ভুটান

থিম্পু শহর, ভুটান

থিম্পু শহর
থিম্পু শহর: নভেম্বরে ২৩, দুপুর ১:০০

থিম্পু (Thimphu) ভুটানের রাজধানী এবং দেশের সব থেকে বড় শহর। এটি ভুটানের পশ্চিম অংশে, হিমালয় পর্বতমালার একটি উঁচু উপত্যকায় অবস্থিত। অতীতে এটি দেশের শীতকালীন রাজধানী ছিল। ১৯৬২ সাল থেকে একে দেশের রাজধানী এবং স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। পাহাড় ঘেরা থিম্পু শহর খুবই সুন্দর।

থিম্পু শহর এর দর্শনীয় স্থান

থিম্পুতে ঘুরার মতো অনেক জায়গা আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু, তাজ তাশি বা তাজ হোটেল, ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম, কিংস মেমোরিয়াল চড়টেন, ক্লক টাওয়ার স্কয়ার, সীমতখা ডিজং, ন্যাশনাল তাকিন সংরক্ষিত চিড়িয়াখানা, পার্লামেন্ট হাউস, রাজপ্রাসাদ, লোকাল মার্কেট, ন্যাশনাল স্কুল অব আর্টস, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, বিবিএস টাওয়ার ইত্যাদি।

ক্লক টাওয়ার স্কয়ার

ক্লক টাওয়ার স্কয়ার (Clock Tower Square) থিম্পুর একটি খুবই পরিচিত স্থান। একে থিম্পু টাইম স্কয়ার ও বলা হয়। এটা থিম্পুর নরজিম ল্যাম এ অবস্থিত। এর পাশেই রয়েছে ফুটবল স্টেডিয়াম। এখানে একটি উঁচু টাওয়ার রয়েছে যার মাথার চার দিকে আছে চার টি বড় বড় ঘড়ি। টাওয়ার এর সামনে বেশ ফাঁকা জায়গা রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান এখানে অনুষ্ঠিত হয়। এই স্থানটি থিম্পুর সেন্ট্রাল পয়েন্ট এবং গুরুত্ব পূর্ণ স্থান হিসাবে ধরা হয়। এর আশেপাশে রয়েছে প্রচুর দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট। এখানে প্রচুর কবুতর ঘুরে বেড়ায়।

তাজ তাশি বা তাজ হোটেল

থিম্পুর সব থেকে সুন্দর ভবন তাজ তাশি বা তাজ হোটেল (Taj Tashi Hotel)। তাজ তাশি থিমম্পুর সব থেকে সুন্দর স্থাপনা। এটি ভারতীয় হোটেল জায়ান্ট তাজ হোটেল এবং ভুটানের তাশি গ্রূপ এর একটি জয়েন্ট প্রজেক্ট। এটা ভুটানের প্রথম ফাইভ স্টার হোটেল। তাজ হোটেল ২০০৪ সালে প্রথম চালু হয়। হোটেলটিতে একটি বিশাল সম্মেলন কক্ষ ও রয়েছে।

এর পর পায়ে হেঁটে আশে পাশের আরো কিছু স্থান দেখে ট্যাক্সি ভাড়া করে নিতে পারেন থিম্পুর বাকি সব স্থাপনা গুলা দেখানোর জন্য। আপনারা দরদাম করে, কোথায় কোথায় যাবেন তা বলে নিবেন। তবে সব থেকে ভাল হয় থিম্পুতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানের জন্যই শুধু ট্যাক্সি ভাড়া করা। ঘুড়াঘুড়ি শেষ করে আবার ওই স্থান থেকে ট্যাক্সি নিবেন। তাহলে খরচ একটু কম হবে। থিম্পুতে ট্যাক্সি আমাদের ঢাকার রিক্সার মতো , সব জায়গায়, সব সময়ই পাওয়া যায়।

ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চোটেন

ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চোটেন (National Memorial Chorten) মূলত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। ভূটানের তৃতীয় রাজা জিগমে দরজি ওয়াঙচুকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৭৪ সালে এই স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এর ভেতরের বিভিন্ন পেইণ্টিং এবং স্ট্যাচু বৌদ্ধ ফিলোসফির প্রতিবিম্ব রয়েছে। এটি থিম্পু শহরের দেওবুম ল্যাম এ অবস্থিত। এটি বর্তমানে ভুটানের সব থেকে পরিচিত ধর্মীয় স্থান। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান এখানে রাষ্ট্রীয় ভাবে উদযাপন করা হয়। পূর্বে এখানে প্রবেশ ফ্রি থাকলেও এখন ৩০০ রুপী দিয়ে টিকেট কাটা লাগে।

বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু

বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু (Buddha Dordenma Statue) হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে বড় বুদ্ধ মূর্তি যা ভুটানের থিম্পু শহরের এক পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত। দূর থেকেই দেখা যাবে পাহাড়ের উপর বিশাল এক মূর্তির। এটি সোনালী রঙের। সূর্যের আলো পড়ে আরো চক চক করতে থাকে। কাছে যেতেই অবাক হবেন, এতো বিশাল মূর্তি বানালো কিভাবে!! এর চারপাশে আছে আরো অনেক গুলো ছোট ছোট মূর্তি। সব গুলোই সোনালী রঙের।

বোদ্ধের মূর্তির নিচে আছে পার্থনাগার। ঐটার ভেতরে জুতা খুলে ঢুকতে হয় এবং ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ। বাহির যতটা না সুন্দর ভেতরটা আরো বেশি সুন্দর। ছোট ছোট অনেক গুলো বোদ্ধ মূর্তি রয়েছে ভেতরে যা শোকেচে সাজানো। পুরো ইন্টেরিওর সোনালী রঙের অন্য রকম সুন্দর। সেখানে একটা কাহিনী প্রচলিত আছে। তাদের কোন এক রাজা যিনি মারা গেছেন, নাকি আসে এখানে আর এখানকার প্রধান সাধকের সাথে কথা বলেন। সবাই অবশ্য তারে দেখতে পায়না।

ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম

থিম্পু ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম (Folk Heritage Museum) ভুটানের ঐতিহ্য আর প্রাচীন গ্রামীণ জীবনের প্ৰতিচ্ছবি। মিউজিয়ামে গেলে আপনে সহজেই ভুটানের ইতিহাসের সাথে পরিচিত হতে পারবেন। এটি ২০০১ সালে ভুটানের রানী মাতা প্রতিষ্ঠা করেন। ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে সুন্দর একটা বাগান যা নানান রকমের গাছপালায় ভরপুর, বসার জন্য টেবিল, চেরার। ভিতরের পরিবেশ খুবই সুন্দর। এখানে রয়েছে আগের দিনের উইন্ড মেইল, পানি সংগ্রহশালা, ভোজ্য তেল তৈরির মেশিন, শস্য রাখার পাত্র, ইত্যাদি নানা ইতিহ্যবাহী জিনিস। ভিতরে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। আপনারা চাইলে দুপুরের খাবার বাগানে বসে খেতে পারেন। ব্যাপারটা দারুন হবে।

এখানে আরো রয়েছে প্রায় ১৫০ বছরের পুরানো একটি বাড়ি। মিউজিয়ামে ঢুকা ফ্রী হলেও পুরোনো তিনতলা এই বাড়িতে ঢুকতে ৫০ রুপীর টিকেট কাটা লাগে। ঢুকেই দেখবেন রান্না ঘর আর কিছু মহিলা চাল থেকে হুইস্কি বানাচ্ছে। আপনে চাইলে কিনতে পারেন। সিঁড়ি বেয়ে ঘরটির বিভিন্ন ফ্লোর পরিদর্শন করতে পারেন। একেক ফ্লোরে একেক ধরনরে জিনিস সাজানো রয়েছে। বেড রুম, খাবার রুম, তীর ধনুক, যুদ্ধ সরঞ্জাম, ইত্যাদি নানা অতিহ্যবাহী জিনিস রয়েছে সেখানে। সিঁড়িদিয়ে উঠার সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আর ভিতরে কোনো জিনিস হাত দিয়ে ধরবেন না। এগুলা অনেক পুরানো তাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর পাশেই রয়েছে ভুটানের জাতীয় গ্রন্থাগার, বিভিন্ন হেরিজেট শপিং মল। আপনারে চাইলে সেখানে যেতে পারেন।

ভুটান রয়েল প্রসাদ

ভুটানের রাজার প্রসাদ (Bhutan Royal Palace) কে ভুটানিরা Tashichhoe Dzong বা Thimpu Dzong ও বলে। এটি রাজার অফিসিলাল প্রধান রাজ প্রাসাদ। অবশ্য প্রত্যেক ডিস্ট্রিক্ট বা শহরেই রাজার একটা করে প্রাসাদ রয়েছে। সেগুলা অবশ্য এত বড় না, ছোট ছোট। কেবল পুনাখা শহরের টা একটু বড়। আপনি শুধুমাত্র রাজ মেহমান হলেই ভিতরে প্রবেশ করতে পারবেন।

থিম্পু শহর এ কোথায় কেনাকাটা করবেন

থিম্পু শহরের মাঝখান দিয়ে যে প্রধান সড়ক টি চলে গেছে তার আসে পাশে বেশ কিছু মার্কেট, দোকান রয়েছে যেগুলা থেকে আপনে চাইলে কিছু কিনতে পারেন। তবে ভুটানের সবকিছুই আসে অন্য দেশ থেকে তাই সেখানে তেমন কিছু না কেনাই ভাল। কেননা দাম অনেক বেশি। তবে থিম্পু তে ইমিগ্র্যাশন অফিসের কাছে নরজিন ল্যাম এ আমাদের ফুটপাথের মতো, বিশাল লম্বা একটা লোকাল মার্কেট রয়েছে। দোকানগুলো সব ছোট ছোট আমাদের টং এর দোকানের মতো, আপনার মনে হতে পারে ঢাকার বস্তি। এইখান থেকে আপনে তাদের স্থানীয় কিছু প্রোডাক্ট কিনতে পারেন।

থিম্পু শহর কিভাবে যাবেন

থিম্পু যেতে হলে প্রথমেই আপনাকে আসতে হবে ভুটান। ভুটান বাংলাদেশিদের জন্য অন অ্যারাইভাল ভিসা প্রদান করে। মানে আপনে ভুটান গেলেই ওরা আপনাকে ভিসা দিবে। তাই আগে থেকে ভিসার জামেলা নাই। বাংলাদেশ থেকে ভুটান আকাশ পথে এবং সড়ক পথে দুই ভাবেই যাওয়া যায়। তবে সড়ক পথে গেলেই বেশি মজা। ভুটানে বিভিন্ন শহরে প্রবেশ করার জন্য আলাদা করে পারমিশন নিতে হয়। ভিসা নেয়ার সময় থিম্পুর জন্য পারমিশন নিয়ে নিবেন।

সড়ক পথ

বাংলাদেশের সাথে ভুটানের সরাসরি কোনো বর্ডার নাই, তাই ভারত হয়েই আপনাকে ভুটান যেতে হবে। এর জন্য প্রথমেই আপনাকে নিতে হবে ভারতের ট্রানজিট ভিসা। ঢাকা থেকে বুড়িমারী/চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্ত দিয়া ভারতে প্রবেশ করে ওইখান থেকে বাস বা ট্যাক্সি করে ভুটান বর্ডার জয়গাঁ/ফুন্টশোলিং দিয়ে ভুটানে প্রবেশ করবেন। (চ্যাংড়াবান্ধা, জয়গাঁ – ভারতে)। ফুন্টশোলিং থেকে থিম্পুর দুরুত্ব প্রায় ১৭০ কিলোমিটার। ফুন্টশোলিং থেকে থিম্পু বাস বা ট্যাক্সি তে যাওয়া যায়। শেষ বাস ছাড়ার সময় বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট, ভাড়া ২৪০ রুপি, সময় লাগবে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা। তবে ট্যাক্সি তে যাওয়াই ভাল, তাহলে কোনো জায়গা ভাল লাগলে নেমে ছবি তুলতে পারবেন, সময় কম লাগবে।

আকাশ পথ:

বাংলাদেশ থেকে ভুটানে একটা মাত্র কোম্পানিই ফ্লাইট পরিচালনা করে। তাও সপ্তাহে কয়েকদিন। তাই প্লেনে যেতে চাইলে আপনার ভ্রমণ তারিখের সাথে মিলিয়ে টিকেট কনফার্ম করবেন। প্লেন আপনাকে পারো শহরে নামবে। পরে সেখান থেকে ট্যাক্সিতে থিম্পু চলে আসবেন।

থিম্পু শহর এ কোথায় থাকবেন

থিম্পুতে বেশির ভাগ হোটেল, রেস্টুরেন্ট ক্লক টাওয়ার স্কয়ার এর আশেপাশে অবস্থিত। এখানে বিভিন্ন ধরণের, মানের হোটেল রয়েছে। আপনার বাজেট অনুসারে দরদাম করে একটা ঠিক করে নিন। ৮০০/১৫০০ রুপির মধ্যে ভালো মানের হোটেল পাবেন। তবে গিজার আর ইন্টারনেট আছে কিনা দেখে নিবেন। মনে রাখবেন ভুটানে দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট সব কিছুই রাত ৭:৩০ থেকে ৮:৩০ এর মধ্যে বন্ধ হয় যায় । তাই হোটেল বা রুম ঠিক না করলে আর ডিনার না করে নিলে ঝামেলায় পড়তে পারেন। ভালো হয় ঢাকা থেকেই প্রথম দিনের হোটেল বুক করে নিলে।

থিম্পুতে কোথায় খাবেন, কি খাবেন

আপনে যে হোটেলে উঠেছেন তাদের রেস্টুরেন্ট থাকলে সেখানে খাবার খেয়ে নিতে পারেন। অথবা বাহিরে গিয়ে অন্য রেস্টুরেন্ট এ ও খেতে পারেন। ভুটানের স্থানীয় খাবার আপনার ভালো না লাগার সম্ভবনা বেশি। তাই ইন্ডিয়ান পরিচিত খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। ভুটানে প্রচুর ফ্রেস ফল পাওয়ায় যায়। চেষ্টা করবেন সেগুলা বেশি বেশি খেতে। সকালে কয়েকটা করে ডিম খেয়ে নিন। এতে সারাদিনের জন্য ভালো এনার্জি পাবেন।

5 3 ভোট
রেটিং

লেখক

রাশেদুল আলম

আমি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ট্রাভেল ফটোগ্রাফার। তথ্য-প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করলেও ঘুরে বেড়াতে ভীষণ ভালোবাসি। নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান কে এই ওয়েব সাইটে নিয়মিত শেয়ার করার চেষ্টা করি।

3 মন্তব্য
Inline Feedbacks
সব মন্তব্য দেখুন
3
0
আমরা আপনার অভিমত আশা করি, দয়াকরে মন্তব্য করুনx
()
x