ভারত ভ্রমণ কাহিনী

ঢাকা থেকে গ্যাংটক । সিকিম ভ্রমণ – পর্ব: ১

Loading

নাপিত্তাছড়া ট্রেইল
নাপিত্তাছড়া ট্রেইল
নাপিত্তাছড়া ট্রেইল
napittochara-trail-3
নর্থ সিকিম
napittochara-trail-3
বুড়িমারী-চেংড়াবান্দা স্থলবন্দর
napittochara-trail-3
শিলিগুড়ি SNT বাস টার্মিনাল
Shadow

অনেক দিন থেকেই সিকিম যাবার ইচ্ছা ছিল। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও নানা কারণে আর যেতে পারিনি। কোভিডের পর ভারত পর্যটকদের জন্য বর্ডার খুলে দেয়ায় নতুন করে আবার প্রস্তুতি নেই। অবশেষে ২০২৩ সালের মে মাসে পরিবার নিয়ে সিকিম ভ্রমণ করি। আমার সিকিম ভ্রমণের গল্প কয়েকটি পর্বের মাধ্যমে আপনাদের মাঝে শেয়ার করবো। আজ বলবো ঢাকা থেকে সড়ক পথে গ্যাংটক যাওয়ার অভিজ্ঞতা।

সিকিম ভ্রমণ এর পরিকল্পনা

ভুটান এবং লাদাখ ব্যাচেলর ট্যুর দেয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে আগেই জানিয়ে দেয়া হয় তাদের সাথে নিয়ে সিকিম যেতে হবে। তাই এবার শীতে ফ্যামিলি নিয়ে সিকিম যাবার প্ল্যান করি। আমার মতে বাংলাদেশ থেকে কম খরচে বরফ দেখতে চাইলে সিকিম খুবই আদর্শ জায়গা। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিকিম ভ্রমণের সব থেকে আদর্শ সময়। এই সময় ঠান্ডা একটু কম থাকে।

আমার সাথে যেহেতু বাচ্চা আছে, তাই মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে সিকিম ভ্রমণের তারিখ চূড়ান্ত করি। সেই অনুযায়ী ডিসেম্বরের মধ্যে সবার ই-পাসপোর্ট বানিয়ে ফেলি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ইন্ডিয়ান ভিসা নিয়ে নেই। সিকিমে যেহেতু মারাত্মক ঠান্ডা, তাই সবার জন্য ভালো মানের শীতের কাপড়, জ্যাকেট, হ্যান্ড গ্লাভস, কান টুপি, মোজা, ইনার ইত্যাদি কিনে ফেলি।

সিকিমে কখন কি করবো তার একটা খসড়া আগে থেকেই বানিয়ে ফেলি। আমি মোটামোটি গ্যাংটক, নর্থ সিকিম, সাঙ্গু লেক যাবার টার্গেট করি। সময় হলে দার্জিলিং ঘুরে আসব। সিকিমের বেশিরভাগ জায়গায় কোনো ট্যুর এজেন্সির মাধ্যমে যেতে হয়। এটা সিকিম প্রশাসনের নিয়ম। আমার প্ল্যান হলো গ্যাংটক গিয়ে সেখান থেকে কোনো এজেন্সির প্যাকেজ নিবো। এতে খরচ এবং ঝামেলা কম হয়।

সিকিম ভ্রমণ এর জন্য গ্রূপ খোঁজা

গ্ৰুপে সিকিম ভ্রমণের সুবিধা অনেক। গ্ৰুপ মেম্বার ৬ বা ৭ জন হলে সব থেকে ভালো। এতে খরচ অনেক কমে যায়। এক গাড়িতে ৬/৭ জন যাওয়া যায়। আর গাড়ি ভাড়া ১ জনের জন্য যা, ৬ জনের জন্যও তা। তাই আমি ঢাকা থেকে বিভিন্ন ফেইসবুক ট্রাভেল গ্রূপে পোস্ট দিয়ে আরো ৩ জন কে আমাদের সাথে নিয়ে নেই। উনারা ব্যাচেলর।

ঢাকা থেকে কবে রওনা দিবো, কোথায় মিলিত হবো, সিকিমে কখন কোথায় যাবো ইত্যাদি গ্রূপের সবাইকে জানিয়ে দেই। বুড়িমারী, চেংড়াবান্দা বা শিলিগুড়ি এসএনটি থেকেও গ্ৰুপ ম্যানেজ করা যায়। তবে সব থেকে ভালো হয় নিজেদের পরিচিত লোকজনের সাথে সিকিম ভ্রমণ করলে।

ঢাকা থেকে বুড়িমারী

মার্চের ১০ তারিখ সন্ধ্যা ৭ টায় আমরা ৪ জন ঢাকার কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী এন আর ট্রাভেলস এর বাসে শিলিগুড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। এই বাস সরাসরি ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যায়। বর্ডার পার হয়ে অবশ্য অন্য বাস দেয়। আমার মতে পরিবার নিয়ে ভ্রমণ করলে ঝামেলা এড়াতে এই বাস সব থেকে ভালো। হুন্দাই বিজনেস ক্লাস এই বাসের টিকেটের দাম নেয় জনপ্রতি ২২০০ টাকা। আমি, আমার স্ত্রী, এবং দুই মেয়ের জন্য ৩ টিকেট কিনেছিলাম। ছোট মেয়ে আমাদের কোলে থাকবে।

আমার বড় মেয়ের বয়স ৯ বছর এবং ছোট মেয়ের বয়স ৩ বছর। এতো ছোট বাচ্চা নিয়ে লম্বা জার্নি করবো শুনে অনেকেই ভয় দেখায়। তবে দেশে আমি ওদের নিয়ে সেন্টমার্টিন, সাজেক, সিলেট ইত্যাদি নানা জায়গায় ভ্রমণ করেছি। তাই অতিরিক্ত ঠান্ডা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলাম না। সাথে বাচ্চাদের জন্য পর্যাপ্ত শুকনা খাবার নিয়ে নেই।

শ্যামলী এন আর ট্রাভেলস - ঢাকা শিলিগুড়ি
শ্যামলী এন আর ট্রাভেলস এর বাস এবং টিকেট

রাস্তায় খুব একটা ট্রাফিক ছিলোনা। তাই বাস বেশ ভালো গতিতেই সামনে আগাতে থাকে। রাত ১১ টায় আমরা বগুড়ার ফুড ভিলেজে পৌঁছাই। বাস এখানে প্রায় ২০ মিনিটের যাত্রা বিরতি দেয়। ডিনারে আমরা ভাত, মুরগি, গরুর মাংস, ডাল এবং সবজি খাই। বিল আসে ৪৩০ টাকা। আমি ব্যাচেলরদের সাথে বাজেট ট্রিপ দিলেও ফ্যামিলি নিয়ে গেলে খরচ থেকে তাদের সুবিধাটাই একটু বেশি চিন্তা করি। ইনফ্যাক্ট করা লাগে।

বুড়িমারী আসার একটু আগে বাসের সুপার ভাইজার সবার কাছে থেকে পাসপোর্ট, ট্র্যাভেল ট্যাক্স এবং পোর্ট ফি নিয়ে নেয়। আমি ঢাকা থেকেই সবার ট্রাভেল ট্যাক্স (জনপ্রতি ৫০০ টাকা) দিয়ে এসেছি। তাই কেবল পোর্ট ফি (জনপ্রতি ৬০ টাকা) দেই। ৫ বছরের কম বাচ্চাদের ট্রাভেল ট্যাক্স লাগেনা। রাত ৪ টার দিকে বাস বুড়িমারী শ্যামলী কাউন্টারে চলে আসে। ইমিগ্রেশন ওপেন হবে সকাল ৮:৩০ মিনিটে। তাই কাউন্টারে ব্যাগ রেখে পাশেই অবস্থিত হোটেল সামটাইমস এ জনপ্রতি ২০০ টাকা দিয়ে একটা ডাবল রুম নিয়ে নেই।

বুড়ির হোটেলে সকালের নাস্তা

সকাল ৮ টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করতে চলে যাই বিখ্যাত সেই বুড়ির হোটেলে। একটু দেরি হলে এখানে পরোটা পাওয়া যায় না। তাই ভাত, আলু ভর্তা আর মুরগির মাংস দিয়ে সকালের নাস্তা করি। বুড়ির হোটেলের খাবার দাম এবং মান মোটামুটি মানের। ২০১৭ সালে ভুটান যাবার সময়ও এখানে খাবার খেয়েছিলাম। মনে হলো পরিবেশ আগের থেকে একটু উন্নত হয়েছে।

বুড়ির হোটেল - সিকিম ভ্রমণ
বুড়ির হোটেল

বুড়ির হোটেলের সামনে আমি আমার গ্ৰুপ মেম্বারদের সাথে দেখা করি। গ্রূপ মেম্বার মাজহার ভাই জানালো আমাদের সাথে উনার পরিচিত এক দম্পতিও যাবে। তার মানে আমরা ৪ জন, ১ দম্পতি, ৩ ব্যাচেলর মোট সদস্য ৯ জন। বাকি সবাই অন্য বাসে বুড়িমারী এসেছে। বর্ডার পার হয়ে ট্যাক্সি নিয়ে শিলিগুড়ি যাবে। শিলিগুলির এসএনটি অফিসে আবার সবাই একসাথে মিলিত হবো। আমি আমার ইন্ডিয়ান ফোন নাম্বার উনাদের দিয়ে দিলাম।

বুড়িমারী-চেংড়াবান্দা ইমিগ্রেশন

নাস্তা শেষে একটা ভ্যান নিয়ে চলে আসি বুড়িমারী ইমিগ্রেশন অফিস। ঘড়িতে সময় তখন সকাল সাড়ে নয়টা। এসে দেখি শ্যামলী পরিবহনের সব যাত্রীদের ইমিগ্রেশন প্রায় শেষ। আমাদের জন্য শ্যামলীর লোকজন অপেক্ষা করছে। খুব সহজেই কোনো ঝামেলা ছাড়া ইমিগ্রেশন প্রসেস শেষ করলাম। এখানে আমার NOC দেখাতে হয়েছিল।

শ্যামলীর লোকজন এখানে আগেই আমাদের লাগেজ এনে রেখেছিলো। নিজের লাগেজ বুঝে নিয়ে কাস্টমস এ চলে গেলাম। শ্যামলীর একজন কাস্টমস পার করে দিলো এবং বলে দিলো এবার হেটে ওপারে চলে যান। সেখানে অন্য একজন আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বাকি কাজে উনি সাহায্য করবে। শ্যামলী বাসে আসলে আপনারা এই ধরণের সুবিধা পাবেন।

এর পর পায়ে হেটে ভারতে প্রবেশ করি। ওপারে গিয়ে শ্যামলীর সেই লোকের সাথে দেখা করলাম। উনি ইন্ডিয়ান কাস্টমস এর সকল প্রসেস শেষ করে সকাল ১০:৩০ এর দিকে আমাদের চেংড়াবান্দা শ্যামলী কাউন্টারে নিয়ে যায়। কাউন্টারের একজন ইমিগ্রেশনের জন্য সবার পাসপোর্ট নিয়ে নিলো। সাথে পোর্ট ফি এবং অন্যান্য খরচ বাবদ জনপ্রতি ২০০ রুপি চাইলো। আমার কাছে রুপি না থাকায় এবং সাথে বাচ্চা আছে বলে ৬০০ টাকা দিলাম।

কাউন্টারে ফ্রি চা খেয়ে ঐখান থেকেই টাকা ভাঙিয়ে রুপি করে নিলাম। কয়েক জায়গায় যাচাই করে দেখি শ্যামলী কাউন্টারেই ভালো রেট। এর আগেও আমি এই বর্ডারে এসেছি। বাংলাদেশ অংশে সব কিছু প্রায় আগের মতোই আছে। তবে ভারতের অংশে বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। শেষ বারের মতো দেশে কথা বলে মোবাইলে ইন্ডিয়ান সিম সেট করে সময় ঠিক করে নিলাম।

চেংড়াবান্দা ইমিগ্রেশন অফিস - সিকিম ভ্রমণ
চেংড়াবান্দা ইমিগ্রেশন এলাকা

কিছুক্ষন পর ইমিগ্রেশন ফর্ম পূরণ করে হাতে পাসপোর্ট দিয়ে একজন কে লাইনে দাঁড়াতে বললো। কাউন্টারে ব্যাগ রেখে আমি লাইনে দাঁড়ালাম। বাকিরা কাউন্টারে অপেক্ষা করতে থাকে। ইমিগ্রেশনে লোকের চাপ বেশি ছিল। লাইন কাছাকাছি আসলে সবাইকে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করি এবং ইমিগ্রেশন প্রসেস শেষ করি।

চেংড়াবান্দা থেকে শিলিগুড়ি

ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ হলে কাউন্টারের লোকজন আমাদের প্রধান সড়কে অপেক্ষামান শ্যামলীর বাসের কাছে যেতে বলে। ব্যাগ, লাগেজ সব উনারাই নিয়ে যায়। বাস দেখে সবার মাথায় হাত। খুবই সাধারণ মানের ছোট বাস। তবে এসি আছে। সকাল ১১:২০ মিনিটে বাস ছেড়ে দেয়।

অনেক প্রশস্ত এবং সুন্দর হাইওয়ে ধরে আমরা শিলিগুড়ির দিকে আগাতে থাকি। বিশাল আকৃতির ইন্ডিয়ান ট্রাক গুলো ৪০/৫০ টন মাল নিয়ে আরামে চলে যাচ্ছে। মনে মনে ভাবলাম এই ট্রাক গুলো আমাদের রাস্তায় চললে দুই দিনেই রাস্তা শেষ। হাইওয়ের দুইপাশের দৃশ্য খুবই মনোরম। প্রচুর শস্য ক্ষেত, যেখানে অনেকে কাজ করছে।

বাস তিস্তা ব্রিজের উপরে উঠার পর মন খারাপ হয়ে গেলো। বিশাল তিস্তা নদী শুকিয়ে খাল হয়ে গেছে। পদ্মা নদীতে যানবাহন চলাচলের যেমন দৃশ্য আমরা দেখি অনেকটা সেরকম। আসলে অপরিকল্পিত ভাবে নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে কেবল বাংলাদেশ না, ইন্ডিয়াও বেশ ঝুঁকিতে আছে। তবে এরা গাড়ি এবং ট্রেন চলাচলের জন্য আলাদা সেতু বানিয়েছে।

তিস্তা নদী - সিকিম ভ্রমণ
তিস্তা ব্রীজ থেকে তিস্তা নদী

প্রায় ২ ঘন্টা পর বাস আমাদের শিলিগুড়ি শ্যামলী কাউন্টারে নামিয়ে দেয়। রিটার্ন টিকেট কাটতে চাইলাম। কাউন্টার থেকে জানালো আমি যে দিনের চাই ওই দিনের টিকেট ফাঁকা নাই। পরে ১০০ রুপি দিয়ে অটো ভাড়া করে চলে আসলাম এসএনটি।

শিলিগুড়ি এসএনটি অফিস

এসএনটি থেকে সিকিমেরে বিভিন্ন জায়গার বাস এবং ট্যাক্সি পাওয়া যায়। এখান থেকে সিকিম যাবার পারমিশন নেয়া যায়। এই পারমিশন গ্যাংটক এর ৪০/৫০ কিলোমিটার আগে র‍্যাংপো থেকেও নেয়া যায়। ঝামেলা এড়াতে আমি এখান থেকেই নিয়ে নিলাম। এসএনটি ট্যুরিসম অফিস থেকে ১০ রুপি ফি দিয়ে আবেদন ফর্ম নিতে হয়। প্রত্যেকের জন্য আলাদা ফর্মে আবেদন করা লাগে।

ফর্ম সঠিক ভাবে পূরণ করে তার সাথে ১ সেট পাসপোর্ট ও ভিসার কপি এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি জমা দিলাম। সিকিমে আমরা ১০ দিন থাকবো উল্লেখ করে দিলাম। বেশি দিন উল্লেখ করলে সমস্যা নাই। তবে কম দিন উল্লেখ করে সময় মতো না ফিরতে পারলে অনেক সময় ঝামেলা করে। এখানকার অফিসার গুলো বেশ আন্তরিক এবং হেল্পফুল। অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই পারমিশন পেয়ে গেলাম।

এসএনটি বেশ গুছানো এবং পরিপাটি। এখানে কেন্টিন, ওয়েটিং রুম, টয়লেট আছে। ১০০+ বাংলাদেশীর সাথে দেখা হলো। সবাই সিকিম যাচ্ছে। ফ্যামিলি নিয়ে যাচ্ছি বলে অনেকেই আমাদের সাথে যুক্ত হতে চাইলো। কিন্তু আগে থেকেই গ্রূপ ঠিক করায় সেটা আর সম্ভব হলোনা। ক্যান্টিনে দুপুরের খাবার খেয়ে গ্ৰুপ মেম্বারদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। ক্যান্টিনে প্রায় সব ধরণের ইন্ডিয়ান খাবার পাওয়া যায়। আমরা ফ্রাইড রাইস, মুরগি, সবজি খেয়েছিলাম। রাইস একটু শক্ত ছিল। এখানকার কফি বেশ টেস্টি।

শিলিগুড়ি এসএনটি অফিস -  সিকিমের পারমিশন
শিলিগুড়ি এসএনটি অফিস

এসএনটির বাহিরে ফ্রেশ ফল থেকে হাতে বানানো জুস্ পাওয়া যায়। দাম প্রতি গ্লাস ২০/৪০ রুপি। আমরা বেশ কয়েক গ্লাস খেয়ে নিলাম। দারুন টেস্টি। ফলের সাথে এরা কোনো পানি মিশায় না। একটু পর আমার গ্রূপের সবাই চলে আসলো। উনাদের দ্রুত পারমিশন নিয়ে গাড়ি ঠিক করতে বললাম।

শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক

রাস্তায় জ্যাম থাকার আজ গাড়ির বেশ সংকট। ট্যাক্সি ঠিক করতে আমাদের অনেক সময় লেগে যায়। এখানে ট্যাক্সির একটা সিন্ডিকেট আছে। সিকিমের প্যাকেজ নিলে ট্যাক্সি ভাড়া কম। অন্যথায় বেশি। আমরা যেহেতু প্যাকেজ গ্যাংটক থেকে নিবো তাই শুধু গাড়ি নিলাম। ভাড়া ৫২০০ রুপি। প্যাকেজ গ্যাংটক থেকে নেয়া ভালো। নাহলে পস্তাবেন। সস্তা হোটেল দিয়ে দিবে।

প্রায় ৫ টার দিকে আমাদের গাড়ি ছাড়ে। গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়াও ৮ জন বসা যায়। আমরা পিছনের সিটে বসলাম। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে গাড়ি এগিয়ে চলে। কিছু দূর আগানোর পর আমার বড় মেয়ে বমি করে দেয়। বমির ঔষধ গাড়ির ছাদে আমার ব্যাগে ছিল। তাড়াতাড়ি গাড়ি থামিয়ে ওকে ঔষধ খাইয়ে দিলাম। অতিরিক্ত উচ্চতা এবং আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি বার বার টার্ন নেয়ার ফলে এমনটা হতে পারে।

গ্যাংটক এর আগে র‍্যাংপো পুলিশ চেক পোস্টে সবাইকে সিকিম ভ্রমণ এর পার্মিশনের কপি দেখিয়ে এরাইভাল সিল নিতে হয়। এই চেকপোস্ট রাত ৮:৩০ এ বন্ধ হয়ে যায়। তাই ড্রাইভার খুব তাড়াহুড়া করছিলো। এর মাঝে বৃষ্টি শুরু হলো। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে পলিথিন দিয়ে ছাদে রাখা ব্যাগ, লাগেজ ঢেকে দেয়।

রংপোক পুলিশ চেকপোস্ট - সিকিম ভ্রমণ
র‍্যাংপো পুলিশ চেকপোস্ট

রাট ৮ টার দিকে আমরা চেকপোস্টে পৌঁছাই। এখানে ২ টা কাউন্টার আছে। এসএনটি থেকে যারা পারমিশন নেয় নাই তারা প্রথমে পারমিশন নিবে, পরে দ্বিতীয় কাউন্টারে যাবে। আমরা যেহেতু পারমিশন নিয়ে এসেছি তাই দ্বিতীয় কাউন্টারে চলে যাই। মানুষের বেশ চাপ থাকায় সিল নিতে আমাদের প্রায় আধাঘণ্টা লেগে যায়।

ইন্ডিয়ান এক লোককে দেখলাম এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে বিভিন্ন গাড়িকে রিকোয়েস্ট করছে উনাকে গ্যাংটক নামিয়ে দিতে। উনি একটা শেয়ার্ড গাড়িতে এসেছিলো। কিন্তু পারমিশন নেয়ার সময় সেই গাড়ি উনাকে না নিয়ে চলে গেছে। বাস বা শেয়ার্ড গাড়িতে আসলে এই ধরণের সমস্যা হতে পারে। তাই এসএনটি থেকেই পারমিশন নিবেন। বা গাড়ি থেকে নামার সময় ড্রাইভারকে বলে নিবেন আপনার দেরি হবে।

যাত্রাপথে চাকা পাংচার

চেকপোস্ট থেকে একটু আগানোর পর তাশি/সিংটাম ব্রিজের উপর রাত ৯ টার দিকে আমাদের গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে যায়। চাকা ঠিক করতে বেশ সময় লেগে যায়। এই ফাঁকে ব্রিজ থেকে একটু নিচে একটা রেস্টুরেন্ট থেকে সবার জন্য বার্গার নিয়ে নিলাম। মাত্র ৭০ রুপিতে বেশ বড় সাইজের বার্গার। ঢাকায় এটা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নিবে।

গ্যাংটক যাত্রাপথে গাড়ির চাকা পাংচার - সিকিম ভ্রমণ
তাশি/সিংটাম ব্রিজ

গ্যাংটকে রাত ৯ টার মধ্যে সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যায়। তাই আমি ২ টা বার্গার এবং ১ টা পিজা পার্সেল নিয়ে নিলাম। ১০ টার দিকে আমরা আবার চলা শুরু করি। অবশেষে রাত ১১ টার দিকে আমরা গ্যাংটক পৌঁছাই।

গ্যাংটকে হোটেল নিয়ে বিড়ম্বনা

গাড়িগুলো সাধারণত ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে নামিয়ে দেয়। আমরা ড্রাইভারকে ২০০ রুপি অতিরিক্ত দিয়ে একদম এমজি মার্গে শ্যারোলিন বুটিক হোটেলের সামনে নামি। ব্যস্ততার কারণে আমি ঢাকা থেকে হোটেল বুকিং দিয়ে আসতে পারিনাই। তবে মাজহার ভাই এই হোটেলে ব্যাচেলর ৩ জনের জন্য ১ রুম বুকিং দিয়ে এসেছিলো। তাই আমরা সবাই প্রথমে এখানেই আসি। উনারা রুমে চলে যায়।

আমরাও এখানে রুম নিতে চাইলাম। কিন্তু হোটেল কতৃপক্ষ বললো ফ্যামিলি রুম ফাঁকা নাই। তাই সবাইকে রিসিপশনে বসিয়ে আমি আর ফয়সাল ভাই হোটেল খুঁজতে বেরিয়ে গেলাম। প্রায় ৩০ মিনিট কয়েকটা হোটেল ঘুরেও পছন্দমতো রুম পেলাম না। তবে ফয়সাল ভাই একটা পেয়ে সেখানে উঠে যায়।

রাত ১১:৩০ মিনিটের দিকে মাজহার ভাই আমাকে কল দিয়ে বললো হোটেলের ম্যানেজার নাকি বলেছে ১ টা ফ্যামিলি রুম দেয়া যাবে। তবে ক্লিন করার জন্য ৩০ মিনিট সময় দিতে হবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। রাত ১২ টার দিকে আমরা আমাদের রুমে প্রবেশ করলাম। কুইন সাইজের এই রুমের ভাড়া ২৫০০ রুপি। রুমের কন্ডিশন বেশ ভালো। রুমে গ্রিজার, ওয়াইফাই, আলমারি, টেবিল, টিভি, বারান্দা সবই আছে।

শ্যারোলিন বুটিক হোটেল - গ্যাংটক হোটেল
গ্যাংটকে আমাদের হোটেল

আপনারা প্রথম দিনের জন্য অন্তত ঢাকা থেকে হোটেল বুকিং দিয়ে আসবেন। কোনো কারণে গ্যাংটক পৌঁছাতে দেরি হলে হোটেল নিয়ে ঝামেলায় পড়তে পারেন। অনলাইনে বুকিং দেয়ার অনেক সাইট আছে। পরে দেখে শুনে পছন্দমত অন্য হোটেলে চলে যাবেন।

প্রায় ৩০ ঘন্টা জার্নি করে সবাই খুব বিধ্বস্ত। ভাবলাম গোসল করে ফ্রেশ হয়ে ঘুম দেই। কপাল খারাপ। গিজার কাজ করছেনা। রিসিপশন থেকে জানালো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কি আর করা কোনোরকমে হাতমুখ ধুয়ে সেই বার্গার আর পিজা খেয়ে বিছানায় চলে গেলাম। দেশে কল করে সবাইকে জানিয়ে দিলাম। কাল সকালে আমাদের গ্যাংটক শহর ভ্রমণের প্ল্যান আছে। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি।

সিকিম ভ্রমণের গল্প

আমার ভ্রমণ কাহিনী আপনাদের কেমন লাগলো জানাবেন। সিকিম ভ্রমণের আরো অভিজ্ঞতা জানতে বাকি পর্ব গুলো দেখে নিতে পারেন। আশাকরি আপনাদের ভালো লাগবে।

রাতের গ্যাংটক শহর - সিকিম ভ্রমণ
রাতে এমজি মার্গে আমি

সিকিম ভ্রমণ নিয়ে কিছু টিপস

  • শীতকালে সিকিম ভ্রমণ করার চেষ্টা করবেন।
  • প্রথম রাতের জন্য ঢাকা থেকে হোটেল বুকিং দিয়ে আসবেন।
  • রাত ৯ টার মধ্যে বেশিরভাগ রেস্টুরেন্ট, দোকানপাঠ বন্ধ হয়ে যায়। কেবল কিছু টং দোকান খোলা থাকে।
  • সিকিমে ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলা নিষেধ।
  • ভালো মানের জ্যাকেট, মোজা, কানটুপি, হ্যান্ড গ্লাভস, ইনার সাথে নিবেন।
  • সিকিম ভ্রমণ এর কোন কোনো প্যাকেজ শিলিগুড়ি থেকে নিবেন না। প্যাকেজ গ্যাংটক থেকে নিবেন।
  • শিলিগুড়ি এসএনটি থেকে সিকিম ভ্রমণ এর পারমিশন নিবেন।
  • নর্থ সিকিম, সাঙ্গু লেক যাবার সময় গাড়িতে ড্রাইভার ছাড়াও অতিরিক্ত একজন গাইড থাকে।
  • সবার পাসপোর্ট, ভিসা, কোভিড ভ্যাক্সিন সনদের কপি এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি সাথে নিবেন(৭/৮ কপি)।
  • চাকরিজীবী হলে অফিস থেকে ভ্রমণ করার জন্য ১ কপি NOC নিবেন।
  • আসা-যাওয়া পথে র‍্যাংপো পুলিশ চেকপোস্ট থেকে পাসপোর্টে এন্ট্রি এবং এক্সিট সিল অবশ্যই নিবেন।
4.7 6 ভোট
রেটিং

লেখক

আমি পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করলেও ঘুরে বেড়াতে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আমি আমার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা কে এই ওয়েব সাইটে নিয়মিত শেয়ার করি।

Subscribe
Notify of
2 মন্তব্য
Inline Feedbacks
সব মন্তব্য দেখুন

''

2
0
আমরা আপনার অভিমত আশা করি, দয়াকরে মন্তব্য করুনx