পারো (Paro, Bhutan) ভুটানের একটি শহর যা পারো উপত্যকায় অবস্থিত। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৭২০০ ফিট। পারো একটি ঐতিহাসিক শহর। এখানে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন পবিত্র স্থান এবং ঐতিহাসিক স্থাপনা। তবে পারোর সব থেকে বড় আকর্ষণ টাইগার নেস্ট। এই শহরেই ভূটানের একমাত্র বিমানবন্দর পারো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অবস্থিত।

নভেম্বর ২৫, ২০১৭ পারো, ভুটানে আজ আমাদের চতুর্থ দিন। আজ সকালেই আমরা থিম্পু থেকে পারো তে এসেছি। থিম্পু থেকে আমরা সরাসরি চলে যাই চেলে লা পাস। চেলে লা পাস এ ঘুরাঘুরি শেষ করে আমরা এখন পারো শহরের পথে। চেলে লা পাস যাবার সময় আমরা শুধু উপরের দিকে উঠেছি। এখন আমরা সেই একই পাহাড়ি রাস্তা ধরে আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামছি। একটু পর পর চোখে পড়ছে শিয়াল, হরিণ সহ বিভিন্ন জীবজন্তুর হটাৎ হটাৎ রাস্তা পারাপারের দৃশ্য। ঢাকায় গাড়ি দিয়ে যাবার সময় আচমকা মানুষ বা যানবাহন চলে আসার দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত হলেও জীবজন্তু এই প্রথম দেখলাম। আমরা চমৎকার এক বন্য পরিবেশের ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি । সত্যিই এ অপূর্ব অনুভূতি।

পারো বিমানবন্দর
পারো বিমানবন্দর (Paro Airport) ভুটানের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ভুটানে আরো চারটি বিমানবন্দর থাকলেও এটাই একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এটি পারো শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরত্বে পারো নদী বা পারো চো এর তীরে অবস্থিত। এর আশেপাশের পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ১৮০০০ ফুট। এটিকে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ বাণিজ্যিক বিমানবন্দর মনে করা হয়। এর রানওয়ের দৈঘ্য মাত্র ১৯৮০ মিটার। উঁচু উঁচু পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে এসে কিছুটা বাঁকা হয়ে প্লেন গুলোকে এখানে নামতে হয়। তাই অল্প সংখ্যক বৈমানিক এখানে উড়োজাহাজ চালানোর অনুমতি পান। এটিকে ১৯৮৩ সালে একটি সামরিক হেলিপ্যাড থেকে বিমানবন্দরে পরিণত করা হয়েছে। এখানে দিনের আলো ছাড়া অন্যসময় যে কোনো ধরনের উড্ডয়ন অবতরণ নিষিদ্ধ। ভুটানে এমনিতেই সমতল জায়গা খুব একটা নাই। এটাই নাকি সব থেকে ভাল সমতল জায়গা। তাই এখানেই তাদের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। দুর্গম হলেও এটাই ভুটানের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যম। এতকিছুর পরও এটি অ্যাডভেঞ্জার প্রিয়দের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

paro airport bhutan
পারো এয়ারপোর্ট: নভেম্বর ২৫, দুপুর ২:২৩

চেলে লা থেকে আমরা সরাসরি চলে আসি পারো এয়ারপোর্ট এর কাছে। আমরা একটি উঁচু জায়গায় দাড়াই। আমাদের নিচেই এয়ারপোর্ট আর তার পাশে পারো নদী। সেখান থেকে পারো এয়ারপোর্ট দেখতে খবুই সুন্দর। আমরা একটা প্লেন কে দেখলাম সাই করে নেমে, দ্রুতই থেমে যেতে। আমরা কিছুক্ষন সেখানে সময় পার করে সরাসরি চলে যাই আমাদের হোটেলে। পেরোতে আমরা ড্রাগন হোটেলে উঠি। হোটেলে চেক ইন করে ফ্রেস হয়ে নেই।

টাইগার নেস্ট
টাইগার নেস্ট (Tiger’s Nest বা Taktsang) পারো শহরের মূল আকর্ষণ। এটি আসলে প্রায় ৪০০ বছরের পুরানো এক মনেস্ট্রি, যা পারো থেকে প্রায় ৯০০ মিটার উচ্চতায় এক পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত। গুগলে ভুটান লিখে ইমেজ সার্চ দিলে এই যায়গার একটা না একটা ছবি অবশ্যই আসবে। স্ট্যাচু অব লিবার্টি যেমন আমেরিকার, আইফেল টাওয়ার যেমন ফ্রান্সের প্রতীকের মতো কাজ করে, ভুটানের ক্ষেত্রে টাইগার’স নেস্টকে অনেকটা তেমনই বলা যায়। স্থানীয়রা একে বলে ‘তাক্তসাং’। তিব্বতি ভাষায় তাক্তসাং মানে বাঘের গুহা। নামের আগে টাইগার থাকলেও সেখানে কিন্তু মোটেও টাইগার দেখা যাবেনা। জায়গাটির নাম কেন টাইগার নেস্ট হলো তা নিয়ে অবশ্য নানান গল্প প্রচলিত আছে। একসময় নাকি এই গুহায় টাইগার থাকত। টাইগার পাহাড়ের এই জায়গায় এসে বসত, দূর থেকে তা দেখা যেত। তাদের এক ধর্মীয় গুরু পদ্মসম্ভব এখানে এসে নাকি ধ্যান করত। তিনিই টাইগারদের তাড়িয়ে তাক্তসাং গুহার ১৬৯২ সালে এখানে এক মন্দির নির্মাণ করেন। পরে একসময় নাকি সব কিছু আগুনে পুড়ে যায়। লোকজন আবার সেখানে মন্দির নির্মাণ করে।

tigers nest
কালো পাহাড়ে বড় স্থাপনাটিই টাইগার নেস্ট: নভেম্বর ২৫, দুপুর ৩:৩০

পদ্মসম্ভব কে বলা হয় ভুটানের ধর্মীয় গুরু। উনিই প্রথম ভুটানে বুদ্ধধর্ম প্রচার শুরু করেন। তার স্মরণে মার্চ এপ্রিলের দিকে পারো তে ‘সেচু’ নামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনেকে বলে পদ্মসম্ভব তিব্বত থেকে বাঘের পিঠে করে এখানে আসেন। কেউ কেউ বলে, ‘ইয়েশে সগিয়াল’ নামে এক রাজার বৌ ছিল যে ছিল পদ্মসম্ভব এর একজন অনুসারী। সে নিজে বাঘিনীতে কনভার্ট হয়ে পদ্মসম্ভব কে তিব্বত থেকে এখানে নিয়ে আসে। এটা নিয়ে আরও নানা কাহিনী প্রচলিত আছে। তবে সব কাহিনীতেই বাঘের বিষয়টা মোটামোটি কমন। তাই স্বাভাবিক ভাবেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় টাইগার্স নেস্ট।

টাইগার্স নেস্ট দেখতে চাইলে প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা ট্রেকিং করতে হবে। তাই সকাল সকাল রওনা দেয়াই ভাল। আমরাও তাড়াতাড়ি চলে গেলাম টাইগার নেস্ট এর জন্য যেখান থেকে ট্রেকিং শুরু করতে হয় সেখানে। সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে থেকে শুরু হলো পাইনের বন। অপূর্ব সুন্দর এই পাইনের বন। সেখানে দেখি আরো কিছু লোক। সবাই হাতে লাঠিসোটা নিয়ে ট্রেকিংয়ের জন্য তৈরি। আমরাও লাঠি নিয়ে তৈরি হলাম ট্রেকিংয়ের জন্য। কিন্তু সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় আমাদের আর উপরে উঠা হলোনা। কেননা টাইগার নেস্টে যেয়ে আবার সূর্যের আলো শেষ হবার আগেই ফেরত আসতে হয়।

tigers nest
পাইন গাছের ফাঁকে টাইগার নেস্ট: নভেম্বর ২৫, দুপুর ৩:৪৪

টাইগার্স নেস্ট উঠার জন্য সাথে লাঠি, পানীয় নিয়ে নিলে ভাল হয়। লাঠি ঐখানেই ভাড়ায় পাওয়া যায়। পাহাড়ে উঠার জন্য নরম জুতা পরে নিবেন, পারলে সাথে কাঁধের ব্যাগ নিয়ে নিবেন। ব্যাগে পানি, হালকা ড্রেস নিয়ে নিবেন। গরম লাগলে যাতে ড্রেস চেঞ্জ করতে পারেন। তবে ব্যাগের ওজন যাতে বেশি না হয়। এছারা যারা একটু অলস, দুর্বল প্রকৃতির তারা ঘোড়ায় চড়েও উঠতে পারেন। নিচেই ঘোড়া ভাড়া পাওয়া যায়। দরদাম করে ঠিক করে নিবেন। গোড়ার সাথে লোক থাকে। তিনি দড়ি ধরে পাশে পাশে যাবে, আপনে শুধু শক্ত করে ধরে বসে থাকবেন। মূল গুহার কাছাকাছি যেয়ে ঘোড়া আর যেতে পারেনা। তখন বাকি পথটুকু আপনাকে ট্রেকিং করেই উঠতে হবে। তবে ঘোড়ায় না চড়ে ট্রেকিং করে উঠলেই বেশি মজা। পুরা রাস্তা একেবারে খাড়া না। বিভিন্ন গাছপালার ভিতর দিয়ে ট্রেকিং করতে ভালোই লাগে। ৩ ঘন্টা সময়ের পুরাটাই কিন্তু ট্রেকিং করা লাগেনা। কিছুক্ষন ট্রেকিং, তার পর একটু রেস্ট, আবার ট্রেকিং এভাবে ৩:৩০। সময় একটু কম বেশি হতে পারে। টাইগার্স নেস্টে উঠার জন্য কোনো ফী লাগেনা। তবে উপুরের মন্দিরে ঠুকার জন্য ৫০০ রুপী দিয়ে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা টিকেট কাটা লাগে।

ভুটান এসে টাইগার্স নেস্টে না উঠলে ভুটান ট্যুর অসমাপ্ত থেকে যায়। তাই সাহস করে উঠে পড়েন। আমি অনেক বয়ষ্ক পুরুষ এবং মহিলা কে দেখেছি যারা টাইগার্স নেস্ট উঠেছে। নামার পর তাদের অভিজ্ঞতা জিজ্ঞেস করেছিলাম। এক বাক্কে সবাই বলে দারুন। এই টাইগার্স নেস্টে উঠার জন্যই আরেকবার ভুটান যাবার ইচ্ছা আছে।

হাতে সময় না থাকায় আমরা অল্প একটু জায়গা উঠে আবার নেমে আসি। টাইগার্স নেস্টে উঠার জায়গাটাও অনেক সুন্দর। আমরা সেখানে কিছুণ সময় কাটাই, ছবি তুলি, আর যারা নেস্টে উঠে নেমে আসছিল তাদের সাথে কথা বলি। এখানে লোকাল হ্যান্ডিক্রাফট এর এক মার্কেট রয়েছে। সেখান থেকে আমরা কিছু জিনিষপত্র কিনি। এখানকার জিনিষগুলো তুলনামূলক ভাবে একটু সস্তা। তাই এখান থেকে কেনাকাটা করাই ভাল।

হ্যান্ডিক্রাফট এর মার্কেটে আমি, পিছনের কাঠের গেট দিয়েই টাইগার্স নেস্টে উঠা লাগে: নভেম্বর ২৫, বিকাল ৪:৩২

ন্যাশনাল মিউজিয়াম
এর পর আমরা রওনা দিলাম পেরোতে অবস্থিত ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ভুটানের (National Museum of Bhutan) উদ্দেশে। পাহাড়ি পথে আমাদের গাড়ি চলতে থাকল। পাহাড় থেকে গাড়ি কখনো নিচে নামছে আবার ঘুরতে ঘুরতে ওপরে উঠে যাচ্ছে। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ওয়াংচু নদী। ওয়াংচু নদীকে সমান্তরালে রেখে বেশ কিছুক্ষণ আমরা এগিয়ে চললাম। এর পরে ব্রীজ দিয়ে নদী অতিক্রম করে আবার ওপরে উঠে গেলাম। ব্রীজের নিচেই ওয়াংচু নদী পারো নদীর সাথে এসে মিশেছে। মিনিট পনেরোর মধ্যে আমরা চলে আসলাম পারোর ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ভুটানের সামনে। মিউজিয়ামটি পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। দেখে মনে হলো আমরা কোনো জমিদার বাড়ির সামনে চলে এসেছি। মিউজিয়ামটি ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে ভুটানের সব সংস্কৃতিক ঐতিহ্য দেখা যাবে। এটি সকাল ৯ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। মিউজিয়ামে ঢুকতে ভুটানিজদের জন্য ১০ রুপী, সার্কভুক্ত দেশের জন্য ২৫ রুপী, অন্যদের জন্য ১৫০ রুপীর টিকেট কাটা লাগে। এর আসে পাশের সৌন্দর্য অনেক সুন্দর।

National Museum of Bhutan
ন্যাশনাল মিউজিয়াম: নভেম্বর ২৫, বিকাল ৫:২৩

সন্ধ্যার পর আমরা আমাদের হোটেলে চলে আসি। হোটেলে এসে সবার মাথা নষ্ট। আশে পাশের সব ভবনে বিদ্যুৎ আছে, কেবল আমাদের ভবনেই নাই। হোটেল ম্যানেজার বললো মেইন লাইনে প্রব্লেম, সামনের আরো কিছু ভবনেও বিদ্যুৎ নাই। কতৃপক্ষ নাকি কাজ করছে, কিছুক্ষনের ভিতরেই বিদ্যুৎ চলে আসবে। আমরা মোবাইলের আলোতে রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে নেই। কিছুক্ষন আর শেষ হয়না। রিয়াজ ভাই তো পারলে ম্যানেজারকে ২-১ টা বসায় দেয়। কি আর করা অন্ধকারের মাঝে আর ভালো লাগছেনা। তাই হোটেলের নিচ তলায় চলে আসি আর মোমবাতির আলোয় রাতের খাবার খেয়ে নেই। অনেকটা কেন্ডেলাইট ডিনারের মতো। আমরা ইন্ডিয়ানা খাবার খাই, দারুন টেস্টি। এর পর আমরা রাতের পারো শহর দেখার জন্য বের হয়ে যাই। রাতের পারো শহর অনেক সুন্দর। তবে মারাত্মক ঠান্ডা আর বাতাস। থিম্পু থেকে আজ তাপমাত্রা কম, মাইনাস ৩ থেকে ৪ ডিগ্রী হবে। ঠান্ডায় রীতিমতো সবাই কাঁপতেছিলাম। কিছুক্ষন ঘুরাঘুরি করে রুমে চলে আসি। এসে দেখি তখনো বিদ্যুৎ নাই। ওয়াইফাই না থাকায় সেদিন দেশে কারোর সাথে কেউ আর যোগাযোগ করতে পারিনাই। এতে কি ধরণের ঝামেলায় পড়েছিলাম তা পরের পর্বে বলবো। সবাই খবু ক্ষান্ত তাই ঘুমিয়ে পড়ি।

ভুটান ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন।। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!! dayouting

Published by রাশেদুল আলম

আমি পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। টেকনোলজি নিয়ে কাজ এবং লেখালেখি করলেও ঘুরে বেড়াতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। তাই যখনই সময় পাই বেড়িয়ে পরি। সবুজ প্রকৃতি আমায় সব সময়ই কাছে টানে। আমি অনেককেই দেখেছি কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই ঘুরতে বেড়িয়ে পরে। আর নানা ধরণের ঝামেলায় পরে। অথচ ইন্টারনেট ঘেটে একটু ধারণা নিয়ে আসলেই তাদের ট্যুর টা অনেক ভাল হতে পারতো। তাই নিজের অভিজ্ঞতা গুলোকে এখানে শেয়ার করার চেষ্টা করি, যাতে অন্যরা উপকৃত হতে পারে।

Join the Conversation

2 Comments

  1. টাইগার নেস্ট কেন গেলেন না?? ওইখানে কি টাইগার আছে??

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *