থিম্পু শহর

থিম্পু (Thimphu) ভুটানের রাজধানী এবং দেশের সব থেকে বড় শহর। এটি ভুটানের পশ্চিম অংশে, হিমালয় পর্বতমালার একটি উঁচু উপত্যকায় অবস্থিত। অতীতে এটি দেশের শীতকালীন রাজধানী ছিল। ১৯৬২ সাল থেকে একে দেশের রাজধানী এবং স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত করা হয়। পাহাড় ঘেরা থিম্পু খুবই সুন্দর।

থিম্পুতে ঘুরার মতো অনেক জায়গা আছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু, তাজ তাশি বা তাজ হোটেল, ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম, কিংস মেমোরিয়াল চড়টেন, ক্লক টাওয়ার স্কয়ার, সীমতখা ডিজং, ন্যাশনাল তাকিন সংরক্ষিত চিড়িয়াখানা, পার্লামেন্ট হাউস, রাজপ্রাসাদ, লোকাল মার্কেট, ন্যাশনাল স্কুল অব আর্টস, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, বিবিএস টাওয়ার ছাড়া আরো অনেক কিছুই।

ক্লক টাওয়ার স্কয়ার
ক্লক টাওয়ার স্কয়ার (Clock Tower Square) থিম্পুর একটি খুবই পরিচিত স্থান। একে থিম্পু টাইম স্কয়ার ও বলা হয়। এটা থিম্পুর নরজিম ল্যাম এ অবস্থিত। এর পাশেই রয়েছে ফুটবল স্টেডিয়াম। এখানে একটি উঁচু টাওয়ার রয়েছে যার মাথার চার দিকে আছে চার টি বড় বড় ঘড়ি। টাওয়ার এর সামনে বেশ ফাঁকা জায়গা রয়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান এখানে অনুষ্ঠিত হয়। এই স্থানটি থিম্পুর সেন্ট্রাল পয়েন্ট এবং গুরুত্ব পূর্ণ স্থান হিসাবে ধরা হয়। এর আশেপাশে রয়েছে প্রচুর দোকান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট। প্রচুর কবুতর এখানে ঘুরে বেড়ায়।

তাজ তাশি বা তাজ হোটেল
থিম্পুর সব থেকে সুন্দর ভবন তাজ তাশি বা তাজ হোটেল (Taj Tashi Hotel)। তাজ তাশি থিমম্পুর সব থেকে সুন্দর স্থাপনা। এটি ভারতীয় হোটেল জায়ান্ট তাজ হোটেল এবং ভুটানের তাশি গ্রূপ এর একটি জয়েন্ট প্রজেক্ট। এটা ভুটানের প্রথম ফাইভ স্টার হোটেল। তাজ হোটেল ২০০৪ সালে প্রথম চালু হয়। হোটেলটিতে একটি বিশাল সম্মেলন কক্ষ ও রয়েছে। ভবনটি আসলেই অনেক সুন্দর এবং বিশাল।

এর পর পায়ে হেঁটে আশে পাশের আরো কিছু স্থান দেখে ট্যাক্সি ভাড়া করে নিতে পাবেন থিম্পুর বাকি সব স্থাপনা গুলা দেখানোর জন্য। আপনারা দরদাম করে, কোথায় কোথায় যাবেন তা বলে নিবেন। তবে সব থেকে ভাল হয় থিম্পুতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানের জন্যই শুধু ট্যাক্সি ভাড়া করা। ঘুড়াঘুড়ি শেষ করে আবার ওই স্থান থেকে ট্যাক্সি নিবেন। তাহলে খরচ একটু কম হবে। থিম্পুতে ট্যাক্সি আমাদের ঢাকার রিক্সার মতো , সব জায়গায়, সব সময়ই পাওয়া যায়। ট্যাক্সি করে থিম্পু শহর ঘুরে আমাদের অনেক ভাল লাগে। থিম্পু আসলেই অনেক সুন্দর একটা শহর। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চোটেন
ন্যাশনাল মেমোরিয়াল চোটেন (National Memorial Chorten) মূলত একটি স্মৃতিস্তম্ভ। ভূটানের তৃতীয় রাজা জিগমে দরজি ওয়াঙচুকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৭৪ সালে এই স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। এর ভেতরের বিভিন্ন পেইণ্টিং এবং স্ট্যাচু বৌদ্ধ ফিলোসফির প্রতিবিম্ব রয়েছে। এটি থিম্পু শহরের দেওবুম ল্যাম এ অবস্থিত। এটি বর্তমানে ভুটানের সব থেকে পরিচিত ধর্মীয় স্থান। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান এখানে রাষ্ট্রীয় ভাবে উদযাপন করা হয়। পূর্বে এখানে প্রবেশ ফ্রি থাকলেও এখন ৩০০ রুপী দিয়ে টিকেট কাটা লাগে।

বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু
বুদ্ধ দর্দেনমা স্ট্যাচু (Buddha Dordenma Statue) হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে বড় বুদ্ধ মূর্তি যা ভুটানের থিম্পু শহরের এক পাহাড়ের চুড়ায় অবস্থিত। দূর থেকেই দেখা যাবে পাহাড়ের উপর বিশাল এক মূর্তির। এটি সোনালী রঙের। সূর্যের আলো পড়ে আরো চক চক করতে থাকে। কাছে যেতেই অবাক হবেন, এতো বিশাল মূর্তি বানালো কিভাবে!! এর চারপাশে আছে আরো অনেক গুলো ছোট ছোট মূর্তি। সব গুলোই সোনালী রঙের।

বোদ্ধের মূর্তির নিচে আছে পার্থনাগার। ঐটার ভেতরে জুতা খুলে ঢুকতে হয় এবং ফটোগ্রাফি নিষিদ্ধ। বাহির যতটা না সুন্দর ভেতরটা আরো বেশি সুন্দর। ছোট ছোট অনেক গুলো বোদ্ধ মূর্তি রয়েছে ভেতরে যা শোকেচে সাজানো। পুরো ইন্টেরিওর সোনালী রঙের অন্য রকম সুন্দর। সেখানে একটা কাহিনী প্রচলিত আছে। তাদের কোন এক রাজা যিনি মারা গেছেন, নাকি আসে এখানে আর এখানকার প্রধান সাধকের সাথে কথা বলেন। সবাই অবশ্য তারে দেখতে পায়না।

ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম
থিম্পু ফোক হেরিটেজ মিউজিয়াম (Folk Heritage Museum) ভুটানের ঐতিহ্য আর প্রাচীন গ্রামীণ জীবনের প্ৰতিচ্ছবি। মিউজিয়ামে গেলে আপনে সহজেই ভুটানের ইতিহাসের সাথে পরিচিত হতে পারবেন। এটি ২০০১ সালে ভুটানের রানী মাতা প্রতিষ্ঠা করেন। ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে সুন্দর একটা বাগান যা নানান রকমের গাছপালায় ভরপুর, বসার জন্য টেবিল, চেরার। ভিতরের পরিবেশ খুবই সুন্দর। এখানে রয়েছে আগের দিনের উইন্ড মেইল, পানি সংগ্রহশালা, ভোজ্য তেল তৈরির মেশিন, শস্য রাখার পাত্র, ইত্যাদি নানা ইতিহ্যবাহী জিনিস। ভিতরে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। আপনারা চাইলে দুপুরের খাবার বাগানে বসে খেতে পারেন। দারুন হবে ব্যাপারটা।

এখানে আরো রয়েছে প্রায় ১৫০ বছরের পুরানো একটি বাড়ি। মিউজিয়ামে ঢুকা ফ্রী হলেও পুরোনো তিনতলা এই বাড়িতে ঢুকতে ৫০ রুপীর টিকেট কাটা লাগে। ঢুকেই দেখবেন রান্না ঘর আর কিছু মহিলা চাল থেকে হুইস্কি বানাচ্ছে। আপনে চাইলে কিনতে পারেন। সিঁড়ি বেয়ে ঘরটির বিভিন্ন ফ্লোর পরিদর্শন করতে পারেন। একেক ফ্লোরে একেক ধরনরে জিনিস সাজানো রয়েছে। বেড রুম, খাবার রুম, তীর ধনুক, যুদ্ধ সরঞ্জাম, ইত্যাদি নানা অতিহ্যবাহী জিনিস রয়েছে সেখানে। সিঁড়িদিয়ে উঠার সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আর ভিতরে কোনো জিনিস হাত দিয়ে ধরবেন না। এগুলা অনেক পুরানো তাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এর পাশেই রয়েছে ভুটানের জাতীয় গ্রন্থাগার, বিভিন্ন হেরিজেট শপিং মল। আপনারে চাইলে সেখানে যেতে পারেন।

ভুটান রয়েল প্রসাদ
ভুটানের রাজার প্রসাদ (Bhutan Royal Palace) কে ভুটানিরা Tashichhoe Dzong বা Thimpu Dzong ও বলে। এটি রাজার অফিসিলাল প্রধান রাজ প্রাসাদ। অবশ্য প্রত্যেক ডিস্ট্রিক্ট বা শহরেই রাজার একটা করে প্রাসাদ রয়েছে। সেগুলা অবশ্য এত বড় না ছোট ছোট। কেবল পুনাখা শহরের টা একটু বড়। শুধুমাত্র রাজ মেহমান হলেই ভিতরে প্রবেশ করতে পারবেন।

থিম্পুতে কেনাকাটা কোথায় করবেন?
থিম্পু শহরের মাঝখান দিয়ে যে প্রধান সড়ক টি চলে গেছে তার আসে পাশে বেশ কিছু মার্কেট, দোকান রয়েছে যেগুলা থেকে আপনে চাইলে কিছু কিনতে পারেন। তবে ভুটানের সবকিছুই আসে অন্য দেশ থেকে তাই সেখানে তেমন কিছু না কেনাই ভাল। কেননা দাম অনেক বেশি। তবে থিম্পু তে ইমিগ্র্যাশন অফিসের কাছে নরজিন ল্যাম এ আমাদের ফুটপাথের মতো, বিশাল লম্বা একটা লোকাল মার্কেট রয়েছে। দোকানগুলো সব ছোট ছোট আমাদের টং এর দোকানের মতো, আপনার মনে হতে পারে ঢাকার বস্তি। এইখান থেকে আপনে তাদের স্থানীয় কিছু প্রোডাক্ট কিনতে পারেন। তবে পারোতে টাইগার নেস্টের কাছেও এমন একটা মার্কেট আছে। হাতের তৈরী জিনিসপত্র ঐখান থেকে কিনলে ভালো হয়। ওই গুলা আরো সস্তা।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। ভুটান ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *