ সুবিধা। আরো রয়েছে উন্নত মানের রেস্টুরেন্ট , যেখানে পাওয়া যায় ভাত, মাংস, ফ্রাইড চিকেন, নুডলস, চাইনিজ আইটেম সহ আরো নানান ধরণে খাবার। লঞ্চটিতে আছে ২৮ টা ডাবল, ৪৩ টা সিঙ্গেল এবং ৬ টি ভি.আই.পি. কেবিন। আর সবগুলো কেবিনই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত এবং স্মার্ট টেলিভিশন সম্পূর্ণ। এর ইঞ্জিনের ক্ষমতা প্রায় ১২০০ অশ্বশক্তি। লঞ্চটি ঢাকা থেকে রাত ৮:৩০ মিনিটে এবং বেতুয়া (চরফ্যাশন) থেকে সন্ধ্যা ৬.০০ টায় ছেড়ে যায়। এ ছাড়াও মঙ্গলসিকদার ঘাট ,তজুমদ্দিন ঘাট, হাকিমুদ্দিন ঘাট থেকেও যাত্রীরা উঠা নাম করতে পারে।

কর্ণফুলী ১৩ এর ভাড়ার তালিকা :
সিঙ্গেল কেবিন – ১০০০/-
সিঙ্গেল আলাদা বাথমরুম, বারান্দা সহ – ১৫০০/-
ডাবল কেবিন – ২২০০/-
ফ্যামিলি কেবিন – ২৫০০/-
ভিআইপি কেবিন – ৫০০০/-

যেকোন তথ্য জানতে এবং কেবিন বুকিংসহ যোগাযোগ – ০১৭৭৯৯৭২৬৪০

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন।। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণ | কম খরচে লাদাখ কাশ্মীর ভ্রমণ

জম্মু ও কাশ্মীর হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত ভারতের একটি রাজ্য। এই রাজ্যের উত্তরে ও পূর্বে চীন এবং পশ্চিমে পাকিস্তান অবস্থিত। শ্রীনগর এই রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন এবং জম্মু শীতকালীন রাজধানী। জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখ – এই তিন অঞ্চল নিয়ে রাজ্যটি গঠিত। শ্রীনগর সবুজ কাশ্মীর, আর লাদাখ সাদা কাশ্মীর নামে পরিচিত। চলুন জেনে নেই পৃথিবীর স্বর্গ কাশ্মীর ভ্রমণের আদ্যপান্ত।

কাশ্মীর হলো দুনিয়ার বেহেশত। যার নাম শুনলেই সবুজ প্রকৃতির দিকে মন চলে যায়। আহ্, কি সুন্দর করে সাজিয়েছেন এ প্রকৃতি। কাশ্মীরের সৌন্দর্য নিয়ে কত কবি কত কবিতা লিখেছেন, কত গল্পকার কত গল্প লিখেছে। সবাই সাজিয়ে তুলেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। ভ্রমণপিপাসু সবাই চায় জীবনে একবার হলেও কাশ্মীর ঘুরে আসতে। ছোটবেলা থেকেই কাশ্মীরে বিভিন্ন হিন্দি মুভির শুটিং দেখে আমিও কাশ্মীরের প্রেমে পরে যাই এবং জীবনে একবার হলেও কাশ্মীর যাব ঠিক করি।

তবে আমির খানের থ্রি ইডিয়টস মুভি দেখার পরে লাদাখের প্রতিও মানুষের চাহিদা বেড়ে যায়। আমিও ঠিক করি একবার লাদাখ যাব, পরে আরেকবার সবুজ কাশ্মীর যাব। সাধারণত সবাই এমনই প্ল্যান করে। কিন্তু সময় সল্পতার কারণে আমি একসাথে লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেই। খুব কম লোকই এক সাথে দুই জায়গার যায়।

Magnetic Hill ladak
লাদাখের ম্যাগনেটিক হিল এ আমরা: ফাহিম, খাদেম, মেহেদী, রাশেদ, রিয়াজ, আজিজুর

লাদাখ এবং কাশ্মীর কিভাবে যাবেন?
যেকোনো ট্যুরেই একা থেকে দলবদ্ধ ভাবে গেলে অনেক বেশি মজা হয়, আর খরচ ও কমে যায়। দল বা টিমের সাইজ ৪ বা ৬ গুণিতক হলে ভাল। তাহলে নিরাপত্তা নিয়ে তেমন একটা চিন্তা করা লাগেনা এবং হোটেল বুকিং, গাড়ি ভাড়া করতে সুবিধা হয়। আমিও টিম খুঁজতে থাকি এবং ভুটান ট্যুরের মতো এবারও আমার অফিসের ৬ জন কে পেয়ে যাই। যেই কথা সেই কাজ, আমার অফিসের ছয় কলিগ মিলে লাদাখ-কাশ্মীর ভ্রমণের প্লানিং শুরু করে দেই। লাদাখ বা কাশ্মীর যেতে হলে প্রথমেই আপনার থাকতে হবে ভারতীয় ট্যুরিস্ট ভিসা। কিভাবে ভারতের ভিসা নিবেন তা আমার অন্য এক পোস্টে বিস্তারিত লেখা আছে। ভারতের ভিসা থাকলে আপনি বিভিন্ন ভাবে ঢাকা থেকে কাশ্মীর যেতে পারেন।

রুট ০১:
ঢাকা থেকে প্লেনে দিল্লি। সেখান থেকে কাশ্মীর যেতে চাইলে ডমেস্টিক প্লেনে শ্রীনগর, লাদাখ যেতে চাইলে লেহ। এতে খরচ একটু বেশি পরে। তবে সময় অনেক কম লাগে। ঢাকা থেকে কাশ্মীর/লাদাখের সরাসরি কোনো ফ্লাইট আপাদত নাই।

রুট ০২:
ঢাকা থেকে সড়ক পথে বাস/ট্রেন এ কলকাতা বা আগরতলা। সেখান থেকে ডমেষ্টিক প্লেনে দিল্লি। পরে দিল্লি থেকে শ্রীনগর/লেহ। এতে খরচ একটু কম হয়। তবে কলকাতার পরিবর্তে আগরতলা হয়ে গেলে ভাল। এতে সময় কম লাগে। কলকাতা থেকে দিল্লি প্লেনে যে ভাড়া আগরতলা থেকে একই ভাড়া। ঢাকা থেকে আগরতলা যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘন্টা, যেখানে কলকাতা যেতে লাগে প্রায় ১২ ঘন্টা।

রুট ০৩:
ঢাকা থেকে সড়ক পথে বাস/ট্রেন এ কলকাতা। সেখান থেকে ট্রেনে দিল্লি। দিল্লি থেকে শিমলা মানালি হয়ে লেহ। এতে খরচ অনেক কম পরে। তবে আপনার হাতে যদি যথেষ্ট সময় থাকে ও একটু অ্যাডভাঞ্চারাস হন তাহলেই কেবল এ রুটে যাবেন। এ ক্ষেত্রে আপনাকে অন্তত ৪৮০ কি. মি. জার্নি করার মত মানসিক ও শারীরিক শক্তি থাকতে হবে। তবে, এই গ্যারান্টি দিতে পারি যে এটাই হবে আপনার জীবনের সব থেকে সেরা ভ্রমণ। এতে আপনাকে বেশ কয়েকটা ১৫,০০০+ ফিট উঁচু পাস্ পার হয়ে যেতে হবে। তবে এই রুট বছরে মাত্র ছয় মাস খোলা থাকে, মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত।

আপনার সময় এবং বাজেটের উপর নির্ভর করে আপনি আপনার জন্য উপযুক্ত রুট চয়েজ করবেন। তবে প্রত্যেক রুটেই আলাদা মজা। আর প্লেনে যেতে চাইলে সম্ভব হলে কমপক্ষে ৬০ দিন আগে টিকেট কেটে নিবেন। তাহলে অনেক সস্তায় টিকেট পেতে পারেন। বিভিন্ন টিকেট বুকিং সাইট অথবা বিভিন্ন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স এর ওয়েব সাইট থেকে সহজেই টিকেট কাটা যায়। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পেইমেন্ট করে দিবেন। তবে টিকেট কাটার আগে বেশ কয়েকটা এয়ারলাইন্স এ অবশ্যই দাম কম্পেয়ার করে নিবেন। টিকিটের মূল্য একেক এয়ারলাইন্স এ একেক সময় একেক রকম থাকে। আমরা ঢাকা থেকে সড়ক পথে আগরতলা হয়ে দিল্লি যাই। দিল্লি থেকে প্লেনে লাদাখের লেহ শহরে পৌঁছাই। ভ্রমণের ৪৫ দিন আগে টিকেট কাটায় আমরা মাত্র ৭০০০ রুপিতে আগরতলা-দিল্লি আসা যাওয়ার প্লেনের টিকেট পেয়ে যাই।

লাদাখ ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
লাদাখ খুবই দুর্গম এবং মারাত্মক ঠান্ডা এলাকা। শীতকালে এই ঠান্ডার পরিমান অনেক বেড়ে যায়। মে থেকে অক্টোবর এই ছয় মাস লাদাখে বেড়ানোর সব থেকে ভাল সময়। কারণ এসময় ঠান্ডা একটু কম থাকে এবং আবহাওয়া খুব ভালো থাকে। এই সময়ে লাদাখে পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকে। শীতকালে (নভেম্বর – এপ্রিল) লাদাখে মারাত্বক ঠান্ডা পরে এবং বরফ জমে অনেক রাস্তা ঘাট বন্ধ হয়ে যায়। তখণ গেলে ঠান্ডা মোকাবেলা করতে করতে জীবন শেষ হয়ে যাবে, তেমন কিছু দেখা যাবে না। তাছাড়া এসময়ে প্রায় ৯০% হোটেল বন্ধ থাকে। ফলে থাকা ও খাওয়া নিয়ে সমস্যা হবে। তাই শীতকাল লাদাখে বেড়ানোর ভাল সময় নয়।

কাশ্মীর ভ্রমণের উপযুক্ত সময়
কাশ্মীর মূলত একটি অল ওয়েদার ট্যুরিস্ট এরিয়া। আবহাওয়া ও ভৌগোলিক দিক থেকে কাশ্মীরে মৌসুম রয়েছে চারটি। গ্রীষ্ম (জুন, জুলাই, আগস্ট), শরৎ (সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর), শীত (ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি) এবং বসন্ত (মার্চ, এপ্রিল, মে)। একেক মৌসুমে কাশ্মীরের একেক রূপ। আপনে যেকোনো সময়েই কাশ্মীর যেতে পারেন। কাশ্মীরে বেড়ানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময় এপ্রিল-অক্টোবর। তবে কাশ্মীরের পরিপূর্ণ রূপ উপভোগ করতে হলে, আপনাকে কমপক্ষে তিনবার যেতে হবে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, যখন বর্ষার শেষে চারিদিকে থাকবে সবুজের সমারোহ, গাছে গাছে ধরবে আপেল। ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি, যখন বরফে ছেয়ে যাবে সব কিছু। আর এপ্রিল, যখন কাশ্মীরের বিখ্যাত টিউলিপ গার্ডেনে ধরবে ফুল, সাথে থাকবে বরফে ঢাকা পাহাড়ের সারি, রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। আর সব বিবেচনা করে, আপনি যদি একবারের জন্য কাশ্মীর যেতে চান, তাহলে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ হবে আপনার জন্য সেরা সময়।

তবে শীতে কাশ্মীর ভ্রমণ করতে হলে বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হবে। গরম কাপড়, গ্লাভস, বুট অবশ্যই সাথে রাখতে হবে। এসময় তাপমাত্রা অনেক নিচে নেমে যায়। বরফ জমে, তুষারপাতে জনজীবন অচল হয়ে পরে। জরুরি প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে কেউ বের হয় না। রাজধানী এ সময় চলে আসে জম্মুতে। যারা স্থলপথে যেতে চান, নভেম্বর-এপ্রিল এই ছয় মাস এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। কারণ তখন বরফ পরে অনেক রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। তবে আমার মতে শরৎ কালই সব থেকে বেস্ট। বরফে ঢাকা কাশ্মীর থেকে সবুজ কাশ্মীরই বেশি সুন্দর। আর কাশ্মীরে কম আর বেশি সব সময়ই ঠান্ডা, বরফ থাকে।

কাশ্মীর ভ্রমণে কেমন সময় লাগে?
কাশ্মীর এবং লাদাখ অসম্ভব সুন্দর। দুই জায়গায়ই রয়েছে প্রচুর সুন্দর সুন্দর স্থান। যার সবগুলোয় ভ্রমণ করতে মোটামোটি এক মাস লেগে যাবে। যাদের প্রচুর টাকা পয়সা রয়েছে এবং হাতে আছে যথেষ্ট সময় তারাই কেবল এমন অভিযানে নামতে পারে। তবে মোটামোটি ভাবে একসাথে লাদাক এবং কাশ্মীর ভ্রমণ করতে হলে ৮-১০ দিন সময়ের প্রয়োজন। তবে আপনার ট্যুর প্ল্যান হিসাবে ২-১ দিন কম বেশি লাগতে পারে।

কাশ্মীর ভ্রমণের খরচ
কাশ্মীর অনেক বড় আর দুর্গম। তাই এখানে খরচ একটু বেশি। একজন মানুষের মোটামোটি ভাবে কাশ্মীর ঘুরে আসতে ৫০-৬০ হাজার টাকার প্রয়োজন। শপিং করলে আরো বেশি যাবে। তবে আপনে চাইলে এটাকে কমিয়ে নিয়ে আসতে পারেন। কারণ বিভিন্ন দামের হোটেল, খাবার রয়েছে। আপনে কোথায় থাকবেন কি খাবেন তা নিতানন্তই আপনার ব্যপার। সঠিক প্ল্যান থাকলেই কেবল এটা সম্ভব। আমরা ছয়জন আগরতলা থেকে প্লেনে প্রথমে লাদাখ যাই। পরে সেখান থেকে কাশ্মীর ঘুরে আবার আগরতলা হয়ে ঢাকায় ফেরত আসি। আমরা ৯ দিন ছিলাম এবং মোটামোটি ভালো মানের হোটেলে থাকি। আমাদের একেক জনের শপিং ছাড়া ৩৯,০০০ টাকার মতো খরচ হয়।

লাদাখ ভ্রমণের প্রস্তুতি
লাদাখ বা কাশ্মীর ভ্রমণ করতে হলে বেশ টাকাপয়সা আর সময় লাগে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নেয়া ভালো। মোটামোটি ছয় মাস আগে থেকেই প্ল্যান করে ফেলুন। সার্ভিস হোল্ডার হলে যে বছর যাবেন সে বছরকার ছুটি হুদাই শেষ না করে এ সময়ের জন্য বাঁচিয়ে রাখুন। আগে থেকে বলে ছুটির ব্যবস্থা করে ফেলুন। প্রতিমাসে অল্প অল্প করে কিছু টাকা সেইভ করার চেষ্টা করুন। কম পক্ষে ২-৩ মাস আগে প্লেনের টিকেট কেটে ফেলুন। তার পরের মাসে শীতের জন্য জামাকাপড়, জুতা ইত্যাদি দরকারি জিনিসপত্র কিনে ফেলুন। তাহলে একবারে খুব বেশি প্রেসার পড়বেনা। এটা ফলো করলে আপনে মাত্র ২০,০০০ হাজার টাকায় লাদাখ বা কাশ্মীর ঘুরে আসতে পারবেন। অবাক হলেন? দাঁড়ান একটু ক্লিয়ার করি। আমি প্রায় দুই মাস আগে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ১৮,০০০ টাকায় আসা যাওয়ার টিকেট কেটে ফেলি। এই বিল পরিশোধ করে পরের মাসে শীতের জামাকাপড় কিনে ফেলি। ফাইনালি যাবার সময়ে মাত্র ২০,০০০ টাকা সাথে নিয়ে যাই। লাদাখে চলাফেরা করার জন্য শারীরিক ভাবে একটু ফিট থাকা লাগে। তাই যাবার ২-৩ মাস আগে থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম করে নিজেকে শারীরিক ভাবে উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা করুন।

লাদাখ ভ্রমণের সতর্কতা
লাদাখের গড় উচ্চতা সমূদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১৫০০ ফিট। অনেক জায়গার উচ্চতা আরো বেশি। এখানে সবসময়ই মারাত্মক ঠান্ডা থাকে। লাদাখ মূলত একটি মরুভুমি, যেখানে গাছপালা এবং বৃষ্টিপাতের পরিমান অনেক কম। বাতাসে অক্সিজেন লেভেল খুবই কম। অতি উচ্চতা, অতিরিক্ত ঠান্ডা, আর অক্সিজেন কম থাকার কারণে বাংলাদেশিদের মতো লো ল্যান্ডের মানুষদের AMS – একিউট মাউন্টেইন সিকনেস দেখা দিতে পারে। AMS এর লক্ষণ গুলো হলো: মাথা ঘুরানো, দুর্বল লাগা, বমি বমি ভাব, মাথা ব্যাথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। কিন্তু ঘাবরানোর কিছু নাই। যাবার আগে কিছু প্রস্তুতি আর যাবার পর কিছু নিয়ম মেনে চললে AMS থেকে রক্ষা পাওয়ায় যায়। লেহ শহরে পৌঁছে হোটেলে কমপক্ষে ১/২ দিন ফুল রেস্টে থাকতে হবে। ঘন ঘন পানি খেতে হবে। পানি দেহে অক্সিজেনের লেভেল বাড়ায়। লেহ এর সব ফার্মেসিতে অক্সিজেনের মিনি ক্যান পাওয়া যায়। কেউ সমস্যা মনে করলে ২-১ টা কিনে নিবেন। দাম ১২০০ রুপির মতো। এর পরেও কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সাথে সাথে হাসপাতালে যেতে হবে। এছাড়াও একধরণে ট্যাবলেট পাওয়া যায় যা দেহে অক্সিজেন লেভেল বাড়ায়। ডাক্তারের পরামর্শে যাবার ২-১ দিনে আগে থেকে গ্রহণ করতে পারেন।

লাদাখ খুবই উঁচু এবং দুর্গম এলাকা। এখানে বছরে ছয় মাস ঠান্ডার কারণে প্রায় সব কিছু বন্ধ থাকে। যাবার আগে অবশ্যই সঠিক সময় জেনে নিবেন। এখানে চলাফেরা করার জন্য শারীরিক ভাবে বেশ ফিট থাকতে হবে। হাঁপানি, শাসকস্ট থাকলে না যাওয়াই উত্তম। আমি যাবার ২-৩ মাস আগে থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম করে নিজেকে শারীরিক ভাবে উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা করি। আপনারাও চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

লাদাখ একটি সীমান্তবর্তী এলাকা। তাই এখানে নিরাপত্তা একটু বেশি। একটু পর পর আর্মি ক্যাম্প আর সবসময় রাস্তায় আর্মিদের ট্রাক চলাচল করতে দেখা যায়। তাই সবসময় পাসপোর্ট, যে হোটেলে ওঠেছেন তার ফোন নাম্বার, ঠিকানা সাথে রাখবেন। লাদাখে সরকারি BSNL এর লাইন ছাড়া অন্য মোবাইল অপারেটরদের লাইন কাজ করেনা। দেশে যোগাযোগ করার একমাত্র মাধ্যম ইন্টারনেট। যদিও তার স্পিড খুবই কম। তাই হোটেলে উঠার আগে অবশ্যই ওয়াইফাই আছেকিনা জেনে নিবেন।

হোটেলে রুম ভাড়া নেবার আগে অবশ্যই দেখে নিবেন এবং দরদাম করে নিবেন। সম্ভব হলে লেহ তে পুরাতন টাউন এর দিকে থাকার চেষ্টা করবেন। তাহলে শাসকষ্ট একটু কম হবে। এখানে কোনো হোটেলেই A/C কিংবা ফ্যান নাই। আর দরকার ও নাই। তবে গরম পানির ব্যাবস্থা আছে কিনা দেখে নিবেন। না হলে শেষ। ট্যাক্সি ভাড়া করার আগে দামাদামি করে নিবেন।

ট্যুর প্ল্যান
লাদাখ-কাশ্মীরে আপনে কোন রুটে যাবেন, কোন রুটে ফেরত আসবেন, কবে কোথায় ঘুরবেন, কখন কোথায় থাকবেন ইত্যাদি সব কিছুর একটা খসড়া ঢাকা থেকেই করে নিবেন। আপনে দিল্লী থেকে প্রথমে কাশ্মীর ঘুরে সড়ক পথে লাদাখ চলে আসতে পারেন। পরে লাদাখ ঘুরে দিল্লী। আবার চাইলে দিল্লী থেকে প্রথমে লাদাখ হয়ে সড়ক পথে কাশ্মীর যেতে পাবেন। আমরা দিল্লী থেকে প্রথমে লাদাখ, সেখান থেকে কাশ্মীর যাই। সংক্ষেপে আমাদের ট্যুর প্ল্যান:

প্রথম দিন:
ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালের ট্রেনে আখাউড়া। সময় নিবে ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট। সেখান থেকে আখাউড়া ল্যান্ড বর্ডার হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা। ২-৩ ঘন্টা আগরতলা শহরে ঘুরাঘুরি করে বিকালের ফ্লাইটে দিল্লি। দিল্লি এয়ারপোর্টে রাত্রি যাপন।

দ্বিতীয় দিন:
দিল্লি থেকে সকাল ৭ টার ফ্লাইটে লাদাখের লেহ শহর। সময় নিবে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। পুরা দিন হোটেলে বিশ্রাম।

তৃতীয় দিন:
লেহ শহরের পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ

চতুর্থ দিন :
সকালে লেহ থেকে সড়ক পথে কাশ্মীরের উদ্দেশে যাত্রা করে কার্গিল শহরে রাত্রি যাপন। পথে বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ। এটাই ট্যুরের সব থেকে রোমাঞ্চকর ইভেন্ট।

পঞ্চম দিন:
সকালে কার্গিল থেকে কাশ্মীরের সোনমার্গ। পথে ভয়ঙ্কর জোজিলা পাস্ অতিক্রম। থাজিওয়াস গ্লেসিয়ার এর সৌন্দর্য উপভোগ। বিকালে পেহেলগাম এর উদ্দ্যেশে যাত্রা এবং লিডার নদীর পারে কোনো এক কর্টেজে রাত্রি যাপন।

ষষ্ঠ দিন:
সারাদিন পেহেলগামের বিভিন্ন সৌন্দর্য উপভোগ। বিকালে রাজধানী শ্রীনগর এর উদ্দেশে যাত্রা। পথে আপেল গার্ডেন, ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি পরিদর্শন। রাতে বিখ্যাত ডাল লেকের পারে ভাসমান হোটেলে রাত্রি যাপন।

সপ্তম দিন:
ডাল লেকে শিকারা ভ্রমণ, শ্রীনগর শহরে ঘুরাঘুরি। শ্রীনগর থেকে বিভিন্ন কাশ্মীরি ড্রাইফুড, মসলা, জাফরান, কাশ্মীরি শাল, ড্রেস ইত্যাদি কেনাকাটা এবং হোটেলে রাত্রি যাপন।

অষ্টম দিন:
সকাল ৭ টার ফ্লাইটে দিল্লি। সময় নিবে ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি কোনো হোটেলে চেকইন করে মালামাল রেখে সারাদিন দিল্লির বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন। রাতে শপিং, ঘুরাঘুরি, আড্ডা। হোটেলে রাত্রি যাপন।

নবম দিন:
দিল্লি থেকে সকাল ৭ টার ফ্লাইটে আগরতলার উদ্দেশ্যে যাত্রা। বর্ডার পার হয়ে সন্ধ্যার ট্রেনে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা।

Kamalapur railway station
কমলাপুর রেলস্টেশন, সেপ্টেম্বর ১৫: সকাল ০৭:৩০

এবার মূল ভ্রমণে আসি
আমরা ১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকাল ৭:৪৫ এর ট্রেনে আখাউড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। ১০:৩০ এর দিকে আমরা আখাউড়া স্টেশনে পৌঁছাই। সেখান থেকে দুটি অটো ভাড়া করে আখাউড়া ল্যান্ড বর্ডার চলে আসি। ভাড়া নিল একেক অটো ১৫০ টাকা। বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন অফিসে এসে মাথা পুরাই নষ্ট। জরাজীর্ণ অফিস কক্ষ, মনে হল যে কোনো সময়ে ধসে পরবে। ফ্যান গুলাও কাজ করছে না। পক্ষান্তরে ভারতের ইমিগ্রেশন অফিস বেশ চকচকা, পরিষ্কার, সুন্দর। আমাদের এক টিম মেম্বারের পাসপোর্টের মেয়াদ কম থাকায় এবং ভারতের ইমিগ্রেশন অফিসে ইন্টারনেট লাইন ডাউন থাকায় দুই দেশের ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস এর কাজ শেষ করতে দুপর দেড়টা বেজে যায়। তবে দুই দেশের ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস এর লোকেরাই বেশ আন্তরিক।

Akhaura Land Port
আখাউড়া ল্যান্ড বর্ডার, সেপ্টেম্বর ১৫: দুপুর ১২:০০

ভারত-বাংলাদেশ, সেপ্টেম্বর ১৫: দুপুর ১২:০৯

আগরতলা শহর
আমাদের এক মেম্বার ফাহিম, যার বাড়ি আখাউড়ায়। তার এক চাচা থাকে আগরতলা। উনি আমাদের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে রাখে। ভারতের ইমিগ্রেশন অফিস থেকে বের হয়ে সেই গাড়িতেই আমরা চলে আসি আগরতলা শহরে। সময় নিল ১০-১৫ মিনিটের মতো। সেখানে এক রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। খাবার থেকে এর পরিবেশনটাই বেশি ইন্টারেষ্টিং ছিল। আগরতলা শহরের লোকজন দেখতে আমাদের মতোই এবং বাংলায় কথা বলে। খাবার শেষে আমরা শহরে ঘুরাঘুরি করি। শহরটি বেশি বড় না। তবে প্রচুর গাছ পালা আর ছোট ছোট পাহাড়ের মতো টিলা রয়েছে। টিলার উপর বিভিন্ন সরকারি অফিস আর কর্মকর্তাদের বাস ভবন গুলো বেশ সুন্দর। রাস্তা গুলাও বেশ উঁচুনিচু, গাড়ি দিয়ে ঘুরতে বেশ ভালোই লাগলো।

agortola city
আগরতলা শহর, সেপ্টেম্বর ১৫: দুপুর ০৩

আগরতলা থেকে দিল্লি
আমাদের ফ্লাইট বিকাল ৫:৪০ এ। তাই চলে আসি এয়ারপোর্টে। ল্যান্ড বর্ডার থেকে এখানে প্রাইভেট কার ভাড়া নেয় ১০০০ রুপি, সময় লাগে ২৫-৩০ মিনিট। এয়ারপোর্ট খুব বেশি বড় না হলেও এর নাম কিন্তু বেশ বড় “মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য বাহাদুর বিমানবন্দর”। আগরতলা থেকে দিল্লির কোনো সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় আমাদের কলকাতা হয়ে দিল্লি যেতে হবে। সময়মতোই প্লেন ছেড়ে দিল। আমাদের মেম্বারদের অনেকেরই এটা প্রথম প্লেনে উঠা। তাই তারা খুব এক্সসাইটেড ছিল। আমরা কাউন্টারে বলে ৬ সিট একই সারিতে নিয়ে নেই। আমাদের এয়ারলাইন্স ছিল ইন্ডিগো। ভারতে এরাই সব থেকে সস্তায় মানুষ পরিবহন করে। আর এদের সেবার মান ও বেশ ভালো। ৩/৩ সিটের এয়ারবাসগুলো বেশ সুন্দর আর বড়। তবে এরা প্লেনে একমাত্র পানি ছাড়া ফ্রিতে আর কোনো খাবার দেয়না, তাও গ্লাসে করে দেয়। যেখানে আমাদের দেশের সব এয়ারলাইন্সই ফ্রীতে খাবার পরিবেশন করে। ব্যাপারটা একটু অন্যরকম লাগলো। তবে আপনি চাইলে পয়সা দিয়ে কিনে খেতে পারবেন।

agortola airport
ফ্লাইট ছাড়ার পূর্বে আগরতলা এয়ারপোর্ট, সেপ্টেম্বর ১৫: বিকাল ০৫:১৫

প্রায় ৪০ মিনিট পর আমাদের ফ্লাইট কলকাতা এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করে। এখানে ৩ ঘন্টা ট্রানসিট তাই এয়ারপোর্টের ভিতরেই থাকি। আমি কেএফসি থেকে রাতের খাবার খেয়ে নেই। দাম পড়লো ২৩০ রুপির মতো। আপনে চাইলে আরো কমে খেতে পারেন। রাত ১০:৩০ এর ফ্লাইটে আমরা আবার দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। প্রায় ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট পর আমরা দিল্লি চলে আসি।

দিল্লি থেকে আমাদের ফ্লাইট সকাল ৭ টায় লাদাখের লেহ শহরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। তাই হাতে প্রায় ৫ ঘন্টার মতো সময় আছে। রাত ১:৩০ এর দিকে আমরা এয়ারপোর্টের বাহিরে চলে আসি। উদেশ্যে একটু ঘুরাঘুরি আর নাস্তা করা। কিন্তু অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় দুরে কোথাও গেলাম না। এয়ারপোর্টের পাশেই এক স্ট্রিট ফুডের দোকানে ডিম-ব্রেড খেলাম। এই মাঝ রাতে একটি দেশের রাজধানীতে ফুটপাতে বসে ব্রেড খেতে সেই লাগল। পাশের এক মুদি দোকান থেকে আমরা কিছু চকলেট, চিপস কিনে নিলাম লাদাখে ভ্রমনের সময় খাওয়ার জন্য। কেননা লাদাখে সব সময় এগুলা পাওয়া যাবেনা, আর দামও একটু বেশি। যেহেতু সেখানে লম্বা লম্বা জার্নি করব তাই সাথে কিছু খাবার থাকা উচিৎ।

দিল্লিতে রাতে বেশ ঠান্ডা পরে। তাই তাড়াতাড়ি এপারপোর্টে ঢুকে গরম কাপড় পরে নিলাম। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্ট অনেক বড়। কত বড় তার একটা উদাহরণ দেই। আমরা টার্মিনাল ১ তে প্রবেশ করি। টিকেট দেখে গার্ড বললো, আপনাদের ফ্লাইট টার্মিনাল ৩ থেকে ছাড়বে। লিফ্ট দিয়ে নিচে নেমে যান, ঐখানে দেখবেন বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে, একটু পর পর বাস আসবে, উঠে টার্মিনাল ৩ তে চলে যান। ভাবলাম কাছেই হবে, আবার বাস কেন হেঁটেই তো যেতে পারতাম। যাই হোক নেমে দাঁড়িয়ে থাকি, একটু পর বাস আসল। সুন্দর A/C করা বেশ ভালো মানের বাস। বাসের লোক বললো ২৫ রুপি ভাড়া দেন। একটু অবাক হলাম এতো ভাড়া কেন। কলকাতায় তো ২৫ রুপি দিয়েই ২৫ কিলোমিটার যাওয়া যায়। বাস যেতেই থাকল। প্রায় ২০-২৫ মিনিট পর আমরা টার্মিনাল ৩ তে আসলাম। এতক্ষন আমরা এপারপোর্ট এরিয়াতেই ছিলাম।

টিকেট দেখিয়ে সিকিউরিটি চেকিং কমপ্লিট করে ভিতরে ঢুকে অপেক্ষা করতে থাকি। এয়ারপোর্ট বিশাল বড় আর একদম পরিষ্কার, মনে হয় ৫ ষ্টার মানের হোটেল। কিভাবে এরা ম্যানেজ করে ভেবে একটু অবাক হলাম। আর আমাদের দেশে 🙁 আমরা শুয়ে, বসে, ঘুমিয়ে বাকিটা সময় পার করে দেই। ও ভালো কথা এখানে কিন্তু ঘুমানোর জন্য আলাদা বড় চেয়ার আছে, যেখানে শুয়ে ঘুমানো যায়।

leh airport leh city
আকাশ থেকে লেহ, সেপ্টেম্বর ১৬: সকাল ০৮:১০

দিল্লি থেকে লেহ
নির্ধারিত সময়ে আমাদের ফ্লাইট লেহ শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। এবারকার এয়ারলাইন্স ভিস্তারা। ভিস্তারা খুবই সুন্দর, ৩/৩ সিট। এরা ফ্রি খাবার পরিবেশ করল। প্রায় ২০,০০০ ফিট উপরে বসে খেতে দারুন লাগলো। একটু পরেই সাদা সাদা বিশাল পাহাড় প্লেনের জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম। প্রায় ১ ঘন্টা ৩০ মিনিট পরে আমরা লেহ তে চলে আসি। পাইলট ঐখানকার বর্তমান তাপমাত্রা আর ওয়েদার কেমন জানিয়ে দিল। AMS এর ব্যাপারেও ধারণা দিয়ে দিল। সাথে তিনি এও জানালো যে পার্কিং না পাওয়ায় আমাদের ফ্লাইট নামতে দেরি হবে।

লেহ শহর কে নিচে রেখে বিশাল বিশাল পাহাড়ের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে আমাদের ফ্লাইট চক্কর দিতে থাকে। সিনেমায় নায়ক যেভাবে অন্য গাড়িগুলাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়, আমাদের পাইলট ও সেভাবে পাহাড় গুলাকে পাশ কাটিয়ে ফ্লাইট কে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। পাহাড়গুলো এতো কাছে ছিল যে মনে হচ্ছে এই বুঝি লেগে গেল। কিছু পাহাড় বরফে ঢাকা, কিছু আবার ঝুরঝুরে পাথরের। অনেক দূরের রাস্তা, পাহাড়ি নদী সব সরু লাইনের মতো মনে হতে লাগলো। একপর্যায়ে মাথা ঘুরতে লাগলো, তাই বাহিরে তাকানো বন্ধ করে দেই। দেহের অক্সিজেন লেভেল ঠিক রাখার জন্য আমরা একটু পর পর পানি পান করতে থাকি। এভাবে প্রায় ২০ মিনিট চক্কর কাটার পর আমাদের ফ্লাইট ল্যান্ড করে।

ফ্লাইট থেকে নামার পরেই বুঝতে পারি এখানে অক্সিজেন কম, হালকা একটু খারাপ লাগতে লাগলো। তবে কারোরই তেমন কোনো সমস্যা হয় নাই। দ্রুত ব্যাগ নিয়ে, এয়ারপোর্টের বাহিরে চলে আসি। এসেই দেখি আমাদের জন্য গাড়ি নিয়ে একজন অপেক্ষা করছে। আমরা ঢাকা থেকেই তাকে ঠিক করে আসি। এয়ারপোর্ট থেকে লেহ শহরে যেকোনো হোটেলে পিকাপ/ড্রপ ৫০০ রুপি। ১৫-২০ মিনিটের মাঝেই আমরা হোটেলে চলে আসি। এসে নাস্তা করে রুমে যেয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘুম দিয়ে দেই। আজ খুব ক্লান্ত তাই বাকি টুরের গল্প অন্য পর্বে বলব।

কাশ্মীর ভীষণ সুন্দর এলাকা। তাই যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা বা পানির বোতল ফেলে একে ময়লা করার কোনো মানে নাই। কাশ্মীরের লোকজন খুব ধর্মভীরু। তাই তাদের ধর্ম বা রাজনীতি নিয়ে কোনো সমালোচনা করবেন না। আপনে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন তা তাদের সাথে শেয়ার করবেন। বাংলাদেশীদের এরা খুব সম্মান করে এবং ভালো জানে। চেষ্টা করবেন তা ধরে রাখতে। ক্রিকেট এদের জানপ্রাণ। সাকিব, মাশরাফি তাদের প্রিয় খেলোয়াড়।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!