লাদাখ ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের একটি অঞ্চল। এর উত্তরে কুনলুন পর্বতশ্রেণী এবং দক্ষিণে হিমালয় পর্বতমালা। এই এলাকার অধিবাসীরা ইন্দো-আর্য এবং তিব্বতী বংশোদ্ভুত। একসময় বালটিস্তান উপত্যকা, সিন্ধু নদ উপত্যকা, নুব্রা উপত্যকা, জাংস্কার, লাহুল ও স্পিটি, রুদোক ও গুজ ইত্যাদি এলাকা লাদাখের অংশ ছিল। কিন্তু বর্তমানে লাদাখ শুধুমাত্র লেহ জেলা ও কার্গিল জেলা নিয়ে গঠিত।

magnetic hill in ladakh
ম্যাগনেটিক হিল

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৮ লেহ। লাদাখে আজ আমাদের দ্বিতীয় দিন। গতকাল সকালেই আমরা ঢাকা থেকে লাদাখের লেহ শহরে এসেছি। আমরা কিভাবে এখানে আসলাম তা আমার আগের পোস্টে বিস্তারিত দেয়া আছে। এখানে আমাদের হোটেল নিউ টাউন এলাকায়। হোটেলটি মোটামোটি ভালই। ওয়াইফাই, গরম পানি, টিভি ইত্যাদি সব কিছুই রয়েছে। সকালের নাস্তা আর রাতের খাবার সহ ডিলাক্স ডাবল বেডের প্রতিরুমের ভাড়া ১৫০০ রুপি। AMS থেকে বাঁচতে কাল সারাদিন আমরা হোটেলে ঘুমিয়েই কাটিয়েছি। শুধুমাত্র সন্ধ্যার পর একটু মার্কেটে ঘুরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু আসার পথে আমাদের টিমের কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পরে। সাথেসাথেই হাসপাতাল নিয়ে যাই। ভাগ্য ভাল তেমন মেজর কোনো সমস্যা হয় নাই। তাই হোটেলে নিয়ে আসি। আসার পথে ১২০০ রুপি দিয়ে একটি অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে নেই।

রাতে বেশ ঠান্ডা পড়েছিল। সকালে তার থেকে আরো বেশি ঠান্ডা। এই ঠান্ডার মাঝেও গোসল করে রেডি হয়ে নেই। ৯ তার দিকে আমাদের গাড়ি চলে আসবে। আজ সকালে সবাই মোটামোটি সুস্থ এবং বাহিরে যাবার জন্য প্ৰস্তুত। আজ আমাদের লেহ সাইটসিং করার প্ল্যান আছে। তার আগে চলুন লাদাখ সম্পর্কে জেনে নেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

লাদাখের ইতিহাস
লাদাখের ইতিহাস খুবই করুন। বিভিন্ন রাজা বিভিন্ন সময় লাদাখ আক্রমণ করে এবং শাসন করে। যার ফলে লাদাখের আয়তন কখনো সংকুচিত আবার কখনো প্রসারিত হতে থাকে। সর্ব শেষ ১৮৩৪ সালে কাশ্মীরের ডোগরা সেনাপতি জোরাওয়ার সিং কাহলুরিয়া লাদাখ আক্রমণ করে একে কাশ্মীরের অন্তর্ভুক্ত করে। ১৮৫০ সাল থেকে লাদাখে ইউরোপীয়দের আনাগোনা শুরু হয়। খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ১৮৮৫ সালে লেহ শহরে দপ্তর খোলা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলে কাশ্মীরের ডোগরা শাসক হরি সিং অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে সই করে। যার ফলে কাশ্মীর রাজ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। তখন পাকিস্তান লাদাখ ও কাশ্মীরের অনেক অংশ দখল করে নেয়। এর ফলে প্রথম ভারত -পাকিস্তান যুদ্ধের সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়। লাইন অফ কন্ট্রোল (LOC ) জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভক্ত করে। এর ফলে কাশ্মীরের ১/৩ অংশ এলাকা চলে যায় পাকিস্তানের কাছে যার নাম এখন আজাদ কাশ্মীর। আর বাকি এলাকা থাকে ভারতের কাছে। অপরদিকে লাদাখের গিলগিত-বালতিস্তান এলাকা চলে যায় পাকিস্তানের কাছে। আর লেহ এবং কার্গিল জেলা থাকে ভারতের কাছে।

লাদাখের দর্শনীয় স্থান সমূহ
লাদাখের দর্শনীয় স্থান গুলোর মাঝে নুব্রা ভ্যালি, প্যাংগং লেক, খারদুংলা পাস, তুর্তুক গ্রাম, মুনল্যান্ড, লেহ সাইট সিং উল্ল্যেখযোগ্য। লেহ সাইট সিং মানে লেহ শহরে আশে পাশের দর্শনীয় স্থান সমূহ দেখা। এই লেহ সাইট সিং এর মাঝে পরে সঙ্গম পয়েন্ট, গুরুদুয়ারা পাথর সাহেব, হল অফ ফেম, শান্তি স্তুপা, লে প্যালেস, সে প্যালেস, থিকসে মনাস্ট্রি, থ্রি ইডিয়টস স্কুল ইত্যাদি। এগুলার জন্য মোটামোটি একদিন হলেই চলে এবং কোন পারমিশন এর দরকার নাই। লেহ সাইট সিং এর জন্য গাড়ি ভাড়া নিবে ২৫০০ রুপি। তবে নুব্রা ভ্যালি, প্যাংগং লেক, খারদুংলা পাস যাবার জন্য সব দেশের (ইন্ডিয়ান সহ) নাগরিকদের লেহ ডিসি অফিস থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সহ আরো কিছু দেশের জন এই অনুমতি দেয়া লেহ ডিসি অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। তাদেরকে নিজ দেশে অবস্থিত ইন্ডিয়ান হাইকমিশন থেকে অনুমতি নিতে হয়। নুব্রা ভ্যালি, প্যাংগং লেক, তুর্তুক গ্রাম যেতে হলে কমপক্ষে তিন দিন সময় লাগবে। খারদুংলা পাস নুব্রা ভ্যালি যাবার পথে পরে।

এই বিষয়ে অনুমতির জন্য একেক সময় একেক নিয়ম থাকে। একবার বন্ধ থাকে তো আবার খুলে। তাই যাবার আগে কোন জায়গা থেকে, কিভাবে নিতে হয় জেনে যাবেন। আমরা যখন যাই তখন এই অনুমতি বাংলাদেশীদের জন্য মোটামোটি বন্ধ ছিল। অনেক চেষ্টা করেও আমরা অনুমতি ম্যানেজ করতে পারিনাই। তবে লেহ তে কিছু দালাল আছে যারা ডিসি অফিস থেকে অনুমতি ম্যানেজ করে দেয় টাকার বিনিময়ে। এরা মূলত পরিচয় গোপন করে কলকাতার লোক হিসাবে নিয়ে যায়, যা খুবই রিক্সি। একবার ধরা পড়লে খবর আছে। আমাদেরকেও অনেকে এই অফার দিয়েছিল। তবে অন্য দেশের আইডেন্টিটি নিয়ে যেতে বিবেকে বাধা দিল। তাই আর ওই দিকে যাই নাই। যদি কখনো ওপেন করে তাহলে যাব একদিন। তবে খুশির খবর হচ্ছে এখন ঢাকা থেকে এই অনুমতি সহজে পাওয়া যায়। বসুন্ধরা ইন্ডিয়ান ভিসা এপ্লিকেশন সেন্টারে ৩০০ টাকার বিনিময়ে এই অনুমতি পাওয়া যায়। তার জন্য অবশ্য আপনার ইন্ডিয়ান ভিসা এবং তার মেয়াদ থাকতে হবে।

লেহ সাইটসিইং
লেহ জেলা আয়তনের দিক থেকে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা। প্রথম গুজরাট রাজ্যের কচ্ছ জেলা। লেহ শহর লেহ জেলার সদরদপ্তর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই শহর ৩,৫২৪ মিটার বা ১১,৫৬২ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এই শহর চারিদিকে হিমালয়ের পর্বত দ্বারা বেষ্টিত। এর আয়তন প্রায় ৪৫,১১০ বর্গ কিঃমিঃ। ২০০১ সালের হিসাব অনুযায়ী এই শহরের জনসংখ্যা প্রায় ২৭,৫১৩ জন।

সকালে আমরা লাদাখী রুটি, ডিম, গাজরের আচার, চা ইত্যাদি দিয়ে নাস্তা শেষ নেই। নাস্তা শেষ করেই দেখি আমাদের গাড়ি চলে এসেছে। ১০ টার পর পর আমাদের গাড়ি চলা শুরু করল। ড্রাইভার মুজাফ্ফর গাড়িতে লাদাখী গান চালু করে দিল। আমাদের প্রথম গন্তব্য ম্যাগনেটিক হিল। ও ভালো কথা লাদাখে এই গরম আবার এই ঠান্ডা। তাই সাথে সেভাবেই জামাকাপড় নিবেন। ঠান্ডা লাগলে পড়বেন, গরম লাগলে খুলে ফেলবেন। ঠান্ডার জন্য এরা দেরি করে ঘুম থেকে উঠে। সকাল সকাল বের হতে চাইলে রাতেই বলে দিবেন।

ম্যাগনেটিক হিল লাদাখ
ম্যাগনেটিক হিল বা গ্রাভিটি হিল হল এমন এক জায়গা যেখানে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে রাখলেও গাড়ি আপনা আপনি এগিয়ে চলে। এটি আসলে এক ধরণের অপটিক্যাল ইলুশন বা দৃষ্টি ভ্রম। মানে আশেপাশের পরিবেশ এমন একটি পরিস্থিতির তৈরী করে যাতে ঢালু রাস্তাকে উঁচু রাস্তা মনে হয়। বেপারটা খুবই ইন্টারেষ্টিং। নিজ চোখে দেখার জন্য আর ধৈর্য ধরতে পারতেছিলাম না। পৃথিবীতে এমন জায়গা বেশ কিছু আছে। লাদাখের লেহ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিঃমিঃ দূরে লেহ-শ্রীনগর হাইওয়ে তে রয়েছে এমন একটি ম্যাগনেটিক হিল। যেখানে গাড়ি প্রায় ২০ কিঃমিঃ/ঘন্টা বেগে সামনে এগিয়ে যায়। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১৪,০০০ ফুট।

অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা চলে আসলাম ম্যাগনেটিক হিল (Magnetic Hill Ladakh)। দাগকাটা নির্ধারিত জায়গায় আসা মাত্রই ড্রাইভার স্টার্ট বন্ধ করে দিল। আর গাড়ি আপনা আপনিই সামনে এগিয়ে যেতে লাগল। যদিও সামনের রাস্তাটি উঁচু হবার কারণে গাড়িটি পিছনে যাওয়ার কথা। বেপারটা দারুন লাগল। জায়গাটি খুবই অসাধারণ। দুই পাশের সোনালী রঙের পাহাড় আর তার মাঝ দিয়ে সোজা কাল রঙের পিচ্ ঢালা পথ দেখতে দারুন। ছবি তোলার জন্য দারুন এক জায়গা। আমরা নেমে প্রচুর ছবি তুললাম, রাস্তায় গড়াগড়ি দিলাম। এখানে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। চাইলে নাস্তা করতে পারেন। আর এখানে কোয়াড বাইকিং এর ব্যবস্থা আছে। টাকা দিয়ে চালাতে পারেন, দারুন এক্সসাইটিং।

সঙ্গম পয়েন্ট
এর পর আমরা ম্যাগনেটিক হিল থেকে আরো প্রায় ৫ কিঃমিঃ সামনে এগিয়ে গেলাম। জায়গাটির নাম সঙ্গম পয়েন্ট। এখানে আসলে লাদাখের দুই নদী ইন্দুস আর জান্সকার এসে মিলিত হয়েছে। মূল জায়গাটি বেশ নিচুতে। আমরা একদম নিচে নদীর কাছে চলে গেলাম। জায়গাটি খুবই চমৎকার। নদীর জল ঘোলাটে এবং শীতল। এখানে রাফটিং করার ব্যবস্থা আছে। সময় থাকলে চেষ্টা করতে পারেন। এখানে কিছু লাদাখী জিনিসপত্র পাওয়া যায়। কিনতে পারেন। এখানে কিছু সময় অতিবাহিত করে আমরা আবার লেহ শহরের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। একটু উপরে উঠে আমরা আবার সঙ্গম ভিউ পয়েন্টে নেমে আরো কিছু ছবি তুললাম। উপর থেকে সঙ্গম পয়েন্ট এর ভিউ আরো সুন্দর।

সঙ্গম পয়েন্ট, সেপ্টেম্বর ১৭: দুপুর ১২: ২৫

গুরুদোয়ারা পাথর সাহেব
লেহ তে ফিরার পথে আমরা গেলাম শিখ ধর্মালম্বিদের এক ধর্মীয় স্থানে। এটি লাদাখের লেহ শহরের কাছে প্রায় ১২০০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। ১৫১৭ সালে শিখদের প্রথম গুরু, গুরু নানক লাদাক এসেছিলেন। উনার সম্মানেই সেই সময়ে এটি বানানো হয়। এখানে সব সময় ফ্রিতে খাবার পরিবেশন করা হয় যাকে লঙ্গর বলে। সময় তখন দুপুর। আর ডিসকভারি চ্যানেলে এগুলা অনেক দেখেছি, তাই কৌতহলবসত ভিতরে প্রবেশ করি। জুতা খুলে প্রবেশ করতেই তারা হলুদ কাপড় দিয়ে দিলো মাথায় বাধার জন্য। কাপড় মাথায় বেঁধে নিলাম। পথেই এমন ভাবে পানি দিয়ে রাখছে যাতে ওই পানিতে না পাড়া দিয়ে সামনে কেউ আগাতে না পারে। পা ধুয়ে সামনে এগিয়ে প্লেট নিয়ে বসে গেলাম, একটু পরেই খাবার দিয়ে দিলো। এখানে খেয়ে নিজের প্লেট নিজেই পরিষ্কার করে রাখতে হয়।

এখানে একটা জিনিস বেশ ভালো লেগেছে। আমাদের দেশে সাধারণত কোন বাবার মাজারে যত টাকা পয়সা উঠে তার সব কিছুই বাবার লোকজন ভোগ করে। কেবল বছরে একবার আমজনতাকে খিচুড়ি খাওয়ায়। আর এরা দানের সব কিছু দিয়ে প্রতিদিন আগত মানুষদের ভোজন করায়। পাশেই আর্মি ক্যাম্প থাকায় প্রচুর আর্মির লোকদেরও দেখলাম খাবার খেতে এবং স্বেচ্ছায় সেবা করতে। আর্মিরাই সব কিছু ম্যানেজ করে। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। যাই হোক খাবারের টেস্ট কিন্তু তেমন একটা ভালো ছিলনা। ফ্রি বলে না, লাদাখের খাবার আসলে এমনই। আপনারাও এখান থেকে অবশ্যই লাঞ্চ করে নিবেন।

হল অফ ফেম
এর পর আমরা গেলাম হল অফ ফেম এ। এটি আসলে একটি আর্মি মিউজিয়াম। ইন্ডিয়ান আর্মিদের বিভিন্ন যুদ্ধের স্মৃতি, অস্ত্র, ট্যাঙ্ক, সাজুয়াজান ইত্যাদি এখানে সাজানো রয়েছে। ভিতরে প্রবেশ করতে ২০রুপির টিকেট কাটা লাগে। সময় কম থাকায় আমরা কেবল বাহির থেকেই ছবি নিয়ে চলে আসি। এখানে একটা জিনিস খুব ভালো লাগল। মূলফটকেই আর্মির সোলজাররা অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা ছবি তুলছি দেখে তারা আস্তে করে দুইপাশে চলে গেল। ব্যারটা একটু অন্যরকম লাগল।

থিকসে মনাস্ট্রি
এর পর আমরা গেলাম থিকসে মনাস্ট্রি তে। এটি লেহ শহর থেকে প্রায় ২০ কিঃমিঃ দূরে লেহ-মানালি হাইওয়েতে অবস্থিত। প্রায় ৬০০ বছর পুরানো এবং ১২ তলা বিশিষ্ট থিকসে মনাস্ট্রি লাদাখি স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। ভিতরে প্রবেশ করতে ৩০রুপির টিকেট কাটা লাগে। থিকসের প্রধান আকর্ষণ হল দোতলা সমান বৌদ্ধ মূর্তি যা ১৯৭০ সালে নির্মিত হয়েছিল দালাই লামার থিকসে আগমন উপলক্ষে। এখানে আরো রয়েছে অসংখ্য স্তূপ, থাংকা, দেওয়ালচিত্র, মূল্যবান পুঁথি ও মন্দির। আমরা টিকেট কেটে ভিতরে প্রবেশ করি এবং বিভন্ন কক্ষ পরিদর্শন করি। সিঁড়িদিয়ে আমরা একদম ছাদে উঠে যাই। ছাদ থেকে আশেপাশের ভিউ অস্থির সুন্দর। এর পর আমরা আবার লেহ শহরের দিকে ফিরতে থাকি।

Thikse Monastery leh
থিকসে মনাস্ট্রি, সেপ্টেম্বর ১৭: দুপুর ০৩: ৪০

থ্রি ইডিয়টস স্কুল
এর পর আমরা গেলাম আমির খানের সেই বিখ্যাত মুভি “থ্রি ইডিয়টস” এর থ্রি ইডিয়টস স্কুলে। থ্রি ইডিয়টস মুভির কারণে এটি এখন একটি ভাল ট্যুরিস্ট স্পট। স্কুল কতৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ট্যুরিস্টদের জন্য নির্ধারিত সময়ে মুভির শুটিং স্পট গুলো ভিসিট করা যায়। আমরা ভিতরে প্রবেশ করে সেই বিখ্যাত ইডিয়টিক ওয়াল এর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলি এবং স্কুলের বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করি। এখানে একটি ক্যাফে রয়েছে যেখানে নানান ধরণের খাবার পাওয়া যায়। আমরা দুপুরের লাঞ্চ এখানেই সেরে ফেলি। এখানকার খাবার একদম ফ্রেশ, অসাধারণ তার টেস্ট। স্কুলের গেইটের বাহিরের দিকটাও অনেক সুন্দর। ছোট ছোট সাদা রঙের স্থাপনাগুলো অসাধারণ।

সে প্যালেস
ফিরার পথে এর পর আমরা গেলাম সে প্যালেস (Shey Palace Leh) এ। এটি লেহ শহর থেকে প্রায় ১৫ কিঃমিঃ দূরে লেহ-মানালি হাইওয়েতে সে গ্রামে অবস্থিত। একসময় এটি লাদাখের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী ছিল। লাদাখের রাজা, দেলদান নামগয়াল ১৬৫৫ সালে এটি নির্মাণ করেন। তিনি একই বছর তার বাবার স্মরণে এখানে একটি মনাস্ট্রি তৈরী করেন, যা সে মনাস্ট্রি (Shey Monastery) নামে পরিচিত। দুইটা এক সাথে সে প্যালেস কমপ্লেক্স নাম পরিচিত। পুরা কমপ্লেক্স একটি টিবির উপর অবস্থিত। প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক আসে একে দেখার জন্য। বাহির থেকে দেখতে অনেকটা সিরিয়ার বিদ্ধস্ত কোনো প্রাসাদের মতো মনে হলেও সে প্যালেস খুবই সুন্দর।

লেহ প্যালেস
এর পর আমরা গেলাম লেহ প্যালেস (Leh Palace) এ। এটি লেহ শহরে এক পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। তিব্বতের পাতলা প্যালেসের (Potala Palace) আদলে নির্মিত ৯ তলা এই ভবনটি এক সময় লাদাখ রাজ্যের রয়েল প্যালেস ছিল। লাদাখের রাজা সেনজ্ঞে নামগয়াল ১৬ শতকে এটি নির্মাণ করেন। সব থেকে উপরের তলায় রয়েল পরিবার বসবাস করত। আর নিচের দিকে ছিল ষ্টোর রুম, অশ্বশালা ইত্যাদি। বর্তমানে এটি মিউজিয়াম এবং প্রবেশ ফি দিতে হয়। লেহ প্যালেস এর ছাদ থেকে লেহ শহর এবং আশেপাশের এলাকার সুন্দর প্যানোরোমিক ভিউ পাওয়া যায়।

Leh Palace
লেহ প্যালেস, সেপ্টেম্বর ১৭: দুপুর ০৫: ৪০

শান্তি স্তুপা
এর পর আমরা গেলাম লেহ শহরে অবস্থিত বৌদ্ধ ধর্মের এক ধর্মীয় স্থানে, যার নাম শান্তি স্তুপা (Shanti Stupa)। এটি ১৯৯১ সালে জাপানিরা নির্মাণ করেন। প্রায় ১১,৮৪১ ফুট উপরে অবস্থিত সাদা রঙের এই স্তুপা দেখতে দারুন সুন্দর। এখান থেকে পুরা লেহ শহরের সুন্দর এবং আশেপাশের এলাকার দারুন প্যানোরোমিক ভিউ পাওয়া যায়। এর রাতের সৌন্দর্য কোন অংশে কম নয়। তাই বিকালে গেলে ভালো, যাতে একসাথে দিন-রাতের ফ্লেভার পাওয়া যায়। একেবারে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে প্রচুর বাতাস, যার ফলে মারাত্মক ঠান্ডা। আমরা সন্ধ্যার আগে যাই এবং সন্ধ্যার পর আরো কিছুক্ষন থাকি। তখন তাপমাত্রা কম করে হলেও মাইনাস ৪-৫ ডিগ্রী হবে। ঠান্ডায় একেকজন রীতিমতো থর থর করে কাঁপতেছিলাম। উচ্চতার কারণে AMS এর সমস্যা হয়। গাড়ি থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে উঠা লাগে। তাই সাবধানে থাকবেন। তবে এতো প্রতিকুল হলেও লেহ গেলে কোনো ভাবেই একে না দেখে চলে আসবেন না।

লেহ মার্কেট
এর পর আমরা রুমে চলে আসি। ফ্রেশ হয়ে আবার চলে যাই লেহ সিটি মার্কেটে (Leh City Market)। এটি লাদাখ এলাকার প্রধান এবং সব থেকে বড় মার্কেট। মার্কেট টি দেখে খুবই সুন্দর এবং পরিষ্কার। দুই পাশে সারি সারি দোকান, মাঝখানে ফাঁকা, যেখানে বেশ কিছু বেঞ্চ দেয়া আছে বসার জন্য। দেখে মনে হবে যেন ইউরোপের কোনো স্থান । এখানে ভালো মানের উলের কাপড় এবং স্থানীয় হস্তশিল্প আইটেম পাওয়া যায়। শান্তি স্তুপায় ঠান্ডা খেয়ে আমরা সবাই এখন থেকে আরো কিছু শীতের কাপড় কিনে নেই। দাম ও খুব একটা বেশি না।

এখানে my father was in Ladakh, my brother was in Ladakh, my sister was in Ladakh ইত্যাদি নানান ধররের লেখা সম্বলিত টিশার্ট পাওয়া যায়। দাম ৩০০-৪০০ রুপি। আমরা কয়েকটা কিনে নিলাম। এখানকার আপেলের টেস্ট কিন্তু দারুন, খেতে মিস করবেন না। অনেক্ষন ঘুরাঘুরি করে ক্লান্ত, তাই ভাবলাম চা বা কফি কিছু খাই। পাশের এক চা দোকানে গেলাম চা খেতে। এদের চা বানানোর সিস্টেম দেখে পুরাই অবাক। এরা আমাদের মতো চা পাতা পানিতে দিয়ে সারাক্ষন জাল দিতে থাকেনা। কেউ অর্ডার করলে তার জন্য যে পরিমান দরকার সে পরিমান পানি দিয়ে তখনই চা বানিয়ে দেয়। এবং বানানো শেষে চুলা বন্ধ করে রাখে। এখানকার সব রেস্টুরেন্ট এর খাবারের সিস্টেমও একই। অর্ডার করার পরেই তরকারি নতুন করে রান্না করে। একটু সময় লাগে, কিন্তু সব কিছু একদম ফ্রেশ।

লেহ তে সবাই সকাল সকাল ঘুমিয়ে পরে, দোকান পাট মোটামোটি ৮ থেকে ৮:৩০ আর মাঝেই বন্ধ হয়ে যায়। তাই আর দেরি না করে হোটেলে ফিরে আসি। এসে মুরগি, ডিম, সবজি, ডাল আর ভাত খেয়ে নেই। আমাদের হোটেলের ম্যানেজার মুসলিম। তাই তাকে আগেই বলে দিয়েছিলাম আমাদের সব কিছু যাতে মুসলিম তরিকায় রান্না করা হয়। রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে বাসার সবার সাথে কথা বলে, কিছু ছবি ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি। কাল সকালে আবার লম্বা জার্নি আছে লেহ টু শ্রীনগর

লেহ তে ঘুরার মতো আরো কিছু জায়গা আছে। কিন্তু সময় কম থাকার কারণে আর কোথাও যেতে পারিনাই। একদিনে আসলে এর বেশি সম্ভবও না। নুব্রা ভ্যালি, প্যাংগং লেক, খারদুংলা পাস, তুর্তুক গ্রাম এ যেহেতু আমাদের আপাদত যাবার অনুমতি, নাই তাই এবার এগুলা বাদ। পরবর্তীতে আবার লাদাখ যাবার ইচ্ছা আছে। তখন বাকি গুলা টাচ করবো।

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো জানালে ভালো হয়। লাদাখ এবং কাশ্মীর ভ্রমণের সবগুলো ভিডিও দেখার জন্য আমাদের ইউটিব চ্যানেল ভিসিট করুন এবং সাবস্ক্রাইব করুন। প্রতিদিনকার কর্মকান্ড জানতে আমাদের ফেইসবুক পেজ ভিসিট করুন এবং লাইক করুন। আপডেট পেতে টুইটার, গুগল প্লাস এ ও আমাদের ফলো করতে পারেন। সবাই কে ধন্যবাদ। হ্যাপি ট্রাভেলিং!!

Published by রাশেদুল আলম

আমি পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। টেকনোলজি নিয়ে কাজ এবং লেখালেখি করলেও ঘুরে বেড়াতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। তাই যখনই সময় পাই বেড়িয়ে পরি। সবুজ প্রকৃতি আমায় সব সময়ই কাছে টানে। আমি অনেককেই দেখেছি কোনো প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই ঘুরতে বেড়িয়ে পরে। আর নানা ধরণের ঝামেলায় পরে। অথচ ইন্টারনেট ঘেটে একটু ধারণা নিয়ে আসলেই তাদের ট্যুর টা অনেক ভাল হতে পারতো। তাই নিজের অভিজ্ঞতা গুলোকে এখানে শেয়ার করার চেষ্টা করি, যাতে অন্যরা উপকৃত হতে পারে।

Join the Conversation

1 Comment

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *