ভূস্বর্গ কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর | কাশ্মীর ভ্রমণ -পর্ব ৭

ভারতের জম্মু এন্ড কাশ্মীরে রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী হচ্ছে শ্রীনগর (Srinagar)। শীতকালে প্রবল শীতের কারণে রাজধানী ছয় মাসের জন্য জম্মুতে স্থানান্তর করা হয়। শ্রীনগর ঝিলম নদীর তীরে অবস্থিত এক পর্যটন শহর। এখানকার লেক, হাউসবোট, শিকারা, পাহাড়, সবুজ মাঠ, বার্চ ও উইলো গাছে পূর্ণ অরণ্য পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এখানকার বিভিন্ন কুটির শিল্প, ড্ৰাই ফুডস, মসলা খুবই বিখ্যাত। এজন্যই শ্রীনগর কে বলা হয় প্রাচ্যের ভেনিস।

dal lake Srinagar
ডাল লেক

শ্রীনগরের দর্শনীয় স্থানসমূহ
শ্রীনগরে দেখার মতো বেশ কিছু প্রাকৃতিক, প্রাচীন এবং ঐতিহাসি স্থান রয়েছে। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ডাল লেক, নাগিন লেক, নিশাত বাগ, টিউটিল গার্ডেন, শ্রী প্রতাপ সিং মিউজিয়াম, জামা মসজিদ, হজরৎ বল মসজিদ, দচিগাম বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি ইত্যাদি।

সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮। আজ সারাদিন আমরা কাশ্মীরের পেহেলগাম ভ্রমণ করেছি। ভ্রমণ শেষে এখন আমরা রাজধানী শ্রীনগরের পথে। শ্রীনগর টু পেহেলগাম সড়ক অসাধারণ সুন্দর। লিডার নদীর পার ঘেসে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। অন্য পাশে সবুজ পাহাড়, সারি সারি আপেল গার্ডেন, নাস্পাতির বাগান। গতকাল রাতে এই পথে পেহেলগাম যাওয়ায় এই অপূর্ব সৌন্দর্য আমরা মিস করেছিলাম।

ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি
শ্রীনগরে প্রচুর ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি রয়েছে। শ্রীনগর-জম্মু হাইওয়ের পাশে মিলবে এই সকল ক্রিকেট ব্যাট ফ্যাক্টরি। এখানে এরা কাঠ থেকে বিভিন্ন পক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রিকেট ব্যাট তৈরী করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিক্রি করে। শেষ বিকালে এমন এক ব্যাট ফ্যাক্টরির সামনে এসে আমরা থামি। ড্রাইভারের মুখে গল্প শুনে আমি ভেবেছিলাম এই সকল ফ্যাক্টরি সাইজে হয়ত অনেক বিশাল হবে। কিন্তু এসে দেখি আসলে তেমন না। আমাদের ঢাকা শহরে শেওড়াপাড়া বা নতুনবাজারে যেমন ফার্নিটারের দোকান আছে অনেকটাই তেমন। দোকানের নিচ তলায় ফ্যাক্টরি, দোতালায় অফিস এবং ডিসপ্লে সেন্টার। নিচতলায় কাঠ কাটার, পালিশ করার এবং কম্প্রেস করার যন্ত্র রয়েছে। ফ্যাক্টরির মালিক মুসলিম এবং বেশ ভালো। অনেক আন্তরিকতার সাথেই ওনি আমাদের কাঠ থেকে কিভাবে বিভিন্ন পক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রিকেট ব্যাট তৈরী করা হয় তা বর্ণনা করলেন এবং হাতে কলমে দেখিয়ে দিলেন।

তিনি জানালেন প্রথমে ওনারা ক্রিকেট ব্যাটের জন্য বিশেষ এক ধরণের গাছ থেকে ব্যাটের সাইজ মতো কাঠ কেটে নেয়। তার পর হ্যান্ডেল লাগানোর জন্য জায়গা করে কেটে ১ বছর বাহিরে ফেলে রাখে। ১ বছর সেগুলা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে। তার পর সেগুলাকে এনে প্রেসার মেশিনে প্রেসার দিয়ে কম্প্রেস করে। নরমাল ব্যাটের জন্য ৫ বার, ডিউস বলের জন্য ১০ বার, ওয়ানডে ম্যাচের জন্য ২৫ বার , টেস্ট ম্যাচের জন্য ৫০ বার প্রেসার দেয়। কোনটা ভেঙে গেলে সেখানেই ফেলে দেয়। এর পর হ্যান্ডেল লাগিয়ে পালিশ করে। এর পর ১ দিন এক ধরণের কেমিক্যাল মিশ্রিত জলের মধ্যে ভিজিয়ে রাখে। তার পর এনে আবার হালকা কিছু প্রেসার দিয়ে পালিশ করে। ফাইনালি অর্ডার অনুসারে স্টিকার লাগিয়ে দেয়। এগুলা এখন সাকিব, কোহেলির হাতে ঝড় তোলার জন্য তৈরী। একটা ক্রিকেট ব্যাট তৈরী করতে এতো সময়, পরিশ্রম এবং প্রসেস লাগে আগে জানা ছিলোনা। আমরা তো খালি দোকানে যেয়ে কিনেই মাঠে চলে যাই।

এখানকার ব্যাটগুলো অনেক সস্তা এবং টিকসই। একটি ভালো মানের ডিউস ব্যাট মাত্র ১০০০-১২০০ রুপি। আমি আমার মেয়ের জন্য ১৭৫ রুপি দিয়ে একটি ব্যাট কিনে নেই। এটা কেমন স্ট্রং তা দেখাবার জন্য তিনি ব্যাটের এক মাথা ইটের উপর রেখে জোরে লাফাতে লাগলেন। আমি বলি ভাই কি করেন, ভেঙে যাবে তো। বললো ভাঙলে আরেকটা দিবো। যাই হোক কিছুই হয় নাই।

কাশ্মীরি ড্ৰাই ফুড
কাশ্মীরের ড্ৰাই ফুড এবং মসলা খুবই বিখ্যাত। আমরা শ্রীনগর-জম্মু হাইওয়ের পাশে এক ড্রাই ফুডের দোকানে যাই। এখানে সড়কের দুই পাশেই প্রচুর ড্রাই ফুডের দোকান রয়েছে। আমরা এখান থেকে জাফরান, বাদাম, খেজুর, ক্যানবেরি, ব্ল্যাকবেরি, আখরোট ইত্যাদি বিভিন্ন ড্ৰাই ফুড কিনে নিলাম। এগুলার দাম কোয়ালিটির উপর নির্ভর করে বিভিন্ন রকম হয়। এখানে জাফরান খুবই সস্তা এবং উন্নতমানের। আমাদের কাছে প্রতি গ্রাম ২০০ রুপি করে রাখে। আরো কমে পাওয়া যায়, তবে সেগুলার কোয়ালিটি এতো ভালো না। শ্রীনগর-জম্মু হাইওয়ের পাশে প্রচুর জাফরান চাষ হয়। জাফরান ক্ষেত দেখতে দারুন সুন্দর। ড্ৰাই ফুড কেনার আগে সেগুলা অরিজিনাল কিনা যাচাই করে নিবেন।

ডাল লেক শ্রীনগর
কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে অবস্থিত মিঠা পানির এক অপূর্ব সুন্দর লেক হচ্ছে ডাল লেক(Dal Lake)। এর দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার, প্রস্থ সাড়ে তিন কিলোমিটার। লেকের সর্বোচ্চ গভীরতা ছয় কিলোমিটার। এই লেকে দুটি দ্বীপ আছে, সোনা লান্ক আর রূপা লান্ক। শীতকালে লেক এলাকার তাপমাত্রা মাইনাস ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে চলে যায়। লেকের পানি তখন জমে বরফ হয়ে যায়। এখানে বেশ কিছু হিন্দি মুভির শুটিং হয়েছে। লেককে ঘিরেই কাশ্মীরের হাজারো মানুষ তাদের জীবিকা অর্জন করে। কেউ হাউসবোটের মালিক, কেউ ডাল লেকের বিশেষ নৌকা শিকারাতে পর্যটকদের নিয়ে পরিভ্রমন করে, আবার কেউবা ডাল লেকের বাজারে সবজি বিক্রয় করে।

হাউসবোট
ডাল লেকের প্রধান আকর্ষণ হলো হাউসবোট, পানির উপরে ভাসমান বাড়ি। ডাল লেকে প্রায় ৭০০ মতো হাউসবোট আছে। এগুলার ভিতরে আধুনিক হোটেলের মত নানান সুবিধা রয়েছে। আছে শোবার ঘর, বসার ঘর, বাথরুম, বাথটাব, বারান্দা, ওয়াইফাই ইত্যাদি। সবকিছুই সুসজ্জিত। মেঝেতে সুন্দর কার্পেট বিছানো, দরজা-জানালায় পর্দা টানানো। বারান্দায় বসে অনায়াসে বাইরের দৃশ্য অবলোকন করা যায়। হাউসবোটের দেয়াল কাঠের তৈরী, যা দারুন ভাবে করুকার্জ করা। মোট কথা এই হাউসবোটে পাওয়া যাবে সবধরনের সুবিধা যা একজন পর্যটকের একান্ত প্রয়োজন।

এই হাউসবোট গুলোর একেকটার একেক ধরণের ভাড়া। আমাদের ড্রাইভারের বাসা ডাল লেকের পারেই। ওনার মাধ্যমে আমরা ভালো মানের একটা হাউসবোট ভাড়া করে নিলাম। ভাড়া পড়লো একেক রুম ১৫০০ রুপি করে। সাধারণত এই রুমের ভাড়া নাকি ৭০০০ রুপি। পুরা বোটে আমরা ছাড়া আর কেউ নাই। ওয়াইফাই, বাথটাব সব কিছুই রয়েছে এখানে। পানির উপরে ভাসমান এই ধরণের সুবিধা দেখে দারুন লাগলো। বারান্দা থেকে ডাল লেক আর শ্রীনগর শহর দারুন সুন্দর লাগছিলো। রাতের খাবার আমরা হাউসবোটেই খেয়ে নেই। বাসায় কথা বলে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি। শুয়ে মাঝে মাঝে ভাবতেছিলাম যদি বিশাল বড় কোনো এনাকোন্ডা এসে হাজির হয় তখন কি করব?

শিকারা
শ্রীনগরে ডাল লেকের পানিতে ভেসে বেড়ানোর জন্য আছে বিশেষ ধরনের নৌকা যার নাম শিকারা। হাজার হাজার কালারফুল শিকারা প্রতিনিয়ত লেকে চলাচল করে বিভিন্ন প্রয়োজনে। আমরা রাতেই বোটের ম্যানেজার কে বলে রাখি আমাদের এমন দুইটা শিকারা দরকার। ঘন্টা অনুসারে তাদের ভাড়া। আমরা ৩০০ রুপি করে একেক শিকারা ১ ঘন্টার জন্য ভাড়া করে নিলাম। সকলে ঘুম থেকে উঠেই দেখি শিকার এসে হাজির। আমরা ফ্রেশ হয়ে শিকারায় উঠে পড়লাম। শিকারায় করে আমরা ভাসমান বাগান, ভাসমান মার্কেটে গেলাম। একটু পরই দেখি অন্য শিকারা নিয়ে ফেরিওয়ালারা চলে আসছে। তারা জাফরান, বিভিন্ন কাশ্মীরি জিনিসপত্র বিক্রি করে। এরা খুব ডিস্টার্ব করে। এদের কাছ থেকে দূরে থাকাই ভালো। ডাল লেকে হাউসবোটে থাকা, শিকারায় ভেসে বেড়ানো কাশ্মীর ভ্রমণের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দদায়ক ব্যাপার।

কাশ্মীরে শপিং
কাশ্মীরে কেনাকেটা করতে চাইলে শ্রীনগর থেকে কেনাই উত্তম। এখানেই অরজিনাল কাশ্মীরি জিনিসপত্র পাওয়া যায়। আমাদের ড্রাইভার আমাদেরকে এক বড় শোরুমে নিয়ে যায়। বিশাল বড় শোরুম। এখানে কাশ্মীরি শাল, মেয়েদের জামা, জ্যাকেট, বাচ্চাদের পোশাক ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই রয়েছে। আর দামেও অনেক সস্তা। আমি ঢাকার বাণিজ্য মেলা থেকে যে টাইপের কাশ্মীরি শাল ৩০০০ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম তা দেখি এখানে ২৫০ রুপি। আমরা সবাই এখান থেকে নিজের এবং ফ্যামিলি মেম্বারদের জন্য অনেক কিছু কিনে নিলাম। এতো কিছু কিনছি দেখে এক মুরুব্বি সেলসম্যান অবাক হয়ে আমাকে বলে বাংলাদেশ তো আসলেই অনেক উন্নত হইছে। শুনে গর্ভে বুকটা ভরে যায়।

সকালের ফ্লাইটে আমরা দিল্লি চলে আসি। আর এভাবেই শেষ হয় আমাদের কাশ্মীর ট্যুর।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

3 Comments

  1. End of march family soho jete Chai. 1y er baby ache. Kono problem hobe naki, ar apnar tour horse er kotha besi ache. Eita avoid kore onna way te gura ki possible as ur same place. Plz, don’t angry, give me some helping way for my tour,

    Thanks

    1. কোন সমস্যা নাই। মার্চ থেকে ঠান্ডা কমতে থাকে। এতো ছোট বেবি নিয়ে না গেলেই ভালো। পাহাড়ি এলাকা, আর ট্রাভেল একটু বেশি করা লাগে। তবে আপনি সাহসী হলে সমস্যা নাই। বেল্ট দিয়ে শরীরের সাথে আটকিয়ে নিবেন। অনেকেই এভাবে যায়। পাহাড়ে ঘোড়াই প্রধান ভরসা। প্রথম প্রথম একটু খারাপ লাগলেও পরে তেমন সমস্যা হবেনা। আর ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানোই আসল মজা। তার পরেও ঘোড়ায় একান্তই না উঠতে চাইলে কিছু এলাকা এড়িয়ে যেতে হবে। অরু ভ্যালি , বেতাব ভ্যালি, শ্রীনগর, ডাল লেক ইত্যাদি জায়গায় ঘোড়া লাগেনা।

    2. Hello Mr. Monir

      I also planning to go kashmir with my family at the end of March. I have a daughter of 10 years old. I have travelled india so many times. Lets make a team to avoid extra cost in kashmir.

      Thanks
      Asad Titu

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *