বাংলাদেশ

আমাদের একটি সাজেক আছে

Shadow
Slider

পাহাড়ের রাণী কিংবা মেঘের স্বর্গ যাই বলি না কেন, সাজেক দেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১৮০০ ফুট উপরে পাহাড় আর মেঘেদের খেলা আপনাকে মুগ্ধ করবেই। ভোরে যখন সূর্যদয় দেখার জন্য রিসোর্টের বারান্দায় বা খোলা পাহাড়ের চূড়ায় যাবেন অথবা সূর্য দেখা না গেলে মেঘের যে ভেলা দেখবেন তা আপনার মনের কুঠিরে সারাজীবন অক্ষয় হয়ে থাকবে। তখন এক প্রশান্তির নিঃশ্বাস ছুয়ে যাবে হৃদয়লোকে, এ যেন মেঘের সমুদ্র। পাহাড়ের সবুজ, সাদা মেঘ আর স্বপ্নের রঙ নীল মিশে একাকার। তেমনি বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু করছি আমার সাজেক ভ্রমণ কাহিনী ।

কক্সবাজার থেকে সাজেক

২৩/০৯/২০ কক্সবাজার থেকে সকাল ১১ টায় রওনা দিয়ে চট্টগ্রাম হয়ে খাগড়াছড়ি পৌঁছায় সন্ধ্যা ৭ টায়। গাড়ি থেকে নেমে শাপলা চত্তরের কাছাকাছি একটি বাজেট হোটেলে রুম নিয়ে নিলাম। রুমে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে কাল সকালের সাজেক যাওয়ার চাঁদের গাড়ি এবং গ্রূপ খুজতে শুরু করলাম। জানা গেল ভোর ৬ টায় শাপলা চত্ত্বর থেকেই সব গাড়ি ছাড়বে এবং গ্রুপ ও সহজে পাওয়া যাবে। তাই নিশ্চিত মনে রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে আমরা ৩ জন আড্ডা দিতে দিতে ঘুমিয়ে পরলাম।

২৪/০৯/২০ ভোর ৬ টায় ঘুম থেকে ওঠেই ফ্রেশ হয়ে শাপলা চত্ত্বর চলে গেলাম এবং ১০ জনের একটি গ্রুপ পেয়ে গেলাম, এখন আমরা ১৩ জন সদস্য। সকালের নাস্তা সেরে গাড়িতে চেপে বসলাম। সকাল ৭.৩০ টায় গাড়ি চলতে শুরু করলো। ৯ টায় পৌঁছালাম যেখান থেকে আর্মি এসকট শুরু হবে সেখানে। সব গাড়ি লাইন দিয়ে জড়ো হতে লাগলো এবং ১০.২০ মিনিটে সব গাড়ি সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা হলো পাহাড়ি আঁকা – বাকাঁ, উঁচু – ঢালু পথ পেরিয়ে।

দুপুর ১২.২৫ মিনিটে সাজেকে প্রবেশ করলাম। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে এবং মেঘ সারা সাজেক ঢেকে ফেলেছে। গাড়ি থেকে নেমে বাজেট হোটেল খুঁজতে লাগলাম এবং ২০ মিনিটের মধ্যে খুব সস্তায় রুম পেয়ে গেলাম আমাদের জন্য। রুমের বারান্দা থেকে ঐ দূরের পাহাড় আর মেঘের খেলা মুগ্ধ করছে আমায়। খাবারের অর্ডার দিয়ে রুমে বিশ্রাম নিলাম।

কংলাক পাহাড়ের চূড়ায়

দুপুর ১.৩০ টায় রুম থেকে বের হয়ে খাবার খেয়ে রওনা দিলাম কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় উঠার জন্য। কি এক মনোরম দৃশ্য, চারিপাশ মেঘে ঢাকা, বাতাসের ছন্দে মেঘ যেন খেলা করছে। আমার মতে সাজেকের সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্য বা অনুভূতি হচ্ছে সাজেকের রাস্তায় হাটা, আর দুপাশের নৈস্বর্গিক সবুজ পাহাড় দেখা।

যারা দার্জিলিং গিয়েছেন তারা বুঝবেন এই সাজেকের আবেদন কতটুকু। তাই তো আমি বলি “আমাদের একটি সাজেক আছে”। ৪৫ মিনিট হাটার পর কংলাকের চূড়ায় উঠে আমি তো হতবাক, মেঘ এত বেশি ঘন ছিল যে, আমার ৫ ফিট পাশের লোককেও ঠিকভাবে বুঝতে পারছি না। আর মৃদু বাতাস হালকা শীতলতার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে আমায়। কিছুক্ষণ পরে সূর্যমামার দেখা পেয়ে মেঘ সরে গেছে।

এবারের দৃশ্য টা আরো অসাধারণ ও নৈসর্গিক। ঐ দূর পাহাড়ের ঢালে সাদা শুভ্র মেঘ ও সবুজের মিলন অক অন্য আবেদন তৈরি করেছে। প্রাণভরে উপভোগ করলাম এই মুহুর্ত টুকু। আমি যখন ২০১৫ সালে কংলাকে উঠেছিলাম তখন কিন্তু কংলাকে এত রিসোর্ট ছিলো না।

এখন প্রায় ২০ টার বেশি রিসোর্ট আছে এবং এগুলো খুবই চমৎকার ভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। যারা একদম নিরিবিলি তে সময় ও মুহুর্ত উপভোগ করতে চান তাদের জন্য সোনায় সোহাগা। আমি আগে জানলে এখানেই রিসোর্ট নিতাম। যাই হোক পরবর্তীতে আবার আসা যাবে, তখন কংলাকের চূড়ায় থাকবো।

সূর্য আবারো মেঘের আড়াল হয়ে চারিপাশ মেঘে ঢেকে গেলো। কি এক অনুভূতি তা বুঝতে হলে আপনার ও এখানে আসতে হবে ঠিক এই সময়। শরত বা হেমন্তের সময়ে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য অবলোকন করতে পারবেন এই সাজেক থেকে।

কংলাকের চূড়ায় জাম্বুরা গাছ থেকে জাম্বুরা পেড়ে মরিচ দিয়ে মাখিয়ে খাওয়া হলো টাকার বিনিময়ে। এই তরতাজা জাম্বুরার স্বাদ মুখে লেগে আছে এখনো। প্রায় ১ ঘন্টার ও বেশি সময় কংলাকের চূড়ায় অবস্থান করে নিচে নেমে আসলাম ৩০ মিনিটে।

হেলিপ্যাডে আড্ডা

এসেই হেলিপ্যাডে বসে সূর্যাস্ত দেখার জন্য অপেক্ষা করলাম। আকাশ মেঘলা থাকায় এবং খুব বেশি ঘন মেঘের কারণে সূর্যাস্ত ভালোভাবে দেখা যায়নি, কিন্তু মেঘ-পাহাড়ের যে খেলাটা দেখেছি সেটাই দুচোখ ভরিয়ে দিয়েছে। এখানে বসেই বেম্বু চা খেলাম তৃপ্তি নিয়ে। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে হেটে হেটে রুমে এসে সামান্য বিশ্রাম নিলাম।

রাত ৮ টায় রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর সবাই মিলে গিটার নিয়ে চলে গেলাম হেলিল্যাডে। গোল করে বসে আমরা ৯ জন ২ ঘন্টা গলা ছেড়ে বাংলাদেশের সব জনপ্রিয় গানগুলো গাওয়ার চেষ্টা করলাম।

মেঘ যেন আমাদের ঘিরে ধরেছে, মৃদু বাতাসে হালকা শীতের আমেজ এই আড্ডাটা অদ্ভুত রকমের আনন্দ দিলো সবাইকে। আশেপাশের লোকজন ও আমাদের সাথে যোগ দিয়ে গান গাইল। রাত ১০.৩০ টায় রুমে এসে বারান্দায় বসে রাতের সাজেক উপভোগ করছি আর আবৃত্তি করছি।

রাতের ধনুতে প্রভাত ছুঁড়েছে রক্ত – আলোর তীর আকাশ-বাসরে কৌতুকরত তারাকারা অস্থির কুণ্ঠায় লাজে পলাতক সবে সুদূর দিক-বিদিকে, থেমে গেছে তাই সুখ প্রমত্ত নিশীথের মঞ্জীর। শাহান শাহের মিনারশীর্ষ ধৌত আলোর নীরে সূর্যশিকারী মুখর-কন্ঠ পূব দিগন্ত তীরে, পাখি ডেকে বলে; সময় হয়েছে জেগে ওঠো মধুমুখী আলোর কাজলে দু’চোখে তোমার ঢেকে দাও সুপ্তিরে।

রাতের সাজেক এত সুন্দর

বারান্দায় রাত ১২ টা পর্যন্ত আড্ডা দিয়ে বেডে এসে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম মাত্র, কিন্তু ঘুমপাড়ানির মাসিপিসি আজ আর আসবে না। তাই আবারো বেরিয়ে পরলাম সাজেকের রাস্তায়। এ আমি কি দেখছি রাতের সাজেক এত সুন্দর মেঘের ভেলায় স্নিগ্ধ বাতাসের সাথে হাটতে লাগলাম। প্রায় ১ ঘন্টা মধ্যরাতের সাজেকের রাস্তায় হেটে রুমে এসে ঘুম দিলাম।

২৫/০৯/২০ ভোর ৫.৪০ টায় ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে পরলাম কংলাকের উদ্দেশ্যে। কারণ আমি জানি এইসব পাহাড়ের চূড়ায় সকালের পরিবেশ ও দৃশ্য কি অপরূপ হয় যেহেতু দার্জিলিংয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে ঝুলিতে। আমি একা একা কংলাকের পথে হাটছি।

কি অপূর্ব এই সকাল, ঠিক যেন কোন মায়াপরীর দেশে আছি। খুব তাড়াতাড়িই কংলাকের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। চূড়া থেকে চারিপাশের পাহাড় – মেঘের মিতালী এক ভয়ংকর সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তাই তো আবৃত্তি করলাম..

তখনো প্রহরী সুবেসাদেকের খোলেনি সিংহদ্বার তখনো ভোরের আকাশে ছড়ানো হালকা অন্ধকার উদয়শৈলে সূর্য ওঠার তখনো একটু বাকি নিশিনিমগ্ন প্রকৃতির ঘরে তখনো বন্ধদ্বার। সরাইখানার দুয়ারে কে যেন সহসা উঠল হাঁকিঃ মুসাফির শোনো দুর্লভ যত নিমেষ যেতেছে ডাকি, সত্তর এসো ভোগের পাত্র ভরে নাও অনুরাগে দেহের আঁধারে জীবন সুরার পিপাশা থাকতে বাকি।

এখানে প্রায় ৪৫ মিনিট চুপচাপ বসে উপভোগ করেছি অসাধারণ কিছু মুহুর্ত। তারপর নিচে হেলিপ্যাডে এসে চা খেয়ে নিলাম তৃপ্তি সহকারে। সকালের নাস্তা সেরে নিলাম গরম গরম খিছুড়ি দিয়ে৷ রুমে এসে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলাম।

সকাল ১০ টায় সাজেক থেকে রওনা দিয়ে দুপুর ১.৩০ টায় খাগড়াছড়িতে পৌঁছালাম। দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেল ৩ টার গাড়িতে খাগড়াছড়ি থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পৌঁছালাম রাত ১২ টায়। এবং সেই সাথে শেষ হয়ে ও হইল না আমার সাজেকের এক অধ্যায়।

5 1 ভোট
রেটিং

লেখক

আসিফ হায়দার
0 মন্তব্য
Inline Feedbacks
সব মন্তব্য দেখুন
''
0
আমরা আপনার অভিমত আশা করি, দয়াকরে মন্তব্য করুনx
()
x